সেই মুসাদ্দিক ও জুবায়েরকে ‘পেটাল’ ছাত্রদল
ফেসবুকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তার মেয়ের আপত্তিকর ছবি ছড়ানোর অভিযোগকে কেন্দ্র করে রাজধানীর শাহবাগ থানার সামনে ডাকসু বিতর্কিত নেতা যুবাইর বিন নেছারী (এ বি জুবায়ের) ও মুসাদ্দিক আলী ইবনে মোহাম্মদকে ‘পেটাল’ ছাত্রদল। আজ বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার পর এ ঘটনা ঘটে।
এসময় ছাত্রদল ও ছাত্র শিবিরের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে উত্তেজনা দেখা দেয়। এতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিক সমিতির বেশ কয়েকজন সদস্যও আহত হন।
ঘটনার পর এ বি জুবায়ের ও মুসাদ্দিককে উদ্ধার করে শাহবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) কক্ষে নেওয়া হয়। থানার সামনে ছাত্রদলের নেতা–কর্মীসহ বিক্ষুব্ধ একদল লোক অবস্থান নেন।
এ বিষয়ে ডাকসুর সাধারণ সম্পাদক ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক এস এম ফরহাদ অভিযোগ করেন, ছাত্রদলের নেতা–কর্মীরা বহিরাগতদের নিয়ে এ বি জুবায়ের ও মুসাদ্দিকের ওপর হামলা করেছেন।
জানা গেছে, সম্প্রতি ঈশান চৌধুরী নামের একটি আইডি থেকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তার কন্যাকে নিয়ে কুরুচিপূর্ণ পোস্ট দেওয়া হয়। এরপর অরণ্য আবির নামের একটি আইডি থেকে ইসলামী ছাত্রশিবিরের প্যানেল থেকে ডাকসুর কার্যনির্বাহী সদস্য পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ পোস্ট দেন বলে অভিযোগ ওঠে।
ছাত্রদলের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার আন্তর্জাতিক সম্পাদক মেহেদী হাসান গণমাধ্যমকে বলেন, ‘ফেসবুক পোস্টকে কেন্দ্র করে এ ঘটনা ঘটে। জাইমা রহমানকে নিয়ে ভুয়া ফটোকার্ড ছড়ানোর প্রতিবাদে প্রমাণসহ শাহবাগ থানায় আসি আমরা। এসময় এসব প্রমাণ ভুয়া দাবি করে রাত ৮টার দিকে রাজধানীর শাহবাগ থানায় জিডি করতে যান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) শিবির প্যানেলের প্রার্থী আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ ও মাস্টারদা সূর্যসেন হলের কার্যনির্বাহী সদস্য সাইয়েদুজ্জামান আলভি। সঙ্গে এ বি জুবায়েরসহ ছাত্রশক্তি ও শিবিরের অন্যান্য নেতা–কর্মীরা থানায় আসলে সেখানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীরা ও বিক্ষুব্ধ জনতা তাদের মারধরের চেষ্টা করে। কিন্তু সেখানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাহিদুজ্জামান শিপনসহ ছাত্রদলের নেতা–কর্মীরা ঢাল হয়ে দাঁড়ায়।’
ছাত্রদলের আরেক নেতা বলেন, ‘আমরা জাইমা রহমানকে নিয়ে ভুয়া ফটোকার্ড ছড়ানোর প্রতিবাদে শাহবাগ থানায় আসি। এসে যে এই ফটোকার্ড ছড়িয়েছে, তাকে থানায় জিডি করতে দেখতে পাই। তখন আমরা পুলিশকে বলি তাকে হেফাজতে নিতে। এর কিছুক্ষণ পর ছাত্রদলের নেতা–কর্মীরা থানা থেকে বের হওয়ার সময় ডাকসুর কয়েকজন নেতা উসকানিমূলক কথা বলতে বলতে থানায় প্রবেশ করার চেষ্টা করে। সে সময় এই মারধরের ঘটনা ঘটে।’
এদিকে রাজধানীর শাহবাগ থানায় আটকে পড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নেতাদের উদ্ধার করতে গিয়ে ছাত্রদলের তোপের মুখে পড়েছেন ভিপি সাদিক কায়েম। ছাত্রদল নেতাকর্মীরা সাদিক কায়েমের বিরুদ্ধে গুপ্ত রাজনীতি করার অভিযোগ তোলেন। অতীতে ছাত্রলীগের রাজনীতিতে তার জড়িত থাকার ঘটনা নিয়েও ক্ষোভ জানানো হয়। ‘সাদিক কায়েমের ছাত্রলীগ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকবে না’—এমন স্লোগানও শোনা যায়।
রাত পৌনে ৯টার দিকে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি রাকিবুল ইসলাম শাহবাগ থানায় যান। পরে পুলিশ ও ছাত্রদল নেতাদের উপস্থিতিতে এ বি জুবায়েরসহ অন্যদের থানার জামে মসজিদ ফটক দিয়ে নিরাপদে বের করে নেওয়া হয়।
উল্লেখ্য, গত বছরের সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনে ইসলামী ছাত্রশিবিরের সমর্থন নিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে বিজয়ী হন দুজন— সমাজসেবা সম্পাদক পদে এ বি জুবায়ের এবং সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক পদে মুসাদ্দিক আলী ইবনে মোহাম্মদ। নির্বাচনের পর থেকেই তারা একের পর এক বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন এবং সাধারণ শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে দেশের সচেতন মহল— সকলের বিরক্তির পাত্র হয়ে ওঠেন।
দুজনেই বিভিন্ন সময়ে অশালীন ভাষায় মন্তব্য করেছেন, ক্যাম্পাসে উশৃঙ্খল কার্যক্রম চালিয়েছেন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মানুষকে আক্রমণ করতেও দ্বিধা করেননি।
তবে বিতর্কের কেন্দ্রে বেশি থেকেছেন মুসাদ্দিক। গত ডিসেম্বরে 'মার্চ টু ইন্ডিয়ান হাইকমিশন' কর্মসূচিতে তিনি 'বাবরের পথ ধরো, সেভেন সিস্টার স্বাধীন করো' স্লোগান দেন, যা ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়। একই অনুষ্ঠানে তিনি দাবি করেন যে ভারত প্রতি বছর বাংলাদেশ থেকে তাদের বাজেটের ৪০ ভাগের এক ভাগ নিয়ে যায় এবং এই অর্থপ্রবাহ বন্ধ করা হলে ভারতীয়রা না খেয়ে মরবে।
এর বাইরেও রয়েছে তার অযোগ্যতার প্রশ্ন। পহেলা বৈশাখে এক আলাপচারিতায় তার কাছে বাংলা ১২ মাসের নাম জানতে চাওয়া হলে তিনি ধারাবাহিকভাবে সেগুলো বলতে ব্যর্থ হন, যা মুহূর্তেই ভাইরাল হয়ে যায়। সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সম্পাদকের মতো দায়িত্বশীল পদে থেকে বাংলা মাসের নাম বলতে না পারায় তার যোগ্যতা ও দায়িত্ববোধ নিয়ে বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে নানামুখী বিতর্ক ও সমালোচনা চলে।
সর্বশেষ, গতকাল বুধবার (২৩ এপ্রিল) তিনি নিজেই প্রক্টর অফিসের সামনে সংবাদ সম্মেলন করে জানান যে, ছাত্রদল নেতা আলাউদ্দিন ও তার সহযোগীরা তাকে কলা ভবনের পাশে পথ রোধ করে হেনস্তা করেন এবং অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে 'দাঁত ফেলে দেওয়ার' হুমকি দেন। তবে অভিযুক্ত ছাত্রদল নেতা এই হুমকির অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেন, মুসাদ্দিক তার নামে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মিথ্যা তথ্য ছড়িয়েছিলেন, তিনি কেবল তার জবাব চেয়েছিলেন।
নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ভুলে গিয়ে এভাবে ক্রমাগত বিতর্কে জড়িয়ে পড়া দুই ডাকসু নেতার আচরণে শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি সমাজের সচেতন মানুষেরাও হতাশ ও বিরক্ত।

মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে