দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন
'বাংলাদেশে নারীদের কাছে নির্বাচনকে ঘিরে আশা এখন হতাশা আর ভয়'
জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের অগ্রভাগে থাকা নারীরাসহ দেশের অনেক নারীর কাছে নির্বাচনকে ঘিরে আশাটা এখন হতাশা আর ভয়ে পরিণত হয়েছে বলে বৃটেনের জাতীয় দৈনিক দ্য গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
প্রতিবেদনটিতে আশঙ্কা করা হয়, রক্ষণশীল ইসলামপন্থী রাজনীতির পুনরুত্থান এবং নির্বাচনে নারী প্রার্থীদের সংখ্যা কম থাকার বিষয়টি নারীদের অধিকারকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে।
দ্য গার্ডিয়ান বলছে, বাংলাদেশের অনেক মানুষের কাছে গত কয়েক সপ্তাহ ছিল আনন্দের উপলক্ষ। ১৭ বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি পেয়েছেন তাঁরা। আগামীকাল বৃহস্পতিবার এ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, হবে। ২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্রদের নেতৃত্বে এক রক্তক্ষয়ী আন্দোলনে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের পতন ঘটে। সে আন্দোলনে সহস্রাধিক মানুষ প্রাণ হারান।
দীর্ঘদিন ধরে নির্যাতনের শিকার ও কারাবন্দী থাকা বিরোধী নেতারা এবার প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। বহু বছর পর অবাধে জনসভা করছেন তাঁরা। সাবেক প্রধানমন্ত্রী বর্তমানে ভারতে নির্বাসিত অবস্থায় আছেন। বাংলাদেশে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মৃত্যুদণ্ডের মুখোমুখি তিনি। তাঁর দল আওয়ামী লীগকে এই নির্বাচনে অংশগ্রহণ থেকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
কিন্তু, এই নির্বাচনের আগে আগেই নারীরা রাজপথে বের হয়েছে নিজেদের অধিকার আদায়ে। তারা শ্লোগান দিচ্ছে, ‘রক্ত দিল জনতা, এবার চাই সমতা’।
শেখ হাসিনার শাসনামলে সবচেয়ে দমন–পীড়নের শিকার রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে জামায়াতে ইসলামীকে অন্যতম উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়, ওই সময় নির্বাচনে কারচুপি হতো এবং বিরোধীদের ওপর দমন–পীড়ন চলত। জামায়াতে ইসলামী একটি ইসলামপন্থী দল, যারা বাংলাদেশে শরিয়াহ আইন প্রবর্তনে বিশ্বাসী। হাসিনার শাসনামলে দলটির নেতাদের কেউ কারাবন্দী হয়েছিলেন, কেউ গুমের শিকার আবার কেউ মৃত্যুদণ্ডের মুখোমুখি হয়েছিলেন।
শেখ হাসিনার পতনের পর জামায়াতে ইসলামী নজিরবিহীন উদ্যমে সক্রিয় হয়ে উঠেছে এবং নিজেকে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে উপস্থাপন করছে। অথচ আগে ধারণা করা হচ্ছিল যে নির্বাচনে বিএনপি সহজ জয় পাবে।
সীমিতসংখ্যক জরিপের ফলাফলও ইঙ্গিত দিচ্ছে যে বিএনপি সম্ভবত নির্বাচনে জয়ী হবে। তবে জামায়াতে ইসলামী নির্বাচনে অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি ভোট পাবে। দলটি নির্বাচনের পর গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হবে।
ক্রাইসিস গ্রুপের বাংলাদেশবিষয়ক সিনিয়র কনসালট্যান্ট টমাস কিন বলেন, বড় বিরোধী দল হিসেবে হোক কিংবা ক্ষমতাসীন সরকার হিসেবেই হোক, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে একটি প্রভাবশালী ইসলামপন্থী দল কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করবে বলে মনে হচ্ছে।
সমালোচকেরা বলছেন, ইতিমধ্যে সমাজে রক্ষণশীল ইসলামপন্থী রাজনীতির উত্থান ঘটেছে। গ্রামাঞ্চলে মেয়েদের ফুটবল খেলায় ধর্মীয় নেতাদের বাধা দিতে দেখা গেছে। তাঁরা নারীদের ফুটবল খেলাকে ‘অশ্লীল’ বলে উল্লেখ করেছেন।
