Views Bangladesh Logo

উদীয়মান ক্রিকেটারদের প্রতিভার অভাবনীয় বিচ্ছুরণ

শুরুতেই ২০২৪ সালের খেরোখাতার হিসাবটা দিয়ে দিচ্ছি। বিদায়ী বছরে টেস্ট, ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি মিলিয়ে মোট ৪৩টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেছে বাংলাদেশ। এর মধ্যে ১৮টিতে জয় ও ২৫টিতে হারের রেকর্ড।

আরো একটু বিস্তারিতভাবে বললে, দশটি টেস্ট ম্যাচের মধ্যে তিনটিতে জয় ও সাতটিতে হার, নয়টি ওয়ানডের মধ্যে তিনটিতে জয় ও ছয়টিতে হার এবং ২৪টি টি-টোয়েন্টি ম্যাচের মধ্যে সমান ১২টি করে হার ও জয়ের সমান রেকর্ড।

দেশের ক্রিকেটের পঞ্চ-পাণ্ডব খ্যাত পাঁচ সিনিয়র ক্রিকেটার- মাশরাফি বিন মুর্তজা, সাকিব আল হাসান, তামিম ইকবাল খান, মুশফিকুর রহিম ও মাহমুদউল্লাহকে ছাড়াই বেশিরভাগ ম্যাচ খেলেছে বাংলাদেশ। অবশ্য অলিখিতভাবে জাতীয় দল থেকে অবসরে আছেন মাশরাফি। তিনি কোনো ম্যাচই খেলেননি। তামিম খেলার মধ্যে না থাকায় বাংলাদেশের জার্সি চাপেনি তার গায়েও।

অন্য তিনজনের মধ্যে সাকিব পাঁচটি টেস্ট ও ১২টি টি-টোয়েন্টি ম্যাচ খেলেছেন। তবে ওয়ানডে খেলেননি, অবসরের ঘোষণা দিয়েছেন এই কিংবদন্তি অলরাউন্ডার। মুশফিক খেলেছেন ছয়টি টেস্ট ও চারটি ওয়ানডে ম্যাচ। আগেই টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট থেকে অবসরে গেছেন এই উইকেটরক্ষক ও ব্যাটসম্যান। আর মাহমুদউল্লাহ প্রায় সাড়ে তিন বছর আগে টেস্ট ক্রিকেট ছেড়ে দিয়েছেন। তার টেস্ট খেলার প্রশ্নই উঠে না। তবে সবচেয়ে বেশি ২০টি টি-টোয়েন্টি ও ৯টি ওয়ানডে ম্যাচ খেলেছেন ‘সাইলেন্ট কিলার’ খ্যাত এই অলরাউন্ডার। অর্থাৎ তিন ফরম্যাটের ক্রিকেটে বাংলাদেশের হয়ে সাকিব, মুশফিক ও মাহমুদউল্লাহ টানা ম্যাচ খেলেননি বিদায়ী বছরে। তাদের ওপর দলের নির্ভরতাও কমে গেছে।

সিনিয়রদের এই অনুপস্থিতিতে ২০২৪ সালে বাংলাদেশের ক্রিকেটে প্রতিভার অভূতপূর্ব বিচ্ছুরণ ঘটেছে। হাল ধরেছেন তরুণরা। এক সময় ভাবা হতো, সিনিয়ররা অবসরে গেলে কী হবে, কী হবে? যেভাবে তরুণ ক্রিকেটাররা পারফরম্যান্স শো করে যাচ্ছেন, তাতে রচিত হচ্ছে নতুন ইতিহাসই।

স্বপ্নপূরণের বছর কাটালেন রিশাদ হোসেন। দেশের ক্রিকেটে একজন উইকেট-টেকার লেগ স্পিনারের দীর্ঘ দিনের আক্ষেপ ঘোচানো এই তরুণ কুড়ি ওভারের ক্রিকেটে রেকর্ড সর্বাধিক ৩৫টি উইকেট শিকার করেছেন। এক বর্ষপঞ্জিকায় বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে আগে এতো উইকেট শিকারের কীর্তি গড়তে পারেনি কেউই। দেশের জার্সি গায়ে বছরের পুরো ২৪টি টি-টোয়েন্টি ম্যাচেই রিশাদের প্রতি আস্থা রেখেছে টিম ম্যানেজমেন্ট। গত জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ওয়েস্ট ইন্ডিজে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে দাপট দেখানো বোলারদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সর্বোচ্চ উইকেট সংগ্রাহকের তালিকায় ছয় নম্বরে জায়গা করে নেন এই বোলার। তার শিকার ছিল ১৪টি উইকেট। আফগানিস্তানের রশিদ খানের সমান উইকেট পেয়ে বিশ্ব ক্রিকেটে ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছে রিশাদ। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে টি-টোয়েন্টি সিরিজে ক্যারিয়ার সেরা পারফরম্যান্স উপহার দিয়ে চব্বিশের শেষটাও রাঙিয়েছেন রংপুরের এই ছেলে।

ব্যাটিংয়ের কথা উঠলে সবার আগে আসবে জাকের আলী অনিকের নাম। মিডল অর্ডারের ভরসা হয়ে উঠেছেন হবিগঞ্জের এই তরুণ উইকেটরক্ষক ও ব্যাটসম্যান। গুরুত্বপূর্ণ এই ব্যাটিং পজিশনে যোগ্য ব্যাটসম্যানের খোঁজ পেয়েছে টাইগাররা। মেধা, পরিশ্রম ও কৌশলের মিশেলে অসাধারণ প্রতিভা জাকের। পুরো বছরে তিন ফরম্যাটের ক্রিকেট মিলিয়ে ছয়টি ফিফটির ইনিংস খেলে তার সংগ্রহ ৭২৩ রান। বছরের শেষ ম্যাচে তার ব্যাটে যে তাণ্ডবলীলা দেখা গেছে, তাতে রীতিমতো হতভম্ব ক্রিকেটবিশ্ব। মাত্র ৪১ বলে অপরাজিত ৭২ রানের ইনিংসটিই প্রমাণ করে যে, অসাধারণ মানের ব্যাটসম্যান জাকের।

টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানরা ছক্কা মারতে পারেন না, এমন কথা শুনতে হতো আগে! কিন্তু টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের ফেরিওয়ালাদের মাঠে একের পর এক বল গ্যালারিতে আঁচড়ে ফেলে জাকের জানান দিলেন, বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানরাও কোনো অংশ পিছিয়ে নেই। আকাশে ভাসিয়ে বল চোখের পলকেই বাউন্ডারিছাড়া করতে পারেন তারা। জাকেরের ছয়টি ছক্কার মার দর্শকদের চোখে লেগে থাকবে বহুদিন।

২০২৪ সালেই বাংলাদেশের টেস্ট ও ওয়ানডে দলের ক্যাপ পরেছেন নাহিদ রানা। দুই ফরম্যাটের (ছয়টি টেস্ট ও তিনটি ওয়ানডে) মোট নয়টি ম্যাচ খেলে ২৪টি উইকেট শিকার করে এই তরুণ ডানহাতি পেসার বার্তা দিলেন, বিশ্বক্রিকেট মাত করতে এসেছেন তিনি। শুধু উইকেট শিকারই নয়, এরই মধ্যে ‘গতিতারকা’ খেতাব পেয়ে গেছেন এই ‘চাপাইনবাবগঞ্জ এক্সপ্রেস’। পাকিস্তানের বিপক্ষে রাওয়ালপিন্ডি টেস্টে প্রতি ঘণ্টায় ১৫২ কিলোমিটার গতিতে বল করে আলোড়ন তুলেছেন নাহিদ। পেস বোলারদের বধ্যভূমিতেই শুধু নয়, গত নভেম্বরে দুবাইয়ের মাঠে আফগানিস্তান বিপক্ষে ওয়ানডে অভিষেকের সিরিজে গতির ঝড় তুলেছেন বাংলাদেশের এই তরুণ পেসার। তাকে নিয়ে ক্রিকেটবিশ্বে হইচই পড়ে যায়।

দায়িত্ব নিতে শিখে গেছেন তানজিম হাসান সাকিব, হাসান মাহমুদ, তানজিক হাসান তামিমও। সাকিবের অবসরের বছরেই বাজিমাত করেছেন মেহেদী হাসান মিরাজ। ২০১৬ সালের আইসিসি অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপের সেরা এই পারফর্মার ব্যাটিং ও বোলিংয়ে ছিলেন অনন্য। টেস্ট ক্রিকেটে চব্বিশের বিশ্বসেরা অলরাউন্ডারদের তালিকায় দুই নম্বরে জায়গা করে নেন। ওয়ানডে ক্রিকেটে মাহমুদউল্লাহর (৩৩৭ রান) পর বাংলাদেশের সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহকও হন মিরাজ (৩০৫ রান), শিকার করেছেন আটটি উইকেটও। সব মিলিয়ে অভিজ্ঞদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সেরা পারফরম্যান্স শো করেছেন বাংলাদেশের তরুণ ক্রিকেটাররা।

যেভাবে প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে যাচ্ছেন দেশের উদীয়মান তারকারা, তাতে পঞ্চপাণ্ডব ছাড়া সঠিক পথেই যাত্রা করবে বাংলাদেশ- এটা বলাই যায়।

মতামত দিন

মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে

ট্রেন্ডিং ভিউজ