ঢাকার রাস্তায় শৃঙ্খলা ফেরাতে বসছে ১ হাজার ‘প্লাগ অ্যান্ড প্লে’ ক্যামেরা
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই সম্পন্ন ক্যামেরার পাশাপাশি রাজধানীর সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে এবার ১ হাজার ‘প্লাগ অ্যান্ড প্লে’ ক্যামেরা বসানোর উদ্যোগ নিয়েছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) ট্রাফিক বিভাগ। এরই মধ্যে রাজধানীর ৩০০ ফিট সড়কে এই ক্যামেরা বসানোর কাজ শুরু হয়েছে।
মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) রাজধানীর মোহাম্মদপুর বাস স্ট্যান্ড এলাকায় ট্রাফিক বিভাগের নতুন উদ্যোগ পরিদর্শনে এসে এসব তথ্য জানান ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মো. আনিছুর রহমান।
সাংবাদিকদের তিনি বলেন, “আমরা ‘প্লাগ অ্যান্ড প্লে’ পদ্ধতিতে নতুন ক্যামেরা বসানোর উদ্যোগ নিয়েছি। এআই ক্যামেরাগুলো তুলনামূলক ব্যয়বহুল হওয়ায় বাজেট সীমাবদ্ধতার মধ্যে দ্রুত বেশি এলাকা কভার করতে এই পদ্ধতি নেওয়া হয়েছে। এই ক্যামেরাগুলোর মধ্যে থাকা মেমোরি কার্ড সরাসরি ভিডিও রেকর্ড করবে। পরবর্তীতে সেসব ভিডিও দেখে আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া হবে।”
তিনি আরও জানান, পরিকল্পনা অনুযায়ী ঢাকা শহরের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে ধাপে ধাপে প্রায় ১ হাজার এই ধরনের নতুন ক্যামেরা স্থাপন করা হবে। ইতোমধ্যে ৩০০ ফিট সড়কের বিভিন্ন স্থানে এই ক্যামেরা বসানোর কাজ শুরু হয়েছে।
বিদ্যমান এআই ক্যামেরার বিষয়ে অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার বলেন, “বর্তমানে শহরের ১৬টি পয়েন্টে মোট ৩৭টি এআই ক্যামেরা চালু রয়েছে এবং সেগুলো কার্যকরভাবে পরিচালিত হচ্ছে।”
সেমি-অটোমেটিক ট্রাফিক সিগন্যালের বিষয়ে মো. আনিছুর রহমান বলেন, ‘বর্তমানে ১৩টি সিগন্যালে সেমি-অটোমেটিক ট্রাফিক ব্যবস্থা চালু আছে। তবে সবসময় তা সচল রাখা সম্ভব হয় না। মাঝেমধ্যে যান্ত্রিক ত্রুটি, ভারী বৃষ্টি বা অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির কারণে সিস্টেম বন্ধ রাখতে হয়। একই শহরে মোটরচালিত ও অ-মোটরচালিত যানবাহনের সমন্বয় করা অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে কিছু ক্ষেত্রে বাধ্য হয়ে সিগন্যাল সিস্টেম বন্ধ রাখতে হয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘নির্দেশনা অনুযায়ী খুব অল্প সময়ের মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের (ডিএনসিসি) আওতায় আরও ৫০টি সিগন্যাল চালুর প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। প্রয়োজনীয় অবকাঠামো প্রস্তুত হলেই আমরা সেগুলো চালু করতে পারব।’
সড়কে শব্দদূষণ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে অতিরিক্ত কমিশনার বলেন, ‘অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, কোনো যানজট না থাকলেও অ্যাম্বুলেন্সসহ বিভিন্ন গাড়ি অপ্রয়োজনে হুটার বাজাচ্ছে। এই অতিরিক্ত শব্দদূষণ আমাদের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। ট্রাফিক পুলিশের শ্রবণশক্তি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। শুধু কান নয়— ফুসফুসের সমস্যা, মানসিক চাপ, মাথাব্যথা, পিঠের ব্যথাসহ নানা শারীরিক সমস্যায় আমরা আক্রান্ত হচ্ছি। এই ক্ষতি অর্থ দিয়ে পূরণ করা সম্ভব নয়। তাই আমাদের সবাইকে মিলেই এই শহরকে বাঁচাতে হবে। সড়কে শৃঙ্খলা না ফিরলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য শহর রেখে যাওয়া সম্ভব হবে না। এই কারণে অবৈধ হুটার, হাইড্রোলিক হর্ন এবং অবৈধ লাইট ব্যবহারের বিরুদ্ধে আমাদের অভিযান চলছে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে নিয়ম ভাঙার প্রবণতা এখনও অনেক বেশি। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে আমাদের সবাইকে সচেতন হতে হবে।”
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, গড়ে প্রতি মাসে ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগের পক্ষ থেকে ৫০ হাজারের বেশি মামলা হয়। আর এসব মামলা থেকে জরিমানা বাবদ বছরে প্রায় ১২০ কোটি টাকা আদায় হয়।
এদিকে মোহাম্মদপুর বাস স্ট্যান্ড এলাকার যানজট নিরসনে একটি বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে ট্রাফিক তেজগাঁও বিভাগ। বাস স্ট্যান্ড সংলগ্ন ধানমন্ডি থেকে বসিলাগামী সড়কের একটি রোড ডিভাইডার (সড়ক বিভাজক) সরিয়ে নেওয়া হয়েছে এবং তিনটি সিগন্যালের জায়গায় দুটি সিগন্যাল চালু করা হয়েছে। ট্রাফিক পুলিশের প্রত্যাশা, এর ফলে ওই এলাকার যানজট লক্ষণীয়ভাবে কমবে।
এই বিষয়ে ট্রাফিক তেজগাঁও বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ড এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে তীব্র যানজটের কারণে মানুষের চরম ভোগান্তি হচ্ছিল। এই ভোগান্তি কিছুটা কমানোর লক্ষ্যে ট্রাফিক বিভাগের পক্ষ থেকে আমরা কিছু পরিবর্তন এনেছি। এখানে আগে রাস্তার মাঝখানে একটি আইল্যান্ড ছিল, সেটি অপসারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি বিদ্যমান সিগন্যাল সিস্টেমেও পরিবর্তন আনা হয়েছে— একটি সিগন্যাল কমিয়ে দেওয়া হয়েছে।’
তিনি জানান, নতুন এই ব্যবস্থার ফলে ধানমন্ডি পশ্চিম দিক থেকে আসা যানবাহনগুলো সরাসরি ডানদিকে মোড় নিতে পারবে না। তাদের সোজা গিয়ে ময়ূর ভিলার সামনে ইউ-টার্ন নিয়ে আসাদ গেট এলাকায় প্রবেশ করতে হবে। এর ফলে একটি সিগন্যাল কমে যাওয়ায় যানবাহনগুলোকে আর দীর্ঘ সময় আটকে থাকতে হবে না এবং যান চলাচল স্বাভাবিক থাকবে।
এ প্রসঙ্গে অতিরিক্ত কমিশনার মো. আনিছুর রহমান বলেন, ‘এই পরিবর্তনের ফলে এলাকার মানুষের কষ্ট কিছুটা লাঘব হবে বলে আমরা আশা করছি। রাস্তার ধারণক্ষমতা তুলনামূলক কম হলেও যানবাহনের চাপ অনেক বেশি। তাই আমরা চেষ্টা করেছি যেন এই রাস্তার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা যায় এবং মানুষের ভোগান্তি কমে।’
‘প্লাগ অ্যান্ড প্লে’ ক্যামেরা হলো এমন এক ধরনের সহজ ব্যবহারযোগ্য প্রযুক্তি, যা কোনো জটিল সেটআপ বা বাড়তি সফটওয়্যার কনফিগারেশন ছাড়াই কেবল সংযোগ দিলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাজ শুরু করে। সহজ কথায়, এটি এমন ডিভাইস যা ক্যাবল বা মেমোরি কার্ড যুক্ত করে বিদ্যুৎ সংযোগ দিলেই তাৎক্ষণিকভাবে চালু হয়ে যায়।
মতামত দিন