Views Bangladesh Logo

১০ গোলের মহাকাব্যিক থ্রিলার শেষে ব্রোঞ্জ জিতল ইংল্যান্ড, ইতিহাস গড়লেন এমবাপ্পে

Sports Desk

ক্রীড়া ডেস্ক

তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচ মানেই যেন  নিরুত্তাপ আনুষ্ঠানিকতা কিংবা সান্ত্বনার লড়াই, এমন ধারণাই ছিল অনেকের। কিন্তু মায়ামির হার্ড রক স্টেডিয়ামে ফ্রান্স ও ইংল্যান্ডের মধ্যকার সেই লড়াই রূপ নিল ১০ গোলের এক অবিশ্বাস্য থ্রিলারে। রুদ্ধশ্বাস এই ম্যাচে ফ্রান্সকে ৬-৪ গোলে হারিয়ে বিশ্বকাপে তৃতীয় স্থান নিশ্চিত করে ব্রোঞ্জ জিতল ইংল্যান্ড, যা গত ৬০ বছরে বিশ্বকাপে তাদের সেরা সাফল্য। ১৯৬৬ সালের শিরোপা জয়ের পর এত বড় প্রাপ্তি আর আসেনি থ্রি লায়ন্সদের ঝুলিতে।



জয়-পরাজয় নির্বিশেষে এই ম্যাচ ছিল আবেগ, গর্ব ও ইতিহাসের এক অনন্য মিশেল। একদিকে ফরাসি কোচ দিদিয়ের দেশমের ১৪ বছরের সফল অধ্যায়ের শেষ ম্যাচ, অন্যদিকে গোল্ডেন বুট ও সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতার মুকুটের হাতছানি ছিল কিলিয়ান এমবাপ্পের সামনে। দুই দলই একাদশে সাতটি করে পরিবর্তন এনে মাঠে নামলেও লড়াইয়ের তীব্রতায় বিন্দুমাত্র ঘাটতি ছিল না।



খেলা শুরুর মাত্র ৩ মিনিটেই এগিয়ে যায় ইংল্যান্ড। দেজিরে দোয়ের একটি ভুল পাস মাঝমাঠে কেটে নিয়ে প্রায় ২০ গজ দূর থেকে দুর্দান্ত বাঁকানো শটে গোল করেন ডেকলান রাইস। ফরাসি গোলরক্ষক মাইক মেনিয়াঁ কোনো সুযোগই পাননি। ১২ মিনিটে বুকায়ো সাকার একটি গোল অফসাইডের কারণে ভিএআরে বাতিল হলেও থামেনি ইংলিশ আক্রমণ। ২০ মিনিটে রাইসের নেওয়া কর্নার থেকে দুর্দান্ত হেডে ব্যবধান দ্বিগুণ করেন ডিফেন্ডার এজরি কনসা, যা ছিল তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় গোল।



৩৬ মিনিটে মার্কাস রাশফোর্ডের নিখুঁত পাসে দ্রুতগতির পাল্টা আক্রমণ থেকে ব্যবধান ৩-০ করেন বুকায়ো সাকা। আর প্রথমার্ধের যোগ করা সময়ে এবেরেচি এজের থ্রু বল থেকে নিজের দ্বিতীয় ও দলের চতুর্থ গোলটি করেন সাকা, ফলে স্কোরলাইন দাঁড়ায় ৪-০-তে। বিশ্বকাপ ইতিহাসে তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচের প্রথমার্ধে এমন দাপুটে প্রদর্শনী আগে দেখা যায়নি। ১৯৯৪ বিশ্বকাপে সুইডেন-বুলগেরিয়া ম্যাচের ৪-০ ব্যবধানের রেকর্ডের সমকক্ষ হয়ে যায় এই স্কোরলাইন। এই সময়ে এমবাপ্পের দুটি প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়; একটি লক্ষ্যভ্রষ্ট, আরেকটি ইংলিশ গোলরক্ষক ডিন হেন্ডারসনের হাতে বন্দি হয়।



