Views Bangladesh Logo

ডেজাভু: মস্তিষ্কের কৌশল না কি পুনর্জন্মের প্রতিধ্বনি?

 VB  Desk

ভিবি ডেস্ক

একটি রেস্তোরাঁয় মুখোমুখি বসে আছেন দুজন মানুষ। চায়ের কাপ থেকে ধোঁয়া উঠছে, বাইরে নেমে আসছে সন্ধ্যা। পাশের টেবিলে কেউ হেসে উঠল। ঠিক সেই মুহূর্তে মনে হলো—এই দৃশ্য, এই অনুভূতি, এই কথোপকথন যেন আগে কোথাও ঘটেছে। অথচ এ ব্যক্তির সঙ্গে এটাই প্রথম দেখা। এই অদ্ভুত অনুভূতির নাম ডেজাভু (Déjà vu)।

ফরাসি শব্দ Déjà vu–এর অর্থ ‘আগে দেখা’। বিশ্বের প্রায় ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ মানুষ জীবনের কোনো না কোনো সময়ে এই অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছেন। তবে বিজ্ঞান ও দর্শন—কোনোটিই এখনো এর পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা দিতে পারেনি।

মস্তিষ্কে কী ঘটে?
বিজ্ঞানীদের মতে, ডেজাভু মূলত স্মৃতি প্রক্রিয়াকরণের একটি সাময়িক বিভ্রাট। মানুষের মস্তিষ্কে স্মৃতির জন্য দুটি আলাদা ব্যবস্থা কাজ করে—একটি পরিচিতি শনাক্ত করে, অন্যটি নির্দিষ্ট ঘটনার স্মৃতি মনে করিয়ে দেয়।

স্বাভাবিক অবস্থায় এই দুই ব্যবস্থা সমন্বিতভাবে কাজ করে। কিন্তু কখনো কখনো পরিচিতি শনাক্তকারী অংশটি সামান্য আগে সক্রিয় হয়ে যায়। ফলে মস্তিষ্ক নতুন কোনো ঘটনাকেও পূর্বপরিচিত বলে মনে করতে শুরু করে।

এ ছাড়া আলো, শব্দ, পরিবেশ বা কারও অঙ্গভঙ্গির মতো কোনো পরিচিত উপাদান অতীতের কোনো অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিলে যেতে পারে। তখন মস্তিষ্ক পুরো ঘটনাটিকেই আগের দেখা কোনো ঘটনার পুনরাবৃত্তি হিসেবে ধরে নেয়।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে ডেজাভুর অভিজ্ঞতা আরও জটিল হয়ে উঠেছে। কারও সঙ্গে সরাসরি দেখা হওয়ার আগেই আমরা তার ছবি দেখি, লেখা পড়ি, ভিডিও দেখি। ফলে বাস্তবে দেখা হলে মস্তিষ্ক মনে করে, ‘আমি তো এই মানুষটিকে আগে থেকেই চিনি।’ পরিচিতির অনুভূতিটি বাস্তব হলেও তার উৎস হতে পারে ভার্চুয়াল জগৎ।

দর্শনের ব্যাখ্যা কী?
যেখানে বিজ্ঞান উত্তর খোঁজে, দর্শন সেখানে আরও গভীর প্রশ্ন তোলে। বিভিন্ন দার্শনিক ও ধর্মীয় ঐতিহ্যে ডেজাভুকে পুনর্জন্মের ধারণার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। হিন্দু ও বৌদ্ধ দর্শনে বিশ্বাস করা হয়, আত্মা বহু জন্মের মধ্য দিয়ে যাত্রা করে এবং পূর্বজন্মের কিছু ক্ষীণ স্মৃতি বহন করে।

এই দৃষ্টিকোণ থেকে ডেজাভু হতে পারে পূর্বজন্মের কোনো মুহূর্তের ছায়া—এমন কিছু, যা সচেতন মন ভুলে গেছে, কিন্তু আত্মা এখনো মনে রেখেছে।

প্রাচীন গ্রিক দার্শনিক প্লেটো ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন। তার Anamnesis তত্ত্ব অনুযায়ী, জন্মের আগে আত্মা জ্ঞান ও সত্যের এক পরিপূর্ণ জগতে অবস্থান করে। পৃথিবীতে আসার পর সেই জ্ঞান বিস্মৃত হয়, কিন্তু বিশেষ কিছু দৃশ্য বা অভিজ্ঞতা সেই হারানো স্মৃতিকে জাগিয়ে তুলতে পারে। প্লেটোর মতে, শেখা মানে নতুন কিছু আবিষ্কার করা নয়; বরং পুরোনো কিছু স্মরণ করা।

অন্যদিকে মনোবিশ্লেষক কার্ল ইয়ুং ডেজাভুকে ব্যাখ্যা করেছেন ‘সমষ্টিগত অবচেতন’ ধারণার মাধ্যমে। তার মতে, মানবজাতির সবার মধ্যে একটি অভিন্ন স্মৃতি ও অভিজ্ঞতার ভাণ্ডার কাজ করে। ডেজাভু হতে পারে সেই গভীর সমষ্টিগত স্মৃতির এক ঝলক, যেখানে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা মানবজাতির বৃহত্তর উত্তরাধিকারের সঙ্গে মিলিত হয়।

রহস্য এখনো অমীমাংসিত
ডেজাভু নিয়ে বৈজ্ঞানিক গবেষণা চললেও এর সব প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি। এটি কি শুধুই মস্তিষ্কের ক্ষণিকের বিভ্রান্তি, নাকি মানুষের অস্তিত্বের আরও গভীর কোনো রহস্যের ইঙ্গিত—সেই বিতর্ক আজও অব্যাহত।

তবে একটি বিষয় নিশ্চিত, ডেজাভু আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে মানুষের স্মৃতি, চেতনা ও অস্তিত্ব সম্পর্কে এখনো অনেক কিছু অজানা রয়ে গেছে।

মতামত দিন

মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে

ট্রেন্ডিং ভিউজ