গাজায় ইসরায়েলি হামলায় নিহত বেড়ে ৫৫,৪৩২ জন
অবরুদ্ধ ফিলিস্তিনি উপত্যকা গাজাজুড়ে ইসরায়েলি বাহিনীর স্থল অভিযান ও বিমান হামলায় গত ২৪ ঘণ্টায় আরও অন্তত ৫৯ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। তাদের ১৭ জনই নিহত হয়েছেন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল সমর্থিত এবং গাজা হিউম্যানেটারিয়ান ফাউন্ডেশনের (জিএইএফ) এর ত্রাণ বিতরণ কেন্দ্রগুলোর আশেপাশে খাবার খুঁজতে গিয়ে।
রোববার (১৫ জুন) দিনভর এসব হামলায় আহত হন আরও শতাধিক ফিলিস্তিনি।
এ নিয়ে ইসরায়েলি সামরিক আগ্রাসন শুরু হওয়ার পর থেকে গত ২০ মাসে নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ালো ৫৫ হাজার ৪৩২ জনে। আহত বেড়ে দাঁড়িয়েছে এক লাখ ২৮ হাজার ৯২৩ জনে। নিহতদের মধ্যে ১৮ মার্চ যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের পর থেকেই মারা গেছেন পাঁচ হাজার ১৩৯ জন এবং আহতদের সংখ্যা অন্তত ১৬ হাজার ৮৮২ জন।
গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, অনেকেই এখনো ধ্বংসস্তূপের নিচে এবং রাস্তায় আটকা পড়ে আছেন। উদ্ধারকর্মীরা তাদের কাছে পৌঁছাতে পারছেন না।
অন্যদিকে গাজায় হামাসের বিরুদ্ধে স্থল অভিযান ও সীমান্তবর্তী অঞ্চলে সামগ্রিক সামরিক অভিযানে নিহত ইসরায়েলি সৈন্যের সংখ্যা ৪৩২ জনে দাঁড়িয়েছে।
সোমবার (১৬ জুন) কাতারভিত্তিক সংবাদ মাধ্যম আল জাজিরা জানায়, সর্বশেষ হামলায় হতাহত অধিকাংশ ফিলিস্তিনিকেই গাজার মধ্যাঞ্চলের আল-আওদা ও আল-আকসা হাসপাতালে এবং বাকিদের রাফার রেডক্রস হাসপাতালে নেয়া হয়েছে। হাসপাতালগুলোর চিকিৎসাকর্মীরা জানিয়েছেন, নেটজেরিম করিডোরের কাছের জিএইচএফের ত্রাণ বিতরণ কেন্দ্রের দিকে এগোনোর চেষ্টা করার সময় ইসরায়েলি বাহিনীর গুলিতে অন্তত ১৭ জন নিহত হন। অন্য ৪২ জন গাজা ভূখণ্ডের বিভিন্ন অংশে পৃথক হামলায় নিহত হয়েছেন।
চিকিৎসকরা আল জাজিরাকে আরও জানান, এর মধ্যে ক্ষুধার্ত পরিবারের জন্য খাবারের পার্সেল খুঁজতে ফিলিস্তিনিদের বড় একটি দল একটি জিএইচএফ কেন্দ্রে যাওয়ার সময় গুলি চালায় বিমান থেকে গুলি চালায় ইসরায়েলি সেনারা। এতে তিনজন নিহত এবং আহত হন আরও কয়েক ডজন ফিলিস্তিনি।
দক্ষিণ গাজায় একাধিক ইসরায়েলি বিমান হামলায় নিহত হন বাকি ১৪ জন ত্রাণপ্রত্যাশী। সেখানে আহত ৫০ জনেরও বেশি ফিলিস্তিনিকে রাফার রেডক্রস হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। ছিটমহলটির উত্তরে বেইত লাহিয়া শহরে একদল লোককে লক্ষ্য করে চালানো ইসরায়েলি হামলায় আরও সাতজন নিহত হন বলেও জানান চিকিৎসকেরা।
অন্যদিকে মধ্য গাজার নুসাইরাত শরণার্থী শিবিরে ইসরায়েলি হামলায় কমপক্ষে আটজন নিহত হন। ফিলিস্তিনি সংবাদ সংস্থা ওয়াফা জানিয়েছে, আবাসিক ভবনে ওই হামলায় বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন।
মধ্য গাজার দেইর এল-বালাহ থেকে আলজাজিরার তারেক আবু আযম বলেন, ‘স্থানীয়রা আমাদের জানিয়েছেন, ইসরায়েলি সেনাবাহিনী গুলি চালানোর আগে ক্ষুধার্ত জনতাকে সতর্ক করেনি। যার ফলে ভয়াবহ বেসামরিক হতাহতের ঘটনা ঘটেছে’।
