থাইল্যান্ড-কম্বোডিয়া সীমান্তবর্তী সংঘর্ষ
মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১৬, সীমান্ত এলাকা ছেড়ে পালাল ১ লাখ ২০ হাজার মানুষ
থাইল্যান্ড এবং কম্বোডিয়ার সীমান্তবর্তী এলাকায় সামরিক বাহিনীর সংঘর্ষে এখন পর্যন্ত থাইল্যান্ডে ১৫ জন এবং ক্যাম্বোডিয়ায় ১ জন নিহত হয়েছেন। দুদেশের কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, আর এই ভয়াবহ সংঘর্ষের ফলে দুই দেশের সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে ১ লাখ ২০ হাজারেরও বেশি মানুষ নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ছুটছেন।
আজ শুক্রবার সকালেও দুদেশের সেনাদের মধ্যে ব্যাপক গোলাগুলি হয়েছে বলে জানিয়েছে থাই সামরিক বাহিনী। সংঘর্ষে কম্বোডিয়ার বাহিনী ভারী অস্ত্র ও রকেট সিস্টেম ব্যবহার করেছে বলেও জানায় তারা। খবর আলজাজিরা, রয়টার্স।
থাই সেনাবাহিনীর এক বিবৃতিতে বলা হয়, “কম্বোডিয়ার সেনারা বিএম-২১ রকেট লঞ্চার, ফিল্ড আর্টিলারিসহ ভারী অস্ত্র ব্যবহার করে আমাদের অবস্থান লক্ষ্য করে একাধিকবার গোলাবর্ষণ করেছে। থাই সেনারাও পাল্টা হামলা চালিয়েছেন।”
এর আগের দিন বৃহস্পতিবার সীমান্তে দুই পক্ষের গোলাবর্ষণে অন্তত ১১ জন বেসামরিক ব্যক্তি নিহত হন। এর পরপরই থাইল্যান্ড ছয়টি এফ-১৬ যুদ্ধবিমান মোতায়েন করে, যার মধ্যে একটি দিয়ে কম্বোডিয়ার একটি সামরিক স্থাপনায় হামলা চালানো হয়। থাই বাহিনী বলেছে, এই বিমান হামলা ছিল ‘ সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানা’।
অপরদিকে এই হামলাকে ‘বেপরোয়া ও নৃশংস সামরিক আগ্রাসন’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে কম্বোডিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। দেশটির প্রধানমন্ত্রী হুন মানেত জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের বর্তমান সভাপতি পাকিস্তানের কাছে চিঠি পাঠিয়ে অভিযোগ করেছেন, “থাইল্যান্ড আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে পূর্বপরিকল্পিত সামরিক আগ্রাসন চালিয়েছে।” একইসঙ্গে জরুরি বৈঠকের আহ্বান জানান তিনি।
বৃহস্পতিবার সকালে দুইপক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয়, যখন বিতর্কিত সীমান্ত এলাকায় দুই পক্ষ হালকা অস্ত্র দিয়ে গুলিবিনিময় শুরু করে। পরে তা ছড়িয়ে পড়ে অন্তত ছয়টি এলাকায় এবং ভারী গোলাবর্ষণে রূপ নেয়। বহু বছর ধরেই সেসব এলাকার সার্বভৌমত্ব নিয়ে দুই দেশের মধ্যে বিরোধ চলে আসছে।
থাইল্যান্ডের ভারপ্রাপ্ত প্রধানমন্ত্রী ফুমথাম ওয়েচায়াচাই বলেন, ‘আমরা এর নিন্দা জানাই। সংঘর্ষের সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ছাড়াই ভারী অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে, যা লড়াইয়ের ক্ষেত্রের বাইরে ঘটেছে। আন্তর্জাতিক আইনের তোয়াক্কা না করে এভাবে বল প্রয়োগ করা হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা শান্তিপূর্ণ সমাধানের পক্ষেই রয়েছি এবং আলোচনা হওয়া উচিত। কিন্তু যা হয়েছে, তা এক রকম উসকানি। আর আমরা আত্মরক্ষার্থে প্রতিক্রিয়া জানাতে বাধ্য হয়েছি।’
থাইল্যান্ড বলছে, দেশটির তিনটি প্রদেশে হামলার ঘটনায় এখন পর্যন্ত মোট ১২ জন নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ১১ জনই বেসামরিক নাগরিক। নিহতদের মধ্যে একজন শিশুও রয়েছে। আহত হয়েছেন আরও অন্তত ৩১ জন।
অন্যদিকে হতাহতের সঠিক সংখ্যা জানায়নি কম্বোডিয়া। তবে সূত্র বলছে, থাই বিমান হামলায় তাদের বেশ কিছু সামরিক স্থাপনার ক্ষতি হয়েছে।
এমতাবস্থায় বালির বস্তা ও টায়ারে ঘেরা কংক্রিটের বাংকারে আশ্রয় নিয়েছেন সীমান্তবর্তী থাই গ্রামগুলোর বাসিন্দারা। যাদের মধ্যে নারী, শিশু ও বয়স্করাও রয়েছেন।
সীমান্তে চলমান উত্তেজনার মধ্যে আজ জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের জরুরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। বিষয়টি নিশ্চিত করেছে জাতিসংঘে পাকিস্তানের স্থায়ী মিশন, যারা বর্তমানে নিরাপত্তা পরিষদের সভাপতির দায়িত্বে রয়েছে।
উল্লেখ্য, এর আগেও মে মাসের শেষ দিকে সীমান্তে ছোট পরিসরে সংঘর্ষ হয়েছিল, যাতে এক কম্বোডীয় সেনা নিহত হন। এরপর থেকেই উভয় দেশ সীমান্তে সেনা সংখ্যা বাড়ায়। সেই সঙ্গে দুই দেশের মধ্য কূটনৈতিক টানাপোড়েন চরমে ওঠে। এমনকি থাইল্যান্ড নমপেন থেকে নিজেদের রাষ্ট্রদূতকে প্রত্যাহার করে এবং কম্বোডিয়ার রাষ্ট্রদূতকে বহিষ্কারও করে।
এদিকে থাইল্যান্ডের দীর্ঘদিনের মিত্র যুক্তরাষ্ট্র দুদেশের মধ্যে সংঘর্ষ বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের উপমুখপাত্র টমি পিগট এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘থাইল্যান্ড-কম্বোডিয়া সীমান্তে সহিংসতা বেড়ে যাওয়ায় আমরা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন এবং বেসামরিক মানুষের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবরে শোকাহত। অবিলম্বে সংঘর্ষ বন্ধ, বেসামরিক জনগণের সুরক্ষা ও সংকটের শান্তিপূর্ণ সমাধানের জন্য আমরা আহ্বান জানাচ্ছি।

মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে