এনায়েতপুর থানায় ১৫ জন পুলিশ সদস্যকে হত্যা, সেদিন যা ঘটেছিল
দুই বছর হয়ে গেল সেদিনের আর্তনাদ আজও কানে বাজে এক বৃদ্ধার। ভেসে ওঠে মৃত্যুযন্ত্রণায় কাতরানো পুলিশ সদস্যদের চিৎকার। ঘর থেকে বের হলেই মনে পড়ে তার এখানে-ওখানে ছড়িয়ে ছিল লাশ। সেই ঘটনাগুলো শুধু তাকেই নয়, তার পরিবারকেও তাড়া করে বেড়ায়। এখনও মাঝরাতে তার সাত ও আট বছর বয়সী নাতনিরা ঘুমের মধ্যে চিৎকার করে ওঠে, বাঁচাও, বাঁচাও, মরে গেলাম, মরে গেলাম বলে।
সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুর থানার ঠিক পেছনে তার বাড়ি। ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট সরকারবিরোধী আন্দোলনের সময় হাজার হাজার আন্দোলনকারী থানায় হামলা চালায়। হামলাকারীরা পুলিশ হত্যার পাশাপাশি থানায় অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট করে। ওই ঘটনায় এনায়েতপুর থানার তৎকালীন ওসি আবদুর রাজ্জাকসহ ১৫ জন পুলিশ সদস্য নিহত হন। তারা সবাই পুরুষ। আন্দোলনকারীদের মধ্য নিহত হন তিনজন।
বৃদ্ধা বলেন, থানা থেকে প্রাণ বাঁচাতে পালিয়ে আশপাশের বাড়িগুলোতে আশ্রয় নিয়েছিলেন কয়েকজন পুলিশ সদস্য। কিন্তু আন্দোলনকারীরা বাড়ি বাড়ি তল্লাসি করে তাদের খুঁজে বের করেন। তখন ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল, কেউ পুলিশকে আশ্রয় দিলে তার বাড়িঘর আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হবে। আতঙ্কে কেউ প্রতিবাদ করার সাহস পাননি।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায়, জীবন বাঁচাতে অনেক পুলিশ সদস্য বাড়ি, বাথরুম, এমনকি পুকুরেও লুকানোর চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু একে একে তাদের খুঁজে বের করে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। পুকুরেই কয়েকজনকে ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করে ও পিটিয়ে হত্যা করা হয়। সেই পুলিশ সদস্যদের মরদেহ পুকুরেই ভাসছিল। নিহতদের মধ্যে অন্তত সাতজনের মরদেহ থানার পেছনের একটি বাড়ির সামনে এনে এক জায়গায় রাখা হয়েছিল। আর একজনের মরদেহ থানার সামনের বাজারে একটি গাছের সঙ্গে ঝুলিয়ে রাখা হয়।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, সেদিন থানায় দায়িত্বে ছিলেন ৫৯ জন পুলিশ সদস্য। তাদের মধ্যে ১৫ জন নিহত হন। ঘটনাস্থলে ১৩ জন আর দুজন হাসপাতালে মারা যান।
সরেজমিনে পুলিশ সদস্য ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দুপুর একটার দিকে হাজার হাজার আন্দোলনকারী মিছিল নিয়ে থানার দিকে অগ্রসর হন। অনেকের মুখে সাদা রঙের প্রলেপ ছিল, যাতে সহজেই তাদেরকে শনাক্ত করা না যায়। আন্দোলনকারীরা থানার দিকে এগিয়ে এলে পুলিশ প্রথমে টিয়ারশেল ও রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে। এসময় এনায়েতপুর থানা এলাকায় কোনো প্রাণঘাতী গুলি করা হয়নি বলে দাবি করে পুলিশ। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়ে একপর্যায়ে পুলিশ সদস্যরা থানার পেছন দিয়ে পালিয়ে আশপাশের বাড়িতে আশ্রয় নেন। ওই দিন থানার পানির ট্যাংকির নিচে চারজন পুলিশ সদস্য আহত অবস্থায় লুকিয়ে ছিলেন। সন্ধ্যায় সেনাবাহিনীর সদস্যরা তাদেরকে উদ্ধার করেন। পরে তাদের স্থানীয় হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়।
এখানে পুলিশ সদস্যদের লাশ জড়ো করা ছিল। অন্তত সাতটি মরদেহ ছিল।
এক বৃদ্ধা বলেন, তার বাড়িতেও কয়েকজন পুলিশ সদস্য ঢুকে পড়েছিলেন। তারা কাঁদতে কাঁদতে প্রাণভিক্ষা চাইছিলেন। কিন্তু কিছুক্ষণ পর আন্দোলনকারীরা বাড়িতে ঢুকে তাদের টেনেহিঁচড়ে বের করে মারধর করতে করতে হত্যা করেন। ওই সময় অনেক আন্দোলনকারী থাকায় ভয়ে কেউ বাধা দেওয়ার সাহস করেননি। তবে গ্রামবাসীর চেষ্টায় অনেক পুলিশ সদস্য প্রাণে বেঁচে গেছেন।
তিনি আরও জানান, এ ঘটনার পর তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। হার্ট ব্লক হয়ে গিয়েছিল। তার সন্তানরা তাকে চিকিৎসা করান। তার বাড়িঘরে পুলিশের পোশাক পরে ছিল ও রক্তের দাগ ছিল। ওইদিন থেকে পরবর্তী সাত-আটদিন পাশে ভাতিজার বাড়িতে ছিলেন তারা। এরপরেও বাড়িতে ফিরে মাস ছয়েক ঠিকমত ঘুমাতে পারেননি কেউ। ঘুমাতে গেলেই পুলিশ সদস্য হত্যার সেসব ঘটনায় তারা আতঙ্কে থাকতেন। ভাবতেন, হয়ত এখনই কেউ এসে তাদেরও হত্যা করবে।
বৃদ্ধা জানান, কয়েকজন পুলিশ সদস্য তার বাড়ির বাথরুমে লুকিয়েছিলেন। সেখান থেকেও তাদের বের করে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। রাতে সেনাবাহিনীর সদস্যরা এসে মরদেহগুলো সরিয়ে নেন।
গ্রামের এক প্রবীণ বাসিন্দা জানান, তার বাড়ির সামনেই বিভিন্ন স্থানে পুলিশ সদস্যদের মরদেহ পড়ে ছিল। পরে সেগুলো এক জায়গায় জড়ো করা হয়।
মারধরের সময় অনেক পুলিশ সদস্য বলছিলেন, আমাদের ছেড়ে দিন, আমরা চাকরি ছেড়ে দেব। তারা বারবার ক্ষমা চাইছিলেন। কিন্তু তাদেরকে আর বাঁচানো যায়নি। পিটিয়েই হত্যা করে আন্দোলনকারীরা।
প্রবীণ এই বাসিন্দা আরও জানান, তারা নিজেদের জীবন ঝুঁকিতে ফেলে দুইজন পুলিশ সদস্যকে পোশাক পরিবর্তন করে পালাতে সহায়তা করেছিলেন।
পুলিশ জানায়, থানার পেছনের একটি বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলেন কয়েকজন পুলিশ সদস্য। তাদের মধ্যে ছিলেন এক নারী পুলিশ সদস্যও। হামলার সময় কনস্টেবল (থানার মুন্সি) রবিউল আলম আন্দোলনকারীদের উদ্দেশে বলেন, ওই নারী পুলিশ সদস্য অন্তঃসত্ত্বা, তাকে কেউ মারেন না। ওই সময় আন্দোলনকারীদের মধ্যে কেউ কেউ তাকে (নারী) মারধর করতে অন্যদের নিষেধ করেন। এরপরও তাকে পেটান আন্দোলনকারীদের এক অংশ।
পরে জানা যায়, ওই নারী পুলিশ সদস্য অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন না। তাকে বাঁচানোর আশায় রবিউল আলম এই কথা বলেছিলেন। অথচ ওই নারী পুলিশ সদস্যের সামনেই রবিউলকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। নারী সদস্যকেও বেধড়ক মারধর করা হলে তিনি অচেতন হয়ে পড়েন। পরে হাসপাতালে তার জ্ঞান ফেরে।
এনায়েতপুর থানা পুলিশের অফিসার্স ইনচার্জ (ওসি) জাহিদ হোসেন জানান, এ ঘটনায় পর একটা গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে, এক অন্তঃসত্ত্বা নারী পুলিশ সদস্যকে হত্যা করা হয়। আসলে তিনি অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন না। তাকে বাঁচানোর জন্য কনস্টেবল রবিউল মিথ্যার আশ্রয় নেন। সেসময় সেই নারী পুলিশ সদস্যর সামনেই রবিউলকে হত্যা করা হয়। এনায়েতপুর থানার ছয়জন নারী পুলিশ সদস্যর মধ্যে তিনজন নারী ওই সময় মাতৃত্বকালীন ছুটিতে ছিলেন। সেদিনের ঘটনায় থানায় চারটি মামলা হয়েছে, আন্দোলনকারীদের মধ্যে গুলিবিদ্ধ হয়ে তিনজন মারা যান। তবে তারা কার গুলিতে মারা গেছেন জানি না। কিন্তু আমাদের ১৫ জন পুলিশ সদস্যকে হত্যা করা হয়েছে।
সরকারি বিরোধী আন্দোলনকারীরা থানায় হামলা চালিয়ে পুলিশ সদস্যদের হত্যা করেন। তখন ক্ষমতায় ছিল আওয়ামী লীগ। আন্দোলনের মাধ্যমে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ক্ষমতাচ্যুত হয় দলটি। পরবর্তীতে একই মাসের ২৬ আগস্ট পুলিশ হত্যার ঘটনায় এনায়েতপুর থানায় মামলা করা হয়। মামলার বাদী হন থানার এসআই (উপপরিদর্শক) আব্দুল মালেক।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পুলিশ হত্যা মামলায় আন্দোলনে ক্ষমতাচ্যুত হওয়া আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদেরই গ্রেফতার করা হচ্ছে। শুধু তা-ই নয়, সেই মামলায় এক নম্বর আসামি করা হয় এনায়েতপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি
আহম্মদ মোস্তফা খান বাচ্চুকে। কারা হেফাজতে তার মৃত্যু হয়েছে। মামলায় স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের নামীয় আসামি করা হয়েছে। এখন পর্যন্ত ৯ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। তবে তাদের নামপরিচয় গোপন রাখা হয়েছে। বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, গ্রেফতার হওয়া সবাই আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত।
আগামীকাল ৪ আগস্ট, এ ঘটনার দুই বছর পূর্ণ হতে যাচ্ছে। পুলিশ মামলার তদন্ত করছে, সেইসাথে গ্রেফতার করা হচ্ছে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদেরও।
পুলিশ হত্যাকাণ্ডে কী আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের সম্পৃক্ততা পাওয়া যাচ্ছে -এমন প্রশ্ন করলে এনায়েতপুর থানা পুলিশের ওসি জানান, মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদনে সব জানিয়ে দেওয়া হবে। এ মামলায় চারজনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তাদের মধ্যে একজন মারা গেছেন। বাকিরা পলাতক রয়েছেন।
দুই বছরেও কেন এ মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হচ্ছে না-জানতে চাইলে পুলিশের এই কর্মকর্তা বলেন, আমরা চাইনা কোনো নির্দোষ বা নিরীহ মানুষের সাজা হোক বা বিচারের আওতায় আসুক। আমরা ঘটনার তদন্ত করছি। আপনারা যারা সাংবাদিক আছেন, আমাদের সাহায্য করেন, ভিডিও ফুটেজ যদি থাকে আমাদের দেন। ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করে আমরা জড়িতদের শনাক্ত করে গ্রেফতার করব।
মতামত দিন