এ ছাড়া নারীরা অভিযোগ করেছেন, মাথার চুল ঢেকে না রাখা ও পোশাককে কেন্দ্র করে তাঁদের সহিংসতা ও হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে।
জামায়াতে ইসলামী সংস্কার, হয়রানি থেকে নারীদের নিরাপত্তা দেওয়া ও সুষ্ঠু রাজনীতির প্রতিশ্রুতি দিলেও দলটির পক্ষ থেকে একজন নারী প্রার্থীও নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন না। এ বিষয়ে দলের নেতা শফিকুর রহমানের বক্তব্য প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে।
আল–জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে শফিকুর রহমান বলেছেন, কোনো নারী কখনোই দলটির নেতা হতে পারবেন না। কারণ, এটা অনৈসলামিক। এ ছাড়া গত বছর তাঁর করা একটি মন্তব্য নিয়ে আবারও আলোচনা তৈরি হয়েছে। তিনি বৈবাহিক ধর্ষণের অস্তিত্ব থাকার কথা অস্বীকার করেছিলেন। তিনি তখন দুজন অসৎ নারী–পুরুষের বিবাহবহির্ভূত যৌন সম্পর্ককে ‘ধর্ষণ’ বলে উল্লেখ করেছিলেন।
জামায়াতে ইসলামীর প্রস্তাবিত নীতিগুলোর একটি হলো, নারীদের কর্মঘণ্টা আট ঘণ্টা থেকে কমিয়ে পাঁচ ঘণ্টা করা। বাকি তিন ঘণ্টার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে ভর্তুকি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের কর্মজীবী জনসংখ্যার ৪৪ শতাংশ নারী, যা দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বোচ্চ।
শেখ হাসিনাকে উৎখাতকারী ছাত্রনেতাদের নিয়ে গঠিত দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) গত ডিসেম্বরে ঘোষণা দেয়, তারা জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে ঐক্যবদ্ধভাবে নির্বাচনে অংশ নেবে। এতে হতাশা আরও বেড়েছে। কারণ, এই দল নিজেদের প্রগতিশীল দল হিসেবে উপস্থাপন করেছিল। দলটি নারীদের অগ্রভাগে রেখে একটি রাজনৈতিক বিকল্প হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিল। অথচ তারা এখন কেবল দুজন নারীকে নির্বাচনে প্রার্থী করেছে।
জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে এনসিপির নির্বাচনী ঐক্য গঠনকে কেন্দ্র করে কয়েকজন নারী এনসিপি থেকে সরে গেছেন।
বাংলাদেশের ৯১ শতাংশ মানুষ মুসলিম হলেও ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা লাভের পর থেকে এ দেশ ধর্মনিরপেক্ষ অবস্থান বজায় রেখেছে। দেশটি প্রতিষ্ঠার সময় থেকে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ করা হলেও ১৯৭৫ সালের পর সামরিক শাসনের সময় এর প্রাধান্য ছিল। পরে ২০১১ সালে সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা পুনঃপ্রবর্তন করা হয়।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, এখন যারা জামায়াতে ইসলামীকে সমর্থন দিচ্ছেন, তাঁদের মধ্যে অনেকেই রাজনীতির পুরোনো নেতৃত্বের প্রতি হতাশ। ১৯৭১ সালের পর থেকে দেশে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি এ দুই প্রধান দলের মধ্যে ক্ষমতার পালাবদল ঘটেছে। এ দুই দলের বিরুদ্ধেই পরিবারকেন্দ্রিক রাজনীতি ও ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে।
জামায়াতে ইসলামী বিশেষ করে তরুণ ও প্রথমবার ভোট দিতে যাওয়া ভোটারদের মধ্যে জনপ্রিয়তা পেয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। এমন ভোটারের পরিমাণ ৪২ শতাংশ। তাঁরা পরিবর্তনের জন্য অধীর আগ্রহী।
বিশ্লেষকেরা বলেন, হাসিনার শাসনের কর্তৃত্ববাদী প্রকৃতির কারণে ভোটাররা ইসলামপন্থী রাজনীতির দিকে ঝুঁকে পড়েছেন।
মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে