Views Bangladesh Logo

মিশরের ৯২ বছরের বিশ্বকাপ যাত্রা

গল্পটা শুরু হয় ১৯৩৪ সালের ইতালিতে, নাপোলির এক মাঠে, যেখানে মিশর হয়ে ওঠে আফ্রিকা ও আরব বিশ্বের প্রথম দেশ যারা বিশ্বকাপের মূল আসরে পা রাখল। প্রতিপক্ষ হাঙ্গেরি। সেদিন এক তরুণ ফরোয়ার্ড, আব্দুলরহমান ফাউজি, জোড়া গোল করে ইতিহাসে নাম লিখিয়ে ফেলেন — বিশ্বকাপে গোল করা প্রথম আফ্রিকান ফুটবলার হিসেবে। কিন্তু গল্পের নায়ক হয়েও শেষরক্ষা হয় না, ৪-২ গোলে হেরে যায় মিশর। তখনকার নিয়মে গ্রুপ পর্বের বালাই ছিল না, সরাসরি নকআউট থেকেই শুরু — তাই কৌতুকের ছলে বলা যায়, মিশরের প্রথম ম্যাচটাই ছিল তাদের প্রথম 'রাউন্ড অফ ১৬'। কিন্তু সেই একটামাত্র ম্যাচের পরই ফারাওরা তলিয়ে যায় বিস্মৃতির অতলে, আর বিশ্ব ফুটবলের মানচিত্র থেকে তাদের নাম মুছে যেতে থাকে বছরের পর বছর।

এরপর আসে এক দীর্ঘ, ক্লান্তিকর নীরবতা। যুদ্ধ, রাজনৈতিক টানাপোড়েন, আফ্রিকান ফুটবলের প্রান্তিক অবস্থান — সব মিলিয়ে মিশরকে বিশ্বকাপের মূল মঞ্চে ফিরতে অপেক্ষা করতে হয় পুরো ৫৬ বছর। ১৯৯০ সালে যখন তারা আবার ফেরে, ততদিনে সেটাই হয়ে দাঁড়ায় বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে দীর্ঘ প্রত্যাবর্তন-অপেক্ষা।

সেবার মিশর দেখায় এক জেদি, রক্ষণাত্মক মুখ — নেদারল্যান্ডসের সঙ্গে ১-১, আয়ারল্যান্ডের সঙ্গে ০-০, লড়াই করার মতো ফুটবল। কিন্তু ইংল্যান্ডের বিপক্ষে মার্ক রাইটের একটিমাত্র গোল আবার থামিয়ে দেয় স্বপ্নটাকে, গ্রুপ পর্বের বাইরে আর যাওয়া হয় না।

আরও আটাশ বছর কেটে যায়। ২০১৮ সালে রাশিয়ায় মিশর যখন ফেরে, সঙ্গে থাকে এক নতুন আশা — মোহাম্মদ সালাহ, যিনি তখন লিভারপুলে সবেমাত্র এক বিস্ফোরক মৌসুম কাটিয়ে বিশ্বসেরাদের কাতারে নাম লিখিয়েছেন। সবাই ভেবেছিল, এবার বুঝি ইতিহাস বদলে যাবে। কিন্তু কাঁধের চোট নিয়ে মাঠে নামা সালাহ একা যথেষ্ট হননি — উরুগুয়ে, রাশিয়া, সৌদি আরব, তিন ম্যাচেই হার। তবু সেই আসর থেকে একটা দৃশ্য চিরকালের মতো গেঁথে যায় স্মৃতিতে: পঁয়তাল্লিশ বছর বয়সী গোলরক্ষক এসাম এল-হাদারি, বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে বয়স্ক খেলোয়াড় হয়ে সৌদি আরবের বিপক্ষে একটা পেনাল্টি ঠেকিয়ে দিচ্ছেন, যদিও দল শেষ পর্যন্ত মাঠ ছাড়ে হার নিয়েই।

