ইরানে নিহত বেড়ে ১৯২, দমনপীড়নে ‘ব্যাপক হত্যাকাণ্ডের’ আশঙ্কা
ইরানে চলমান সরকারবিরোধী আন্দোলনে নিহতের সংখ্যা বেড়ে অন্তত ১৯২ জনে দাঁড়িয়েছে। রোববার এ তথ্য জানিয়েছে একটি মানবাধিকার সংস্থা। বিক্ষোভ দমনে কর্তৃপক্ষের কঠোর পদক্ষেপ পরিস্থিতিকে ‘ব্যাপক হত্যাকাণ্ডের’ দিকে ঠেলে দিতে পারে বলে সতর্ক করেছে সংস্থাটি।
নরওয়েভিত্তিক বেসরকারি সংস্থা ইরান হিউম্যান রাইটস জানিয়েছে, আন্দোলন শুরুর পর থেকে অন্তত ১৯২ জন বিক্ষোভকারীর নিহত হওয়ার তথ্য তারা নিশ্চিত করেছে। তবে ৬০ ঘণ্টার বেশি সময় ধরে ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় প্রকৃত পরিস্থিতির খবর পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। সংস্থাটির মতে, বাস্তবে নিহতের সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে।
জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক সংকটের প্রতিবাদে গত ২৮ ডিসেম্বর তেহরানে বিক্ষোভ শুরু হয়। ধীরে ধীরে এটি ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর সবচেয়ে বড় সরকারবিরোধী আন্দোলনে রূপ নেয়। টানা দুই সপ্তাহ ধরে চলা এই আন্দোলন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির শাসনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিচ্ছে।
ইন্টারনেট বন্ধ থাকলেও তেহরানসহ বিভিন্ন শহরের বিক্ষোভের ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। এএফপি যাচাই করা একাধিক ভিডিওতে দেখা গেছে, শনিবার রাতে রাজধানী তেহরান ও পূর্বাঞ্চলীয় শহর মাশহাদসহ কয়েকটি এলাকায় নতুন করে বিক্ষোভ হয়। কোথাও কোথাও গাড়িতে আগুন জ্বলতে দেখা গেছে। যাচাই করা সম্ভব হয়নি—এমন কিছু ভিডিওতে তেহরানের একটি মর্গে নিহতদের শনাক্ত করতে স্বজনদের ভিড় করতেও দেখা যায়।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সেন্টার ফর হিউম্যান রাইটস ইন ইরান (সিএইচআরআই) জানিয়েছে, প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনা ও নির্ভরযোগ্য প্রতিবেদনের ভিত্তিতে তারা ইরানজুড়ে শত শত বিক্ষোভকারীর নিহত হওয়ার তথ্য পেয়েছে। সংস্থাটি বলেছে, ইরানে এখন ব্যাপক হত্যাকাণ্ড চলছে এবং আরও প্রাণহানি ঠেকাতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জরুরি পদক্ষেপ প্রয়োজন। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, হাসপাতালগুলোতে আহত মানুষের ভিড়, রক্তের মজুত কমে যাওয়া এবং অনেক বিক্ষোভকারীকে ইচ্ছাকৃতভাবে চোখে গুলি করার ঘটনাও ঘটেছে।
তেহরান প্রায় অচল
এএফপির এক সাংবাদিক জানান, তেহরান কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। বিক্ষোভ শুরুর পর থেকে মাংসের দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। কিছু দোকান খোলা থাকলেও অধিকাংশ দোকান বন্ধ, আর যেগুলো খোলে সেগুলোও বিকেল ৪টা বা ৫টার মধ্যেই বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। শহরের বিভিন্ন স্থানে বিপুল সংখ্যক নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন রয়েছে।
এদিকে, ইরানের পুলিশ প্রধান আহমদ রেজা রাদান শনিবার রাতে বিক্ষোভে জড়িতদের গ্রেপ্তারের কথা স্বীকার করলেও কতজন গ্রেপ্তার হয়েছেন বা তাঁদের পরিচয় জানাননি।
রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আইআরআইবিকে দেওয়া বক্তব্যে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেন, দাঙ্গাবাজদের সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে দেওয়া হবে না। তিনি দাবি করেন, সরকার ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় অঙ্গীকারবদ্ধ।
রেজা পাহলভির আহ্বান
বিদেশে অবস্থানরত ইরানের সাবেক শাহ রাজবংশের স্বঘোষিত রাজপুত্র রেজা পাহলভি রোববার নতুন কর্মসূচির ডাক দেন। বিক্ষোভকারীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘রাস্তা ছাড়বেন না। আমি আপনাদের সঙ্গে আছি। খুব শিগগিরই আপনাদের পাশে থাকব।’
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিক্ষোভকারীদের প্রতি সমর্থন জানিয়ে ইরানি কর্তৃপক্ষ সহিংসতা চালালে সামরিক পদক্ষেপের হুমকি দিয়েছেন। একই সঙ্গে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীকে ‘সন্ত্রাসী সংগঠন’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করার আহ্বান জানিয়েছেন ইসরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিদেওন সার। তিনি বলেন, ইসরায়েল ইরানি জনগণের ‘স্বাধীনতার সংগ্রাম’কে সমর্থন করে।
এ পরিস্থিতিতে ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ পাল্টা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র সামরিক হামলা চালালে ইরানও জবাব দেবে। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রচারিত ভাষণে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র হামলা করলে ‘দখলকৃত ভূখণ্ড’ এবং মার্কিন সামরিক ও নৌ পরিবহন কেন্দ্রগুলো ইরানের ‘বৈধ লক্ষ্যবস্তু’ হবে। সূত্র: এএফপি
মতামত দিন