Views Bangladesh Logo

ঢাকা-আঙ্কারার সম্পর্ক কৌশলগত অংশীদারত্বে রূপ নেবে: হামিত এরসয়

বাংলাদেশে নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ের সূচনা শুধু দেশের জন্যই নয়, ঢাকা ও আঙ্কারার সম্পর্কের ক্ষেত্রেও নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন ব্রুনেই দারুসসালামে তুরস্কের রাষ্ট্রদূত এবং ডিন অব দ্য ডিপ্লোম্যাটিক কর্পস অধ্যাপক ড. হামিত এরসয়।

বাংলাদেশের নির্বাচিত কয়েকজন সাংবাদিককে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, আগামী বছরগুলোতে বাংলাদেশ ও তুরস্কের মধ্যে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, কৌশলগত এবং মানবিক সহযোগিতা আরও জোরদার হবে বলে তিনি আশাবাদী।

তিনি বলেন, আমি আন্তরিকভাবে আশা করি, আগামী বছরগুলোতে ঢাকা ও আঙ্কারা শুধু দুই দেশের জনগণের কল্যাণেই নয়, বরং শান্তি, স্থিতিশীলতা, উন্নয়ন এবং আরও প্রতিনিধিত্বশীল আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যেও আরও ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করবে।

নতুন সরকারের মাধ্যমে নতুন সম্ভাবনা
অধ্যাপক এরসয় বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন সরকারের গঠন বাংলাদেশ-তুরস্ক সম্পর্ককে নতুন গতি দেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি করেছে।

তার ভাষায়, ‘প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন সরকারের যাত্রা বাংলাদেশের জন্য একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। একই সঙ্গে এটি ঢাকা ও আঙ্কারার বিদ্যমান শক্তিশালী সম্পর্ককে আরও এগিয়ে নেওয়ার মূল্যবান সুযোগ সৃষ্টি করেছে।’

তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, দুই দেশের সম্পর্ক কোনো একক সরকার বা রাজনৈতিক দলের ওপর নির্ভরশীল নয়। তুরস্ক ও বাংলাদেশের সম্পর্ক গভীর ঐতিহাসিক বন্ধুত্ব, জনগণের পারস্পরিক যোগাযোগ, সাংস্কৃতিক সাদৃশ্য এবং সংহতির ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে। সময়ের সঙ্গে এই সম্পর্ক কৌশলগত মাত্রাও অর্জন করেছে।

হাকান ফিদানের সফর ইতিবাচক বার্তা
গত ৫-৬ জুন তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদানের বাংলাদেশ সফরকে তিনি দুই দেশের সম্পর্কের নতুন অধ্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ সূচনা হিসেবে উল্লেখ করেন।

সফরকালে হাকান ফিদান বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেন এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। বৈঠকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা, প্রতিরক্ষা, আঞ্চলিক বিষয় এবং রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আলোচনা হয়।

এরসয় বলেন, ‘নতুন সরকার গঠনের অল্প সময়ের মধ্যেই এ ধরনের উচ্চপর্যায়ের সফর প্রমাণ করে যে দুই দেশই পারস্পরিক সম্পর্ককে অত্যন্ত গুরুত্ব দিচ্ছে।’

বাড়বে উচ্চপর্যায়ের সফর
রাষ্ট্রদূত বলেন, সামনে দুই দেশের মধ্যে আরও উচ্চপর্যায়ের সফর এবং রাজনৈতিক সংলাপ বাড়বে বলে তিনি আশা করছেন।

তার মতে, কূটনীতিতে উচ্চপর্যায়ের সফর কেবল আনুষ্ঠানিকতা নয়; এগুলো দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা দেয়, অমীমাংসিত চুক্তিগুলো এগিয়ে নিতে সহায়তা করে এবং সরকারি প্রতিষ্ঠান ও ব্যবসায়ী মহলকে সক্রিয় করে।

বিস্তৃত অংশীদারত্বের আহ্বান
এরসয় বলেন, বাংলাদেশ ও তুরস্কের সম্পর্ক শুধু রাজনৈতিক সদিচ্ছার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়। বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রতিরক্ষা শিল্প, অবকাঠামো, জ্বালানি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, প্রযুক্তি, যোগাযোগ এবং সাংস্কৃতিক সহযোগিতাকে আরও প্রাতিষ্ঠানিক ও টেকসই রূপ দিতে হবে।

বাণিজ্য বাড়ানোর লক্ষ্য
তিনি বলেন, বর্তমানে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ১৩০ কোটি মার্কিন ডলার। উভয় দেশ এটিকে ২০০ কোটি ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।

তবে তার মতে, প্রকৃত লক্ষ্য হওয়া উচিত শুধু পণ্য বাণিজ্য নয়, বরং যৌথ বিনিয়োগ, শিল্প সহযোগিতা, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং দুই দেশের কোম্পানিগুলোর মধ্যে অংশীদারত্ব গড়ে তোলা।

প্রতিরক্ষা সহযোগিতার সম্ভাবনা
রাষ্ট্রদূত বলেন, তুরস্কের দ্রুত বিকাশমান প্রতিরক্ষা শিল্প এবং বাংলাদেশের আধুনিকায়ন পরিকল্পনার কারণে এ খাতে সহযোগিতার বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে।

তবে তিনি বলেন, কৌশলগত সম্পর্ক শুধু প্রতিরক্ষায় সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়; নবায়নযোগ্য জ্বালানি, ডিজিটাল প্রযুক্তি, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, কৃষি, স্বাস্থ্য ও শিক্ষাসহ বেসামরিক খাতেও সহযোগিতা বাড়ানো প্রয়োজন।

এশিয়া নীতিতে বাংলাদেশের গুরুত্ব
অধ্যাপক এরসয় বলেন, তুরস্কের বহুমাত্রিক পররাষ্ট্রনীতিতে এশিয়ার গুরুত্ব ক্রমেই বাড়ছে এবং দক্ষিণ এশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ দেশ হিসেবে বাংলাদেশ সেই দৃষ্টিভঙ্গির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও বৈশ্বিক অর্থনীতির কেন্দ্র ধীরে ধীরে এশিয়ার দিকে সরে আসছে। ফলে তুরস্ক এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে আরও গভীর ও প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে আগ্রহী এবং বাংলাদেশ এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে।

বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বে যৌথ সহযোগিতা
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ হিসেবে এরসয় বলেন, বিশ্ব এখন বহুমেরুকেন্দ্রিক ব্যবস্থার দিকে এগোচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ ও তুরস্কের মতো দেশগুলোর উচিত নিজেদের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন বজায় রেখে আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ব আরও বৈচিত্র্যময় করা।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ-তুরস্কের শক্তিশালী অংশীদারত্ব কোনো তৃতীয় দেশের বিরুদ্ধে নয়; বরং এটি আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং দক্ষিণ-দক্ষিণ সহযোগিতা জোরদারে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।

রোহিঙ্গা ইস্যুতে অব্যাহত সমর্থন
রাষ্ট্রদূত বলেন, রোহিঙ্গা সংকট দুই দেশের সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ মানবিক অধ্যায়।

তিনি উল্লেখ করেন, তুরস্ক শুরু থেকেই বাংলাদেশকে রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় সহায়তা করে আসছে। জুন মাসে বাংলাদেশ সফরের সময় পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান কক্সবাজারে তুরস্ক-সমর্থিত মানবিক কার্যক্রম এবং তুরস্ক-বাংলাদেশ মানবিক হাসপাতালও পরিদর্শন করেন।

জনগণের সম্পর্কই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ

অধ্যাপক এরসয় বলেন, স্থায়ী বন্ধুত্বের ভিত্তি সরকার নয়, জনগণ। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, শিক্ষার্থী, সাংবাদিক, ব্যবসায়ী এবং সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর মধ্যে আরও বেশি বিনিময় কর্মসূচির আহ্বান জানান।

তার ভাষায়, ‘বাংলাদেশ ও তুরস্কের জনগণের মধ্যে যে আন্তরিকতা রয়েছে, সেটিকে আরও নিয়মিত প্রাতিষ্ঠানিক ও মানবিক যোগাযোগে রূপ দেওয়াই আমাদের অন্যতম অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।’

দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত অংশীদারত্বের প্রত্যাশা
সাক্ষাৎকারের শেষে অধ্যাপক হামিত এরসয় বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ ও তুরস্কের সম্পর্ক আরও গভীর হবে বলে তিনি আশাবাদী।

তিনি বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য শুধু ভালো সম্পর্ক বজায় রাখা নয়; বরং ঐতিহ্যগত বন্ধুত্বকে একটি বিস্তৃত, বহুমাত্রিক ও দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত অংশীদারত্বে রূপ দেওয়া।’

তার মতে, এ লক্ষ্য অর্জনের জন্য দুই দেশের রাজনৈতিক সদিচ্ছা, অর্থনৈতিক সক্ষমতা এবং পারস্পরিক আস্থা—সবই বিদ্যমান। বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক অধ্যায় দুই দেশের সম্পর্কেরও একটি নতুন অধ্যায় হয়ে উঠতে পারে।

মতামত দিন

Avatar

ট্রেন্ডিং ভিউজ