খাবার দেয়ার কথা বলে ত্রাণকেন্দ্রে ডেকে নিয়ে গুলিবর্ষণকে ‘একটি ফাঁদ’ বলেও বর্ণনা করেছেন গাজার বাসিন্দা আহমেদ আল-মাসরি।
মে মাসের শেষ দিকে গাজার ইসরায়েলি বাহিনী নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলোতে খাবারের প্যাকেজ বিতরণ শুরু করে জিএইচএফ। তারা ত্রাণ বিতরণে নতুন মডেল অনুসরণ করছে, যার সমালোচনা করেছে জাতিসংঘ। বিশ্ব সংস্থাটি বলছে, মার্কিন উদ্যোগের জিএইচএফ পক্ষপতশূন্য বা নিরপেক্ষ নয়।
বিবৃতিতে গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বলেছে, গাজায় জিএইচএফ কার্যক্রম শুরু করার পর থেকে তাদের ত্রাণ বিতরণ কেন্দ্রগুলোর কাছে সহায়তা কেন্দ্রে যাওয়ার সময় বা তার আশপাশে অন্তত ৩০০ জন নিহত হয়েছেন, আহত হয়েছেন দুই হাজার ৬০০ জনেরও বেশি।
মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক মুনির আল-বুরশ বলেন, ‘এটি সহায়তা নয়, এটি হচ্ছে দারিদ্র্যপীড়িত ও ক্ষুধার্ত জনগণকে ফাঁদে ফেলার চেষ্টা। এর ওপর নজর রাখছে দখলদার ইসরায়েলি বাহিনীর যুদ্ধবিমান’।
ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাস ত্রাণ চুরি করছে বলে পাল্টা অভিযোগ করে আসছে ইসরায়েল। এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান এবং ইসরায়েল ‘অনাহারকে যুদ্ধের অস্ত্র হিসেবে এবং ত্রাণ বিতরণ কেন্দ্রগুলোকে নিরপরাধ বেসামরিকদের নির্বিচার হত্যার ফাঁদ হিসেবে ব্যবহার করছে’ বলে পাল্টা অভিযোগ করেছে গাজার শাসক গোষ্ঠী হামাস।
এদিকে দখলদার ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী (আইডিএফ) গাজার দক্ষিণাঞ্চলীয় খান ইউনুস ও নিকটবর্তী শহর আবাসান ও বানি সুহাইলার বাসিন্দাদের তাদের ঘর-বাড়ি ছেড়ে পশ্চিম দিকে তথাকথিত ‘মানবিক জোনের’ দিকে চলে যেতে বলেছে। এর কারণ হিসেবে ইসরায়েলি বাহিনী বলেছে, তারা এই এলাকাগুলোতে ‘সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোর’ বিরুদ্ধে জোরালো অভিযান চালাবে।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বে আরও বেশ কয়েকটি ফিলিস্তিনি জঙ্গি গোষ্ঠীর যোদ্ধারা গাজা উপত্যকা থেকে ইসরায়েলের দখলকৃত দক্ষিণ গাজা অঞ্চলে ঢুকে সমন্বিত সশস্ত্র হামলা চালিয়ে এক হাজার ১৯৫ জনকে ২৫১ জনকে জিম্মি করার পর এই যুদ্ধ শুরু হয়। নিহতদের মধ্যে ছিলেন ৩৬ জন শিশুসহ ৭৩৬ জন বেসামরিক ইসরায়েলি, ৩৭৯ জন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য এবং ৭৯ জন বিদেশি।
গাজার সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো এখনো ৫৩ জনকে জিম্মি করে রেখেছে বলে অভিযোগ ইসরায়েলের। তাদের মধ্যে আইডিএফের নিশ্চিত করা কমপক্ষে ৩৩ জনের মৃতদেহ ও ২০ জন জীবিত বলে ধারণা করা হচ্ছে। আরও তিনজনের সুস্থতা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ইসরায়েলি কর্মকর্তারা।
গত বছরের নভেম্বর মাসে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও তার সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্তের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত। গাজায় নির্বিচারে হামলায় গণহত্যার অভিযোগেরও মুখোমুখি হয়েছে ইসরায়েল।

মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে