ইতিহাসের সবচেয়ে জমকালো অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে পর্দা উঠলো ২০২৬ বিশ্বকাপের
মেক্সিকোর ঐতিহাসিক অ্যাজতেকা স্টেডিয়াম থেকে শুরু হলো ফুটবলের সবচেয়ে বড় মহাযজ্ঞ। বর্ণাঢ্য আয়োজন, বিশ্বমানের শিল্পী পরিবেশনা এবং হাজারো দর্শকের উচ্ছ্বাসে মুখরিত উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে পর্দা উঠেছে এই আসরের। প্রথমবারের মতো তিনটি দেশ—যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো যৌথভাবে বিশ্বকাপ আয়োজন করছে, যা ফুটবল ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
মেক্সিকোর বিখ্যাত অ্যাজটেকা স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত উদ্বোধনী আয়োজনটি ছিল এক কথায় চোখ ধাঁধানো। আলো, সাউন্ড, সাংস্কৃতিক পরিবেশনা এবং প্রযুক্তির সমন্বয়ে তৈরি এই অনুষ্ঠান ফুটবলপ্রেমীদের জন্য এক স্মরণীয় অভিজ্ঞতা হয়ে ওঠে। পুরো স্টেডিয়ামজুড়ে ছিল উৎসবের আবহ, যেখানে ফুটবল শুধু একটি খেলা নয়—বরং বৈশ্বিক সংস্কৃতি ও আবেগের মিলনমেলায় পরিণত হয়।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ ছিলেন বিশ্বখ্যাত পপতারকা শাকিরা এবং নাইজেরিয়ান সংগীতশিল্পী বার্না বয়। তারা যৌথভাবে পরিবেশন করেন বিশ্বকাপের অফিসিয়াল গান ‘দাই দাই’। তাদের উদ্দীপ্ত পারফরম্যান্সে স্টেডিয়ামের গ্যালারি মুহূর্তেই প্রাণচাঞ্চল্যে ভরে ওঠে। দর্শকরা সুর, তাল আর নৃত্যের সঙ্গে একাত্ম হয়ে পড়েন, যা পুরো অনুষ্ঠানকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যায়।
এছাড়া আরও একঝাঁক বিশ্বখ্যাত শিল্পীর পরিবেশনায় উদ্বোধনী মঞ্চ হয়ে ওঠে তারকাখচিত। আন্দ্রেয়া বোচেলি, ডেভিড গেটা, মেগান থি স্ট্যালিয়ন ও ইজেএ একসঙ্গে মঞ্চে উঠে পরিবেশন করেন আরেকটি আলোচিত গান ‘ডিএনএ’। আধুনিক সংগীত ও ক্লাসিক্যাল উপস্থাপনার মিশ্রণে তৈরি এই পারফরম্যান্স দর্শকদের মুগ্ধ করে তোলে এবং পুরো অনুষ্ঠানকে আরও বৈচিত্র্যময় করে।
মেক্সিকোর নিজস্ব ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিও উদ্বোধনী আয়োজনে বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়। জনপ্রিয় রক ব্যান্ড মানা, পপ তারকা বেলিন্ডা, লোকসংগীতশিল্পী লিলা ডাউনস এবং ঐতিহ্যবাহী কুম্বিয়া সংগীত দল লোস অ্যাঞ্জেলেস আজুলিস নিজেদের পরিবেশনায় মেক্সিকান সংস্কৃতির রঙ ছড়িয়ে দেন পুরো স্টেডিয়ামে। তাদের সুর ও পরিবেশনা স্থানীয় দর্শকদের পাশাপাশি বিশ্বজুড়ে থাকা ফুটবলপ্রেমীদের কাছেও দারুণ প্রশংসিত হয়।
মেক্সিকোর জাতীয় সংগীত পরিবেশন করেন কিংবদন্তি মারিয়াচি শিল্পী আলেহান্দ্রো ফার্নান্দেজ। তার আবেগঘন পরিবেশনায় পুরো স্টেডিয়াম এক মুহূর্তের জন্য নীরব হয়ে যায়, যা অনুষ্ঠানে এক গৌরবময় ও ঐতিহ্যবাহী আবহ তৈরি করে। পাশাপাশি ভেনিজুয়েলার ড্যানি ওশেন, কলম্বিয়ার জে বালভিন এবং রায়ান কাস্ত্রোর রেগেটন পারফরম্যান্সে পুরো আয়োজন হয়ে ওঠে আরও প্রাণবন্ত ও তরুণদের উপযোগী।
তবে এই উদ্বোধনী আয়োজন শুধুমাত্র মেক্সিকোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। যৌথ আয়োজক দেশ হিসেবে কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রেও পৃথক উদ্বোধনী অনুষ্ঠান আয়োজন করা হচ্ছে, যা বিশ্বকাপের বৈশ্বিক চরিত্রকে আরও দৃঢ়ভাবে উপস্থাপন করছে।
কানাডায় ১২ জুন টরন্টো স্টেডিয়ামে বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার ম্যাচের আগে অনুষ্ঠিত হয় উদ্বোধনী অনুষ্ঠান। সেখানে পারফর্ম করেন নোরা ফাতেহি, মাইকেল বুবলে, জেসি রেয়েজ, অ্যালানিস মরিসেত্তে, অ্যালেসিয়া কারা, এলিয়ানা এবং বাংলাদেশি-আমেরিকান ডিজে সঞ্জয়। তাদের পারফরম্যান্স কানাডার বহুসংস্কৃতির পরিচয় ফুটিয়ে তোলে এবং দর্শকদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রে ১৩ জুন লস অ্যাঞ্জেলেসে প্যারাগুয়ের বিপক্ষে ম্যাচের আগে অনুষ্ঠিত হয় আরও এক জমকালো উদ্বোধনী অনুষ্ঠান। সেখানে মার্কিন পপ তারকা কেটি পেরির পাশাপাশি মঞ্চে ওঠেন র্যাপার ফিউচার, ব্রাজিলিয়ান গায়িকা আনিতা, ব্ল্যাকপিঙ্ক তারকা লিসা, নাইজেরিয়ার রেমা এবং দক্ষিণ আফ্রিকার জনপ্রিয় শিল্পী টাইলা। আধুনিক পপ, র্যাপ ও বিশ্বসংগীতের মিশেলে এই অনুষ্ঠান যুক্তরাষ্ট্রের সংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে তুলে ধরে।
বাংলাদেশের দর্শকদের জন্যও এবারের বিশ্বকাপ উপভোগের সুযোগ রয়েছে ব্যাপকভাবে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানসহ পুরো টুর্নামেন্ট সরাসরি সম্প্রচার করবে সময় টেলিভিশন। পাশাপাশি বিটিভি ও টি-স্পোর্টসেও ম্যাচগুলো দেখা যাবে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে টফি, মাই রবি এবং বায়োস্কোপ অ্যাপের মাধ্যমে দর্শকরা যেকোনো সময় বিশ্বকাপের প্রতিটি মুহূর্ত উপভোগ করতে পারবেন।
বিশ্বকাপ শুধু মাঠের লড়াই নয়, বরং এটি এখন একটি বৈশ্বিক সাংস্কৃতিক উৎসব। সংগীত, নৃত্য, প্রযুক্তি এবং ফুটবলের সমন্বয়ে তৈরি এই আয়োজন বিশ্বকে এক সুতোয় বাঁধে। অ্যাজটেকা স্টেডিয়াম থেকে শুরু হওয়া এই যাত্রা আগামী দিনগুলোতে আরও উত্তেজনা, প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং আবেগ নিয়ে এগিয়ে যাবে, যা ফুটবলপ্রেমীদের জন্য হয়ে উঠবে এক অবিস্মরণীয় অভিজ্ঞতা।

মতামত দিন