দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন
গুজব রোধে চাই কার্যকর ভূমিকা
গুজব বিষয়ে কোনো কিছু লিখতে চাইলে প্রথমেই কবি শামসুর রাহমানের ‘পণ্ডশ্রম’ কবিতাটির সেই বিখ্যাত চরণের কথা মনে পড়ে, ‘এই নিয়েছে ঐ নিল যাঃ! কান নিয়েছে চিলে, চিলের পিছে মরছি ঘুরে আমরা সবাই মিলে।’ আসলেই আমরা নিজের কানে হাত না দিয়ে, চিলে আমাদের কান নিয়েছে তার পিছনে ঘুরে বেড়াই। অবশেষে যা হয়, তা হলো ‘পণ্ডশ্রম’। কিন্তু জাতীয় নির্বাচন কেন্দ্রিক গুজব খুবই ভয়াবহ। এই গুজবের মধ্যে নির্দিষ্ট একটি মহল তাদের স্বার্থ হাসিল করে ফেলতে পারেন। যেমন এবারের নির্বাচনের আগে সবচেয়ে আলোচিত গুজব হচ্ছে ‘নির্বাচন হচ্ছে না’। তাই সতর্কতা জরুরি।
গুজব আমাদের সমাজে আতীতে ছিল, এখনো আছে, হয়তো ভভিষ্যতে থাকবে। আর অপপ্রচারের মতো মিথ্যাচার আমাদের সমাজ-রাষ্ট্র-রাজনীতিকে দারুণভাবে কলুষিত করছে প্রতিনিয়ত। এমনকি এই গুজবের শক্তি এতই বেশি যে মানুষ হিতাহিত জ্ঞান পর্যন্ত হারিয়ে ফেলে। এ থেকে শুরু হয় হানাহানি, কখনোবা প্রাণহানির ঘটনাও ঘটে।
সম্প্রতি দেশে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে গুজব ও অপপ্রচার বেড়েছে, আরও বাড়তে পরে। কারণ কয়েক দিন পর জাতীয় নির্বাচন। রাজনীতি আর গুজবকে অনেকে একাকার করে ফেলেছেন।
আশার কথা হচ্ছে, দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য করতে ভোটের দিন নানা ধরনের গুজবের বিষয়ে সতর্ক থাকতে ইতোমধ্যে নির্বাহী হাকিমদের নির্দেশ দিয়েছেন জননিরাপত্তা বিভাগ। সে ক্ষেত্রে আমরা যদি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মিথ্যা চিহ্নিত করার বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠান রিউমার স্কানারের সবশেষ রিপের্টটাও দেখি, সেখানেও বলা হচ্ছে, অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ক্রমশ বাড়ছে নির্বাচনকেন্দ্রিক গুজব ছড়ানোর হার। রিউমার স্কানার বলছে, নির্বাচন ঘিরে গত তিন মাসে সর্বোচ্চ ৫৬টি গুজব ছড়ানো হয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে জড়িয়ে। এতে ব্যবহার হয়েছে ফেসবুক ও ইউটিউব। শেখ হাসিনাকে নিয়ে জড়িয়ে গুজব ছড়ানোর পাশাপাশি বাংলাদেশ পুলিশ নিয়ে ২৪টি, প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে নিয়ে ১৮টি, কূটনীতিক, বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংগঠন নিয়ে ১৭টি গুজব চিহ্নিত হয়েছে। তারা বলছে, মোট রাজনৈতিক গুজবের ৮৩.৭০ শতাংশ জাতীয় নির্বাচনকেন্দ্রিক।
এতো গেলো, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের গুজব। নির্বাচন যত কাছে আসছে হাটে মাঠে ঘাটে গুজবীদের তৎপরতা তত বাড়ছে। এই গুজবের ধারা অবশ্য আমাদের নির্বাচনী সংস্কৃতিতে অনেক পুরোনো। রাস্তায়, চায়ের আড্ডায়, গণপরিবহনে মুখেমুখে ছড়ায় এসব গুজব। একেক যায়গায় একেক রকমের গুজব। এর তালিকায় থাকে প্রতিপক্ষের ব্যক্তিগত জীবন যাপন থেকে শুরু করে পেশাগত জীবনের নানা অপব্যাখ্যা। এক্ষেত্রে ধর্মের অপব্যবহারও খুব জনপ্রিয়।
এমতাবস্থায় কর্তৃপক্ষকে সরকার ও সমাজ সমষ্টিগতভাবে ভুয়া তথ্য মোকাবিলায় যা-ই করুক না কেন, এ ফাঁদ থেকে মুক্তি পেতে ব্যক্তি মানুষকেই সবার আগে সচেতন হতে হবে। জানতে হবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে থেকে কোন তথ্য নিতে হবে, কোন তথ্যটিকে দেখামাত্র ডিলিট করে দিতে হবে। সেই সঙ্গে যখন যেখানে যে পদক্ষেপ গ্রহণ করার দরকার, সময়ক্ষেপণ না করে তাৎক্ষণিকভাবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সে ধরনের পদক্ষেপ নিতে হবে। মাঠে প্রায় ৩ হাজার নির্বাহী ও বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেটরা কাজ করবেন, তাদের দায়িত্ব অনেক বেশি। এ নির্বাচন শুধু ১৮ কোটি মানুষ দেখছে তা নয়, দেখছে সমগ্র বিশ্ব। আমরা কীভাবে নির্বাচন করব, কতটুকু গ্রহণযোগ্য হবে, এইটা তারা মূল্যায়ন করবে। সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের কোনো বিকল্প নেই। তাই গুজব রোধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে।

মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে