দখল ও দূষণে হারিয়ে গেছে হবিগঞ্জের ২০টি নদনদী, অস্তিত্ব সংকটে বাকি ৩০টি
হবিগঞ্জের অর্ধশতাধিক নদনদীর মধ্যে দখল ও দূষণ আর নাব্য সংকটে অস্তিত্ব হারিয়েছে ২০টি। বাকি ৩০টিরও অধিকাংশই মৃতপ্রায়। নদী শাসনের অভাবে মহাসংকটাপন্ন কুশিয়ারা, কালনী, খোয়াই, সুতাং, রত্না এবং করাঙ্গীর মতো বড় নদীগুলো। অস্তিত্ব নেই বেশিরভাগ নদীর সঙ্গে জুড়ে থাকা শতাধিক খালেরও।
সত্তরের দশকেও হবিগঞ্জে ছিল ৫০টিরও বেশি নদী। আর এখন জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের তালিকায় আছে ৩০টির নাম। দীর্ঘ সময় ধরে খনন না করায় সমতলভূমিতে পরিণত হয়ে গেছে বাকিগুলো। অর্থাৎ, গেল পাঁচ দশকে হবিগঞ্জ থেকে মুছে গেছে প্রায় অর্ধেক নদীর নামই। যেগুলো টিকে আছে, সেগুলোরও দুপাড় দখল করে গড়ে উঠেছে অবৈধ বসতি, ব্যবসা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং ধর্মীয়সহ বড় বড় স্থাপনা। ফলে পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি নাব্য হারিয়ে নদীগুলো পরিণত হয়েছে খাল বা নালায়।
এদিকে আশপাশের কল-কারখানা এবং বাড়ি-ঘরের ময়লা-আবর্জনা ও শিল্পবর্জ্য ফেলায় নদী-নালা এবং খাল-বিলগুলো পড়েছে দূষণের কবলে। দূষিত বর্জ্যে কালো হয়ে গেছে পানি, যার দুর্গন্ধ সাধারণের সহ্যের বাইরে। বিষাক্ত পানি পানে মারা যাচ্ছে গবাদিপশু, হারিয়ে যাচ্ছে মৎস্যসম্পদসহ বিভিন্ন জলজ প্রাণি, হুমকির মুখে জীববৈচিত্র্যও। গোসলসহ প্রয়োজনীয় কাজে বা ব্যবহারে আশপাশের লোকজন আক্রান্ত হচ্ছেন চর্মসহ নানা রোগ-ব্যাধিতে, দেখা দিয়েছে চরম স্বাস্থ্যঝুঁকি। কৃষিকাজে ব্যবহারেরও একেবারে অনুপযোগী এ পানি।
এক সময়ের খরস্রোতা শাখা বরাক নদী ঘিরে গড়ে উঠেছে হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ উপজেলা শহর। এলাকার ব্যবসা-বাণিজ্যের একমাত্র মাধ্যম ছিল এই নদীপথ। উত্তাল পানিপ্রবাহ বেয়ে সারা বছরই চলাচল করত বড় বড় লঞ্চ ও ট্রলার। দুই পাড়ে শত শত নৌকা বাঁধা থাকত। এসব নৌকা বিভিন্ন এলাকা থেকে মালামাল নিয়ে আসত নবীগঞ্জে। মাছ শিকারে জীবিকা নির্বাহ করতেন নদীপাড়ের বাসিন্দারা। দখল-দূষণে শাখা বরাক পরিণত হয়েছে মরা খালে, যার অস্তিত্বও এখন মহাসংকটে।
সুতাং নদীর অবস্থা আরও ভয়াবহ। শিল্পবর্জ্যের দূষণে এখন মৃতপ্রায়। দখলের কবলে বিলীনের পথে বাহুবলের করাঙ্গী ও মাধবপুরের সোনাই আর শুঁটকি নদী। চরম সংকটে রত্না এবং হবিগঞ্জ শহর ঘিরে থাকা খোয়াই নদী। কালের পরিক্রমায় যৌবন হারিয়েছে বাকিগুলোও।
শাখা বরাক নদীপাড়ের আওড়া গ্রামের বাসিন্দা রমিজ আলী জানান, বরাকের পাড় ছিল জমজমাট ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রাণকেন্দ্র। এখন নদীটিই ছোট হয়ে গেছে। কিছু কিছু এলাকা পরিণত হয়েছে সংকীর্ণ খালে।
খোয়াই নদীর পাশে নিউ মুসলিম কোয়ার্টারের বাসিন্দা অ্যাডভোকেট হাসবী সাঈদ চৌধুরী জানান, এক সময়ের প্রমত্তা খোয়াই নদী এখন অস্তিত্ব হারিয়ে সংকীর্ণ খালে পরিণত হয়েছে। ময়লা, আবর্জনার স্তূপ জমে এবং বিভিন্ন এলাকা দখল ও ভরাট হয়ে নদীটি হারিয়েছে গতিপথ। যেটুকু টিকে আছে, স্বাভাবিক প্রবাহ না থাকায় মরতে বসেছে সেটুকুও।
একই এলাকার মামুন মিয়া ও সুতাং নদীপাড়ের লিলু মিয়া জানান, স্থানীয় নদীগুলো ভরাট হয়ে যাওয়ায় সামান্য বৃষ্টিতেই শহরে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়। দেখা দেয় অকাল বন্যা।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) হবিগঞ্জের সহসভাপতি তাহমিনা বেগম গিনি বলেন, ‘নদী হলো জীবন্তসত্তা। নদীকে টিকিয়ে রাখতে হবে। নদীরক্ষায় সবাইকে সচেতন হতে হবে। ময়লা-আবর্জনা না ফেলে নদীর গতিপথ স্বাভাবিক রাখা প্রয়োজন।’ খাল-বিল ও নদী-নালাগুলোর অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ ও দ্রুত খননসহ কার্যকর পদক্ষেপ নিতে প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
হবিগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী শামীম হাসনাইন মাহমুদ জানান, জেলায় প্রায় ৩০টি নদীর পরিচয় পাওয়া গেছে। সেগুলোর দুপাশে অবৈধ স্থাপনা গড়ে উঠে ছোট নদী-খালে পরিণত হয়েছে। কোনো কোনো এলাকার অস্তিত্বই বিলীন হয়ে গেছে। প্রত্যেক উপজেলায় নদী চিহ্নিত করতে প্রশাসনকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি দখলমুক্ত করে সৌন্দর্য ও স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনতে নদী খনন ও উচ্ছেদ অভিযানের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে