Views Bangladesh Logo

স্বাধীন তদন্তের ক্ষমতা দিয়ে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন সংস্কারের আহ্বান

Kamrul  Hasan

কামরুল হাসান

শূন্যপদগুলো পূরণ  করার পর জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের (এনএইচআরসিবি) প্রয়োজনীয় সংস্কারের আহ্বান জানিয়েছে এশিয়ান এনজিও নেটওয়ার্ক অন ন্যাশনাল হিউম্যান রাইটস ইনস্টিটিউশনস (এএনএনআই) এবং এশিয়ান ফোরাম ফর হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (ফোরাম এশিয়া) । বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে কমিশনটিকে আইন প্রয়োগকারী বাহিনী দিয়ে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্তের ক্ষমতা প্রদানেরও অনুরোধ জানিয়েছে সংস্থাগুলো।

আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুলের কাছে পাঠানো চিঠিতে এনএইচআরসিবি-এর কার্যকারিতা বাড়াতে স্বচ্ছ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন প্রক্রিয়া এবং বিদ্যমান আইন সংশোধনের প্রয়োজনীয়তায়ও জোর দিয়েছে তারা।

গত ৭ নভেম্বর চেয়ারম্যানসহ সব সদস্যের পদত্যাগের পর থেকে নেতৃত্বহীন জাতীয় মানবাধিকার কমিশন ।

ফোরাম এশিয়ার নির্বাহী পরিচালক মেরি আইলিন ডি. ব্যাকালসো স্বাক্ষরিত চিঠিতে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইনের ১৮ ধারা সংশোধনের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরা হয়েছে, যেটি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মানবাধিকার লঙ্ঘনের সরাসরি তদন্ত থেকে কমিশনকে বিরত রাখে। ধারাটি অনুসারে এনএইচআরসিকে প্রথমে সরকারের কাছ থেকে এ বিষয়ক প্রতিবেদন চাইতে হয়। এ প্রক্রিয়া কমিশনের স্বাধীনতা এবং কার্যকারিতাকে কমিয়ে দেয় বলেও মনে করছে ফোরাম এশিয়া।

এ ধরনের সংস্কার মানবাধিকারকর্মী এবং নিরাপত্তা বিশ্লেষকদেরও দীর্ঘদিনের দাবি।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) প্রাক্তন নির্বাহী পরিচালক এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত বলপূর্বক গুম তদন্ত কমিশনের সদস্য নূর খান লিটন মনে করেন, কয়েক দশকের দায়মুক্তি আইন প্রয়োগকারীদের মানবাধিকার লঙ্ঘনে উৎসাহিত করেছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, জবাবদিহি নিশ্চিতে এনএইচআরসিবিকে স্বাধীন তদন্ত পরিচালনার ক্ষমতা দেয়া অপরিহার্য।

সরফরাজ হোসেনের নেতৃত্বে পুলিশ সংস্কার কমিশনের সাম্প্রতিক জনমত জরিপও এই দৃষ্টিভঙ্গিকে জোরদার করে।

‘কেমন পুলিশ চাই’ শীর্ষক জরিপে অংশ নেয়া ৬০ শতাংশ নাগরিক পুলিশি দুর্নীতি এবং অপরাধের তদন্তে স্বাধীন কমিশন গঠনকে সমর্থন করেছেন, যেখানে ২০ শতাংশ জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের ক্ষমতায়নের পক্ষে। ফলাফলগুলো আইন প্রয়োগে অসদাচরণ মোকাবিলায় সংস্কারের জন্য জনসাধারণের ক্রমবর্ধমান চাহিদাকে প্রতিফলিত করে।

ফোরাম এশিয়ার চিঠিতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সীমিত ক্ষমতা ইন্টারন্যাশনাল হিউম্যান রাইটস ইনস্টিটিউশন স্বীকৃত গ্লোবাল অ্যালায়েন্সের 'বি' ক্যাটাগরির মর্যাদায় স্থিত রেখেছে বাংলাদেশকে। 'এ' ক্যাটাগরির মর্যাদা অর্জন করতে, যা প্যারিস নীতিগুলোকে সম্পূর্ণ প্রতিফলিত করে, কমিশনকে অবশ্যই আইন প্রয়োগকারীদের সব ধরনের মানবাধিকার লঙ্ঘন তদন্তে বিস্তৃত আদেশ দিতে হবে৷

বাংলাদেশ মালদ্বীপের পাশাপাশি দক্ষিণ এশিয়ার মাত্র দুটি দেশের মধ্যে একটি, যার মানবাধিকার কমিশনের 'বি' ক্যাটাগরির মর্যাদা রয়েছে। পাকিস্তানসহ প্রতিবেশী দেশগুলো এক্ষেত্রে ভালো পারফর্ম করেছে।

চিঠিটি এনএইচআরসিকে সাংবিধানিক মর্যাদা প্রদান এবং এর স্বাধীনতা নিশ্চিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে, যেন কমিশনটিকে বহিরাগত প্রভাব থেকে মুক্ত করে।

আইন মন্ত্রণালয়ে ২৭ নভেম্বর পৃথক চিঠি পাঠিয়ে একই ধরনের সুপারিশ করেছে হিউম্যান রাইটস ফোরাম বাংলাদেশও। চিঠিতে মানবাধিকার কার্যক্রমের পটভূমি এবং দেশের মানবাধিকার চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় অভিজ্ঞ এবং আইনগত দক্ষতাসম্পন্ন চেয়ারম্যান নিয়োগ এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইনের ১৮ ধারা সংশোধনের আহ্বান জানিয়েছে ফোরামটি। বলেছে, কমিশনকে যেন আইন প্রয়োগকারী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার ক্ষমতা দেয়া হয়, যারা তার নির্দেশনা মেনে চলতে ব্যর্থ হবে।

মানবাধিকারকর্মী এবং বিশ্লেষকরা বলছেন, এসব সংস্কারের জরুরি প্রয়োজনীয়তাকে অস্বীকার করা যাবে না। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো প্রায়শই নির্বিচারে আটক, নির্যাতন এবং জোরপূর্বক গুমসহ অধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের মুখোমুখি হয়েছে। এই কাজগুলো জনগণের আস্থা নষ্ট এবং আইনের শাসনকে ক্ষুণ্ন করে। এই জাতীয় মামলাগুলোর স্বাধীন তদন্ত করতে এনএইচআরসিবিকে শক্তিশালী করা জবাবদিহি এবং ন্যায়বিচারের দিকে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপের প্রতিনিধিত্ব করবে।

তাদের মতে, বাংলাদেশ যেহেতু তার মানবাধিকার রেকর্ড উন্নত করতে চায়, তাই আইনি সংস্কার এবং যোগ্য নেতৃত্বের মাধ্যমে এনএইচআরসিবিকে ক্ষমতায়ন হতে পারে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এটি কমিশনকে শুধু আন্তর্জাতিক মানেই উন্নত করবে না, পদ্ধতিগত দায়মুক্তিরও সমাধান করবে। ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত এবং দেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকেও শক্তিশালী করবে।

মতামত দিন

মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে

ট্রেন্ডিং ভিউজ