বিরতির পর সম্পূর্ণ ভিন্ন চেহারায় মাঠে ফেরে ফ্রান্স। ৪৮ মিনিটে মাইকেল ওলিসের থ্রু পাস থেকে বাঁ পায়ের নিখুঁত শটে ব্যবধান কমান অধিনায়ক কিলিয়ান এমবাপ্পে। এরপর ৫৪ মিনিটে এমবাপ্পের দুর্দান্ত থ্রু পাস থেকে গোল করেন ব্র্যাডলি বারকোলা, স্কোর দাঁড়ায় ৪-২। আর ৬৬ মিনিটে আসে ম্যাচের সবচেয়ে ঐতিহাসিক মুহূর্ত। ওলিসের পাস থেকে বক্সের মাঝখানে বল পেয়ে বাঁ পায়ের নিচু শটে জালে জড়ান এমবাপ্পে; নিজের দ্বিতীয় গোল, স্কোর তখন ৪-৩। এই গোলের মধ্য দিয়ে ক্যারিয়ারে নিজের সর্বমোট বিশ্বকাপ গোলসংখ্যা ২২-এ উন্নীত করে লিওনেল মেসির ২১ গোলের রেকর্ড ভেঙে বিশ্বকাপ ইতিহাসে এককভাবে সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়ে যান তিনি। একই সঙ্গে চলতি আসরে নিজের গোলসংখ্যা ১০-এ নিয়ে গিয়ে ১৯৭০ সালের পর গার্ড মুলারের পর প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে এক বিশ্বকাপে ১০ গোলের কীর্তি গড়েন এবং গোল্ডেন বুটের দৌড়ে এককভাবে শীর্ষে উঠে যান।



৮৫ মিনিটে বক্সে জেদ স্পেন্সকে ফাউল করলে পেনাল্টি পায় ইংল্যান্ড। ৮৭ মিনিটে সেই পেনাল্টি থেকে বাঁ পায়ের নিখুঁত শটে গোল করে নিজের হ্যাটট্রিক পূর্ণ করেন বুকায়ো সাকা; স্কোর তখন ৫-৩। ম্যাচ প্রায় শেষের দিকে হলেও থামেনি ফরাসি লড়াই। যোগ করা সময়ের পঞ্চম মিনিটে দ্রুতগতির পাল্টা আক্রমণ থেকে বাঁ পায়ের নিখুঁত শটে ব্যবধান কমান বদলি খেলোয়াড় উসমান দেম্বেলে, স্কোর দাঁড়ায় ৫-৪। তবে যোগ করা সময়ের সপ্তম মিনিটে ফ্রান্স যখন সমতায় ফেরার আশায় সর্বাত্মক আক্রমণে, ঠিক তখনই দুর্দান্ত পাল্টা আক্রমণ থেকে বক্সের কেন্দ্রে দারুণ নিয়ন্ত্রণের পর ডান পায়ের নিখুঁত শটে ম্যাচের শেষ কথা বলে দেন জুড বেলিংহাম। চূড়ান্ত ব্যবধান দাঁড়ায় ৬-৪।



সাকার হ্যাটট্রিক, এমবাপ্পের জোড়া গোল; মিনিটে মিনিটে যেভাবে এলো ১০ গোল তার সংক্ষিপ্ত বিবরণী হলো: ম্যাচের ৩ মিনিটে ডেকলান রাইসের একক প্রচেষ্টার গোলে এগিয়ে যায় ইংল্যান্ড, এরপর ২০ মিনিটে রাইসের কর্নার থেকে হেডে ব্যবধান দ্বিগুণ করেন এজরি কনসা। ৩৬ মিনিটে মার্কাস রাশফোর্ডের সহযোগিতায় নিজের প্রথম গোলটি করেন বুকায়ো সাকা, আর প্রথমার্ধের যোগ করা সময়ে এবেরেচি এজের পাসে নিজের দ্বিতীয় গোল করে বিরতিতে ৪-০ ব্যবধান নিশ্চিত করেন তিনি। দ্বিতীয়ার্ধ শুরু হতেই ব্যবধান কমাতে থাকে ফ্রান্স— ৪৮ মিনিটে মাইকেল ওলিসের পাসে গোল করেন কিলিয়ান এমবাপ্পে, ৫৪ মিনিটে এমবাপ্পের সহযোগিতায় গোল করেন ব্র্যাডলি বারকোলা, আর ৬৬ মিনিটে আবারও ওলিসের পাস থেকে নিজের দ্বিতীয় গোলটি করে স্কোরলাইন ৪-৩-এ নিয়ে আসেন এমবাপ্পে। ম্যাচের ৮৭ মিনিটে পেনাল্টি থেকে নিজের তৃতীয় গোল করে হ্যাটট্রিক পূর্ণ করেন সাকা, যা ব্যবধান নিয়ে যায় ৫-৩-এ। যোগ করা সময়ের পঞ্চম মিনিটে একক প্রচেষ্টায় ব্যবধান কমান উসমান দেম্বেলে, তবে সপ্তম মিনিটে পাল্টা আক্রমণ থেকে জুড বেলিংহামের গোলে ৬-৪ ব্যবধানের চূড়ান্ত জয় নিশ্চিত হয় ইংল্যান্ডের।



ম্যাচের অফিসিয়াল পরিসংখ্যানে দেখা যায়, বল দখলে সামান্য এগিয়ে ছিল ইংল্যান্ড। ৫৫ শতাংশ বল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখে তারা, ফ্রান্সের দখলে ছিল ৪৫ শতাংশ। উভয় দলই সমান ১৮টি করে শট নিলেও লক্ষ্যে শটে সামান্য এগিয়ে ছিল ইংল্যান্ড (১০-৯)। এর মধ্যে ইংল্যান্ডের ৬টি শট ফরাসি রক্ষণে ব্লক হয় এবং ৫টি শট ফরাসি গোলরক্ষক মাইক মেনিয়াঁর হাতে রক্ষা পায়, অন্যদিকে ফ্রান্সের ৪টি শট ইংলিশ রক্ষণে ব্লক হওয়ার পাশাপাশি ৪টি শট গোলরক্ষক ডিন হেন্ডারসনের হাতে প্রতিহত হয়। অফসাইডের ফাঁদে দুই দলই সমানভাবে (৩টি করে) আটকা পড়ে। সেটপিসের হিসেবে কর্নার কিকে এগিয়ে ছিল ইংল্যান্ড (৪-৩), তবে ফ্রি-কিক আদায়ে এগিয়ে ছিল ফ্রান্স (৮-১৩ ফাউলের বিপরীতে ফ্রি-কিক পায় যথাক্রমে)।



শৃঙ্খলার দিক থেকে ম্যাচটি ছিল সম্পূর্ণ কার্ডবিহীন। কোনো দলের কোনো খেলোয়াড়ই হলুদ বা লাল কার্ড দেখেননি, যা এত উত্তেজনাপূর্ণ ও উচ্চ-স্কোরিং একটি ম্যাচের জন্য বিরল এক ঘটনা। আগ্রাসনের হিসেবে অবশ্য এগিয়ে ছিল ফ্রান্সই। তারা মোট ১৩টি ফাউল করে, যেখানে ইংল্যান্ডের ফাউলের সংখ্যা ছিল মাত্র ৭টি; যা প্রমাণ করে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ হারানোর চাপে ফরাসিরা কতটা মরিয়া হয়ে খেলেছে। ইংল্যান্ড ম্যাচে একটি পেনাল্টি আদায় করে এবং তা থেকে গোলও করে, বিপরীতে ফ্রান্স কোনো পেনাল্টি পায়নি। খেলোয়াড় পরিবর্তনের ক্ষেত্রে দুই দলই সমান পাঁচটি করে বদল করে, যদিও ফ্রান্স তাদের চারটি পরিবর্তনই আনে বিরতির সময়ে একসঙ্গে।



প্রথমার্ধে সম্পূর্ণ দাপট দেখায় ইংল্যান্ড। গতি, সংগঠন ও ফিনিশিংয়ে ফরাসি রক্ষণকে একেবারে বিধ্বস্ত করে দেয় তারা। বিশেষত সেট-পিস ও পাল্টা আক্রমণে ইংল্যান্ডের দক্ষতা ছিল চোখে পড়ার মতো। তবে দ্বিতীয়ার্ধে এমবাপ্পের নেতৃত্বে ফ্রান্স দেখায় কেন তারা টুর্নামেন্টের অন্যতম সেরা আক্রমণভাগের মালিক। মাত্র ১৮ মিনিটের ব্যবধানে তিন গোল করে তারা ম্যাচে ফিরে আসে প্রায় সমতায়। শেষ পর্যন্ত ইংল্যান্ডের মানসিক দৃঢ়তা ও বেলিংহামের মতো খেলোয়াড়দের বড় মুহূর্তে জ্বলে ওঠার ক্ষমতাই পার্থক্য গড়ে দেয়।



ম্যাচ হেরেও ব্যক্তিগত অর্জনে উজ্জ্বল থেকেছেন এমবাপ্পে। ২২ গোল নিয়ে বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা হওয়ার পাশাপাশি, চলতি আসরে ১০ গোল নিয়ে গোল্ডেন বুটের দৌড়েও ফাইনালের আগে সবার ওপরে অবস্থান করছেন তিনি। যদিও ফাইনালে মেসির সামনে সুযোগ থাকবে সেই ব্যবধান ঘুচিয়ে দেওয়ার।



এই জয়ের মধ্য দিয়ে টমাস টুখেলের ইংল্যান্ড বিশ্বকাপে অর্জন করল তাদের ৬০ বছরের মধ্যে সেরা সাফল্য, আর শেষ পর্যন্ত লড়াই করেও চতুর্থ স্থান নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে হলো দুবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ফ্রান্সকে। টুর্নামেন্টের সবচেয়ে কম গুরুত্বের ম্যাচ হিসেবে বিবেচিত এই লড়াইটিই শেষ পর্যন্ত উপহার দিল বিশ্বকাপের অন্যতম স্মরণীয় ও নাটকীয় এক অধ্যায়।

মতামত দিন

Avatar

ট্রেন্ডিং ভিউজ