Views Bangladesh Logo

প্রস্তাবিত সাইবার সুরক্ষা আইন নিয়ে সম্পাদক পরিষদের ১২ দফা সুপারিশ

প্রস্তাবিত সাইবার সুরক্ষা আইনে স্বাধীন সাংবাদিকতা, জনস্বার্থে তথ্য প্রকাশ ও বৈধ মতপ্রকাশের সুরক্ষা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে সম্পাদক পরিষদ। এ লক্ষ্যে আইনের বিভিন্ন ধারা সংশোধন ও সংযোজনের জন্য ১২ দফা সুপারিশ করেছে সংগঠনটি।

রোববার সম্পাদক পরিষদের সভাপতি নূরুল কবির ও সাধারণ সম্পাদক দেওয়ান হানিফ মাহমুদের স্বাক্ষরিত এক বিবৃতিতে এসব সুপারিশের কথা জানানো হয়। সুপারিশগুলো তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রীর কাছে পৌঁছে দিতে প্রধান তথ্য কর্মকর্তা সৈয়দ আবদাল আহমদের দপ্তরে জমা দেওয়া হয়েছে।

সম্পাদক পরিষদ মনে করে, সাইবার অপরাধ মোকাবিলায় কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি সাংবাদিকতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সুরক্ষিত রাখতে হবে। কনটেন্ট অপসারণ বা ব্লক করা, গ্রেপ্তার, তল্লাশি, জব্দ, নজরদারি এবং ডিজিটাল তথ্যের ওপর হস্তক্ষেপের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, সুনির্দিষ্ট আইনি ভিত্তি, দ্রুত বিচারিক তদারকি ও কার্যকর প্রতিকারের ব্যবস্থা থাকা জরুরি।

সুপারিশগুলোর মধ্যে রয়েছে—পেশাগত দায়িত্বের অংশ হিসেবে জনস্বার্থে প্রকাশিত সংবাদ, অনুসন্ধানী প্রতিবেদন, বিশ্লেষণ ও মতামতকে শুধু বিষয়বস্তু বা সমালোচনামূলক অবস্থানের কারণে সাইবার অপরাধ হিসেবে গণ্য না করা। ন্যায্য সমালোচনা, রাজনৈতিক বক্তব্য, ব্যঙ্গ, কার্টুন, প্যারোডি, ভোক্তার অভিযোগ ও অনিচ্ছাকৃত ভুলের কারণে কাউকে অপরাধী সাব্যস্ত করা যাবে না। মতপ্রকাশ-সংশ্লিষ্ট অপরাধকে অজামিনযোগ্য না করারও সুপারিশ করেছে সংগঠনটি।

সাংবাদিকতার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত অভিযোগে গ্রেপ্তার, তল্লাশি, জব্দ, ডিজিটাল ডিভাইস বা তথ্য-উপাত্তে প্রবেশ এবং নজরদারির আগে আদালতের অনুমোদন বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব দিয়েছে সম্পাদক পরিষদ। জরুরি পরিস্থিতিতে ব্যবস্থা নেওয়া হলে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে আদালতের অনুমোদন বা পর্যালোচনার বিধান রাখার সুপারিশও করা হয়েছে। এ ধরনের মামলা জামিনযোগ্য করার কথা বলেছে সংগঠনটি।

ভুল তথ্য, অপতথ্য ও গুজবকে আইনে পৃথকভাবে সংজ্ঞায়িত করার ওপরও গুরুত্ব দিয়েছে সম্পাদক পরিষদ। কোনো তথ্য শুধু অযাচাইকৃত বা অসমর্থিত হওয়ার কারণে তাকে অপরাধের উপাদান হিসেবে গণ্য করা যাবে না বলে মনে করে তারা। বুলিং, মানহানি, হেয়প্রতিপন্ন করা, রাষ্ট্রের জন্য অবমাননাকর বক্তব্য, বিদেশি রাষ্ট্রের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ক্ষুণ্ন, যৌন হয়রানি ও সেক্সটর্শনের মতো বিষয়েও স্পষ্ট সংজ্ঞা দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।

দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, আর্থিক অনিয়ম, পরিবেশগত ক্ষতি, জনস্বাস্থ্য, ভোক্তার অধিকার, সরকারি ব্যয় এবং সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম নিয়ে সংবাদ ও অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের ক্ষেত্রে জনস্বার্থের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে বলেছে সম্পাদক পরিষদ। সরকার, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, সরকারি কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধি বা সরকারি নীতির সমালোচনা, রাজনৈতিক মতামত, বিশ্লেষণ ও ব্যঙ্গকে সাইবার অপরাধ হিসেবে গণ্য না করারও সুপারিশ করেছে সংগঠনটি। ‘রাষ্ট্রকে হেয়প্রতিপন্ন করা’র মতো অস্পষ্ট শব্দবন্ধ আইন থেকে বাদ দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।

কোনো সংবাদ, পোস্ট, ভিডিও বা ডিজিটাল কনটেন্ট অপসারণ কিংবা ব্লক করার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট আইনি ভিত্তি, লিখিত কারণ এবং প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করতে হবে। জরুরি পরিস্থিতি ছাড়া সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দিতে হবে। এসব আদেশের বিরুদ্ধে আপিল ও বিচারিক পর্যালোচনার ব্যবস্থা এবং কনটেন্ট অপসারণ বা ব্লক করার তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশের সুপারিশও করেছে সম্পাদক পরিষদ।

অনলাইনে মানহানির অভিযোগকে নতুন ও অধিকতর কঠোর সাইবার অপরাধ হিসেবে বিবেচনা না করে বিদ্যমান কাঠামোয় প্রেস কাউন্সিলে পাঠানোর প্রস্তাব দিয়েছে সংগঠনটি। সংবাদ প্রকাশ, মতপ্রকাশ, মানহানি বা সাংবাদিকতার বিষয়বস্তু-সংক্রান্ত অভিযোগের বিচার মোবাইল কোর্ট বা নির্বাহী কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে না করার সুপারিশ করা হয়েছে।

কোনো প্রতিবেদন বা প্রকাশনার কারণে পুরো সংবাদমাধ্যমের কার্যক্রম বন্ধ, নিবন্ধন বাতিল কিংবা প্রতিষ্ঠানকে অযৌক্তিক শাস্তি দেওয়া যাবে না বলেও মত দিয়েছে সম্পাদক পরিষদ। এসব বিষয় প্রেস কাউন্সিলের আওতায় রাখার পাশাপাশি সাংবাদিকের তথ্যসূত্রের গোপনীয়তা রক্ষার আহ্বান জানিয়েছে তারা।

সাংবাদিকতা, সংবাদ প্রকাশ, পেশাগত আচরণ ও নৈতিকতা-সংক্রান্ত অভিযোগের ক্ষেত্রে, অভিযোগের ধরন অনুযায়ী, সরাসরি ফৌজদারি ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিলের বিদ্যমান অভিযোগ ও অনুসন্ধান প্রক্রিয়াকে কার্যকর করার সুপারিশ করেছে সংগঠনটি। এ জন্য প্রেস কাউন্সিলের এখতিয়ার ও কার্যকারিতা আধুনিকায়ন করে প্রাসঙ্গিক ডিজিটাল সংবাদমাধ্যমকেও এর আওতায় আনার কথা বলা হয়েছে।

এ ছাড়া জাতীয় সাইবার সুরক্ষা কাউন্সিলকে কার্যকর ও স্বাধীন তদারকির উপযোগী করার প্রস্তাব দিয়েছে সম্পাদক পরিষদ। কাউন্সিলে সাইবার নিরাপত্তা, আইন ও মানবাধিকার বিশেষজ্ঞদের পাশাপাশি গণমাধ্যম ও সম্পাদকীয় নেতৃত্বের অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্তি, সদস্যদের স্বাধীনতা, ক্ষমতার সীমা এবং সিদ্ধান্তের জবাবদিহি নিশ্চিত করার সুপারিশ করা হয়েছে।

সম্পাদক পরিষদের মতে, সাইবার নিরাপত্তা, সাইবার অপরাধ ও ডিজিটাল পরিসরে সাংবাদিকতা পৃথক বিষয়। প্রস্তাবিত সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইনে এসব বিষয়ের সীমারেখা অনেক ক্ষেত্রে স্পষ্ট নয়, যা স্বাধীন ও দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার জন্য বাধা এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতার জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।

বিবৃতিতে সংগঠনটি বলেছে, স্বচ্ছতা, বিচারিক তদারকি, জবাবদিহি ও কার্যকর প্রতিকারের নিশ্চয়তার মাধ্যমে ভারসাম্যপূর্ণ ও জনবান্ধব সাইবার আইন প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের মতামত বিবেচনায় নিয়ে আইনটি পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছে সম্পাদক পরিষদ, যাতে সাইবার অপরাধ মোকাবিলার পাশাপাশি স্বাধীন সাংবাদিকতা, জনস্বার্থে তথ্য প্রকাশ ও বৈধ মতপ্রকাশের অধিকারও সুরক্ষিত থাকে।

মতামত দিন

Avatar

ট্রেন্ডিং ভিউজ