মেসি-এমবাপ্পের ঝলক, আন্ডারডগদের চমক: নাটকীয়তায় ভরপুর বিশ্বকাপের প্রথম সপ্তাহ
২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের পর্দা ওঠার মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যেই ফুটবল বিশ্ব পেয়েছে অসংখ্য নাটকীয় মুহূর্ত, রেকর্ড গড়া পারফরম্যান্স এবং বেশ কিছু অপ্রত্যাশিত ফলাফল। উত্তর আমেরিকার মাটিতে অনুষ্ঠিত এবারের আসরের শুরু থেকেই আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছেন লিওনেল মেসি, কিলিয়ান এমবাপ্পে, ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো এবং কয়েকটি আন্ডারডগ দল, যারা নিজেদের সামর্থ্যের ঝলক দেখিয়ে বিশ্বকাপকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে।
বিশ্বকাপ শুরুর আগে অনেকেই ধারণা করেছিলেন, বয়সের ভারে হয়তো আগের মতো জাদু দেখাতে পারবেন না লিওনেল মেসি। কিন্তু আর্জেন্টিনার অধিনায়ক প্রথম ম্যাচেই সব জল্পনা উড়িয়ে দিয়েছেন। আলজেরিয়ার বিপক্ষে দুর্দান্ত হ্যাটট্রিক করে তিনি শুধু দলকে বড় জয়ই উপহার দেননি, নিজের ক্যারিয়ারের প্রথম বিশ্বকাপ হ্যাটট্রিকও পূর্ণ করেছেন। একই সঙ্গে বিশ্বকাপ ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলদাতাদের তালিকায় শীর্ষ অবস্থানের রেকর্ডেও সমতা এনেছেন তিনি।
৩৯ বছর বয়সী মেসির পারফরম্যান্স ফুটবলপ্রেমীদের মনে আবারও সেই পুরনো প্রশ্ন তুলেছে—তিনি কি এখনও বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী ফুটবলারদের একজন? প্রথম সপ্তাহের পারফরম্যান্স বলছে, উত্তরটা নিঃসন্দেহে ‘হ্যাঁ’।
অন্যদিকে মেসির দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বী ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর শুরুটা হয়েছে হতাশাজনকভাবে। বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোর বিপক্ষে প্রত্যাশিত ছন্দে দেখা যায়নি পর্তুগাল অধিনায়ককে। ম্যাচে ১-১ গোলে ড্র করে মাঠ ছাড়ে পর্তুগাল, আর রোনালদোর নিষ্প্রভ পারফরম্যান্স নিয়ে শুরু হয় সমালোচনা।
অনেক বিশ্লেষকই প্রশ্ন তুলছেন, ৪১ বছর বয়সী এই তারকা কি তার ক্যারিয়ারের শেষ অধ্যায়ে এসে আগের ধার হারিয়ে ফেলেছেন? যদিও রোনালদোর মতো একজন ফুটবলারের ক্ষেত্রে এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো এখনই হয়তো তাড়াহুড়ো হয়ে যাবে, তবু প্রথম ম্যাচের পারফরম্যান্স প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি।
এদিকে ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপ্পে আবারও প্রমাণ করেছেন কেন তাকে বর্তমান প্রজন্মের অন্যতম সেরা ফুটবলার বলা হয়। সেনেগালের বিপক্ষে গোল করে তিনি ফ্রান্সের ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলদাতার আসনে উঠে গেছেন। মাত্র ২৭ বছর বয়সেই জাতীয় দলের হয়ে এমন কীর্তি গড়া এমবাপ্পে এখন বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতার রেকর্ড স্পর্শ থেকে মাত্র দুই গোল দূরে অবস্থান করছেন।
গোল্ডেন বুটের লড়াইটাও শুরু থেকেই জমে উঠেছে। তিন গোল করে তালিকার শীর্ষে রয়েছেন মেসি। তার পেছনে দুই গোল নিয়ে অবস্থান করছেন একাধিক তারকা। এই তালিকায় রয়েছেন ইংল্যান্ডের হ্যারি কেইন, নরওয়ের এরলিং হলান্ড এবং ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপ্পে। ফলে টুর্নামেন্ট যত এগোবে, সর্বোচ্চ গোলদাতার প্রতিযোগিতা ততই উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে উঠবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে প্রথম সপ্তাহের সবচেয়ে বড় চমক এনে দিয়েছে কেপ ভার্দে। আফ্রিকার পশ্চিম উপকূলের ছোট্ট দ্বীপদেশটি বিশ্বকাপ জয়ের অন্যতম দাবিদার স্পেনকে গোলশূন্য ড্রয়ে আটকে দিয়ে বিশ্বকে চমকে দিয়েছে। মাত্র পাঁচ লাখ জনসংখ্যার দেশটি আন্তর্জাতিক র্যাঙ্কিংয়ে স্পেনের চেয়ে ৬৫ ধাপ পিছিয়ে থাকলেও মাঠের খেলায় সেই ব্যবধানের কোনো প্রতিফলন দেখা যায়নি।
স্পেন পুরো ম্যাচজুড়ে বলের দখল ও আক্রমণে এগিয়ে থাকলেও কেপ ভার্দের সংগঠিত রক্ষণভাগ এবং গোলরক্ষকের দুর্দান্ত পারফরম্যান্স তাদের হতাশ করে। ম্যাচ শেষে কেপ ভার্দের ফুটবলারদের উদযাপন যেন কোনো শিরোপা জয়ের আনন্দের চেয়ে কম ছিল না।
চমকের তালিকায় রয়েছে কঙ্গোও। পর্তুগালের বিপক্ষে ১-১ গোলে ড্র করে তারা শুধু একটি পয়েন্টই অর্জন করেনি, দেশের ফুটবল ইতিহাসেও নতুন অধ্যায় যোগ করেছে। ইয়োনে উইসা বিশ্বকাপে কঙ্গোর ইতিহাসের প্রথম গোলটি করে নিজের নাম লিখিয়েছেন দেশের ক্রীড়া ইতিহাসে। সেই গোলের পর কিনশাসা থেকে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত আনন্দের বন্যা বয়ে যায়। একই সঙ্গে কঙ্গো দেখিয়ে দিয়েছে, বিশ্বকাপে নামী-দামি দলের বিপক্ষেও লড়াই করা সম্ভব।
প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া কুরাসাওও নজর কেড়েছে। জার্মানির কাছে ৭-১ গোলের বড় ব্যবধানে হারলেও তাদের সমর্থকদের উচ্ছ্বাসে কোনো ঘাটতি ছিল না। ছোট্ট ক্যারিবীয় দেশটির জন্য বিশ্বকাপে অংশগ্রহণই ছিল ঐতিহাসিক অর্জন। আর জার্মানির বিপক্ষে লিভানো কোমেনেন্সিয়ার করা গোলটি হয়ে উঠেছে তাদের বিশ্বকাপ ইতিহাসের প্রথম এবং সবচেয়ে স্মরণীয় মুহূর্ত।
মাঠের বাইরের গল্পগুলোও কম আকর্ষণীয় নয়। এবারের বিশ্বকাপে ফুটবলারদের মধ্যে গোলাপি বুট ব্যবহারের প্রবণতা ব্যাপকভাবে নজর কেড়েছে। বিশ্বের শীর্ষ তারকা থেকে শুরু করে অপেক্ষাকৃত কম পরিচিত খেলোয়াড়—অনেকেই উজ্জ্বল গোলাপি রঙের বুট পরে মাঠে নামছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে।
বিশ্বকাপ মানেই সমর্থকদের উৎসব, আর এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। নিউইয়র্কের রাস্তায় ব্রাজিল সমর্থকদের সবুজ-হলুদ ঢেউ, সাম্বার তালে তালে নাচ এবং পতাকার সমারোহ অনেককে রিও ডি জেনেইরোর কার্নিভালের কথা মনে করিয়ে দিয়েছে। পরে সেই উৎসবে যোগ দেন মরক্কোর সমর্থকেরাও। অন্যদিকে বোস্টনের বিভিন্ন পানশালায় স্কটল্যান্ডের সমর্থকদের সরব উপস্থিতি আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
তবে সমর্থকদের মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় চরিত্র হয়ে উঠেছে মেক্সিকোর অনানুষ্ঠানিক শুভেচ্ছাদূত ‘মার্লিন’ নামের একটি পোষা হাঁস। ক্ষুদ্রাকৃতির মেক্সিকো জার্সি এবং বিশেষ মোজা পরে বিশ্বকাপ ভেন্যুগুলোতে ঘুরে বেড়ানো এই হাঁস ইতোমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তারকা বনে গেছে। অসংখ্য দর্শক তার সঙ্গে ছবি তুলছেন এবং ভিডিও শেয়ার করছেন।
বিশ্বকাপের প্রথম সপ্তাহই বলে দিচ্ছে যে ২০২৬ সালের এই আসর হতে যাচ্ছে স্মরণীয়, রোমাঞ্চকর এবং অনিশ্চয়তায় ভরপুর। তারকাদের রেকর্ড গড়া পারফরম্যান্স, আন্ডারডগদের সাহসী লড়াই এবং সমর্থকদের বর্ণিল উপস্থিতি ইতোমধ্যেই ফুটবল বিশ্বকে মুগ্ধ করেছে। সামনে নকআউট পর্বের লড়াই যত ঘনিয়ে আসবে, বিশ্বকাপের উত্তাপও তত বাড়বে বলেই মনে করছেন ফুটবল বিশ্লেষকরা।
মতামত দিন