তারপর আসে ২০২৬। যুক্তরাষ্ট্র-কানাডা-মেক্সিকোর যৌথ আয়োজনে বিশ্বকাপে মিশর হাজির হয় সম্পূর্ণ ভিন্ন এক চেহারায়। সালাহ তখনও দলের হৃদপিণ্ড, কিন্তু তার চারপাশে এবার গড়ে উঠেছে অনেক বেশি সংগঠিত, অনেক বেশি পরিণত একটা দল, কোচ হোসাম হাসানের হাত ধরে। জি গ্রপে প্রতিপক্ষ বেলজিয়াম, ইরান আর নিউজিল্যান্ড। প্রথম ম্যাচেই বেলজিয়ামের বিপক্ষে ইমাম আশুরের একটা দুর্দান্ত বিশ গজের শটে এগিয়ে গিয়েও শেষরক্ষা হয় না পুরোপুরি — বদলি নামা রোমেলু লুকাকুর প্রথম স্পর্শেই মোহাম্মদ হানির আত্মঘাতী গোলে সমতা ফেরে, ম্যাচ শেষ হয় ১-১ ড্রয়ে। এরপর নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচ, যেখানে ১-০ পিছিয়ে পড়েও সালাহ নিজেই গোল করে দলকে ফেরান এবং ট্রেজেগের গোলে সহায়তা করে জয় নিশ্চিত করেন ৩-১ ব্যবধানে — বিশ্বকাপের মূল আসরে মিশরের ৯২ বছরের ইতিহাসে এটাই তাদের প্রথম জয়। শেষ ম্যাচে ইরানের বিপক্ষে ১-১ ড্র হলেও গোল ব্যবধানের হিসাবে মিশর গ্রুপ রানার্স-আপ হয়ে জায়গা করে নেয় নকআউট পর্বে।

তারপর আসে ডালাসের সেই রাত। রাউন্ড অফ ৩২-এ প্রতিপক্ষ অস্ট্রেলিয়া। মাত্র তেরো মিনিটেই ইমাম আশুরের দুর্দান্ত হেডারে এগিয়ে যায় মিশর, করিম হাফেজের নিখুঁত ক্রস থেকে। কিন্তু বিরতির পর ফিরে আসে সেই পুরনো ভূত — আবারও মোহাম্মদ হানির আত্মঘাতী গোলে সমতা ফেরায় অস্ট্রেলিয়া। ১-১ স্কোরলাইন টিকে থাকে অতিরিক্ত সময় পেরিয়েও। শেষ মুহূর্তে রামি রাবিয়ার একটা হেডার অস্ট্রেলিয়ান গোলরক্ষক প্যাট্রিক বিচের অবিশ্বাস্য এক সেভে আটকে যায় — সম্ভবত পুরো টুর্নামেন্টের অন্যতম সেরা সেভ, আর তার সঙ্গেই ম্যাচ গড়ায় পেনাল্টি শুট-আউটে।

অস্ট্রেলিয়ার প্রথম সর্ট জালে জড়াতে ব্যর্থ,
মাহমুদ সাবেরের প্রথম শটেই এগিয়ে যায় মিশর। অস্ট্রেলিয়ার জ্যাকসন আরভিন সমতা ফেরান, কিন্তু রামি রাবিয়া আবার এগিয়ে দেন দলকে। আওয়ের মাবিল অস্ট্রেলিয়াকে ফের সমতায় ফেরালে পালা আসে সালাহর — নিজের প্রথম বিশ্বকাপ পেনাল্টিটা তিনি ঠান্ডা মাথায় জালে জড়ান। অস্ট্রেলিয়ার চতুর্থ শট নষ্ট হয় হেরিংটনের পা থেকে। আর তখন এগিয়ে আসেন হোসাম আবদেলমাগিদ — শেষ শট, ৯২ বছরের অপেক্ষার শেষ শট। বল জালে জড়াতেই ডালাসের স্টেডিয়াম জুড়ে বিস্ফোরিত হয় লাল-সাদা-কালোর উল্লাস। ৪-২ ব্যবধানে পেনাল্টিতে জিতে মিশর সেদিন এমন কিছু অর্জন করে, যা তারা কখনো পারেনি — বিশ্বকাপে প্রথম নকআউট জয়, আর প্রথমবারের মতো রাউন্ড অফ ১৬-তে জায়গা। ১৯৩৪ সালের সেই একমাত্র ম্যাচের ৯২ বছর পর, ফারাওরা অবশেষে পেরিয়ে যায় নিজেদের সবচেয়ে বড় সীমারেখা।

এই জয়ে মিশর হয়ে ওঠে এবারের বিশ্বকাপে রাউন্ড অফ ১৬-তে পা রাখা দ্বিতীয় আফ্রিকান দেশ। পরের প্রতিপক্ষ আর্জেন্টিনা অথবা কেপ ভার্দে — যে দলই জিতুক না কেন, মিশরের সামনে অপেক্ষা করছে আরও এক কঠিন পরীক্ষা। কিন্তু ডালাসের সেই রাতের পর একটা কথা স্পষ্ট হয়ে গেছে — সালাহর প্রজন্মের হাত ধরে মিশরের ফুটবল ইতিহাস আর আগের মতো নেই। ফারাওরা এখন শুধু অংশগ্রহণকারী নয়, প্রতিদ্বন্দ্বী।

মতামত দিন

Avatar

ট্রেন্ডিং ভিউজ