রুদ্ধদ্বারে নিষ্পাপ শৈশবের আর্তনাদ: রাষ্ট্রের দায়িত্ব কি?
ধর্মীয় শিক্ষার পবিত্রতার আড়ালে শিশু বলাৎকার, যৌন নিপীড়ন ও প্রাতিষ্ঠানিক অপরাধ গোপনের অপসংস্কৃতির বিরুদ্ধে এখনই রাষ্ট্রের কঠোর হস্তক্ষেপ অপরিহার্য।
বাংলাদেশের বিভিন্ন মাদ্রাসায় একের পর এক শিশু বলাৎকার, ধর্ষণ, যৌন নিপীড়ন এবং অমানবিক নির্যাতনের অভিযোগ আমাদের জাতীয় বিবেককে এক ভয়াবহ প্রশ্নের সম্মুখীন করেছে, যে মাদ্রাসায় শিশুকে ধর্মীয় নৈতিকতা ও চারিত্রিক পবিত্রতার শিক্ষা দেওয়ার কথা, সেই মাদ্রাসারই কতিপয় শিক্ষক যখন শিশুর সম্ভ্রম, শৈশব ও নিরাপত্তা বিনষ্টের অভিযোগে অভিযুক্ত হন, তখন সেই প্রতিষ্ঠানের নৈতিক বৈধতা কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়? ধর্মীয় শিক্ষার নামে প্রতিষ্ঠিত কোনো প্রতিষ্ঠান কি অপরাধীর নিরাপদ আশ্রয়স্থল হয়ে উঠতে পারে? ধর্মীয় পোশাক, পাগড়ি, দাড়ি কিংবা আলেম পরিচয় কি কাউকে আইনের ঊর্ধ্বে অবস্থানের অধিকার প্রদান করে?
সম্প্রতি গাজীপুরের টঙ্গীতে একটি মাদ্রাসার উপাধ্যক্ষের বিরুদ্ধে সাত বছর বয়সী প্রথম শ্রেণির এক ছাত্রীকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ ওঠে। ২৩ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে প্রকাশিত দেশের স্বনামধন্য একটি ইংরেজী জাতীয় দৈনিক-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, অভিযুক্ত শিক্ষক শিশুটিকে ঘটনা প্রকাশ করলে মারধরের হুমকি দিয়েছিলেন। আতঙ্কগ্রস্ত শিশুটি পরবর্তী তিন দিন মাদ্রাসায় যাওয়া বন্ধ করে দেয়। পরিবারের কাছে ঘটনা প্রকাশের পর অভিযোগের ভিত্তিতে ওই শিক্ষককে গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়। প্রশ্ন হলো, সাত বছরের একটি শিশুর মনে একজন ধর্মীয় শিক্ষকের উপস্থিতি কেন আশ্রয়ের পরিবর্তে আতঙ্কের প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠবে?
লজ্জাজনক হচ্ছে, গাজীপুরের এই মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ সেই যৌন নিপীড়ক শিক্ষকের পক্ষ নিয়ে নির্যাতিত শিশুটির প্রতিবাদী পিতার বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দিয়েছে। ১৭ লাখ টাকা ছিনতাই এর অভিযোগ যে মিথ্যা, সেটা সবাই জানে!
একই মাসে গাজীপুরের গাছায় একটি আবাসিক কওমি মাদ্রাসার আট বছর বয়সী শিক্ষার্থীকে পরপর তিন রাতে ধর্ষণের অভিযোগে শিক্ষক ও মাদ্রাসা পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। মামলার বিবরণ অনুযায়ী, অভিযুক্ত শিক্ষক শিশুটিকে ঘুম থেকে ডেকে নির্জন স্থানে নিয়ে নির্যাতন করেন এবং মুখ খুললে মারধরের হুমকি দেন। অভিযোগে ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার অপচেষ্টার কথাও উঠে আসে। এমন অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে তা কেবল একজন শিক্ষকের অপরাধ নয়; প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাব্যবস্থার চরম ব্যর্থতারও সাক্ষ্য বহন করবে।
গত সেপ্টেম্বরে সাভারের একটি মাদ্রাসায় সাত বছর বয়সী এক শিশুকে দীর্ঘ ছয় মাস ধরে সংঘবদ্ধভাবে যৌন নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে। মামলায় শিক্ষক ও শিক্ষার্থী মিলিয়ে দশজনকে অভিযুক্ত করা হয়। পুলিশ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করে। অভিযোগ অনুযায়ী, কয়েকজন শিক্ষক অপরাধ প্রতিরোধের পরিবর্তে নির্যাতন ও অভিযুক্তদের রক্ষার ঘটনায় জড়িত ছিলেন। যে শিশুটি শিক্ষকের কাছে নিরাপত্তা প্রত্যাশা করেছিল, সেই শিক্ষকই যদি তার নিপীড়ক হয়ে ওঠেন, তবে এর চেয়ে ভয়াবহ বিশ্বাসভঙ্গ আর কী হতে পারে?
নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লাতেও সেপ্টেম্বরে আবাসিক মাদ্রাসার সতেরো বছর বয়সী এক শিক্ষার্থীকে বারবার যৌন নির্যাতনের অভিযোগে একজন শিক্ষক গ্রেপ্তার হন। এর আগে কুষ্টিয়ার কুমারখালী ও চট্টগ্রামের বাঁশখালিতে মাদ্রাসাশিক্ষার্থীদের বলাৎকারের অভিযোগে শিক্ষক গ্রেপ্তারের ঘটনাও সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। কোথাও শিশুকে ভয় দেখানো, কোথাও ধর্মীয় কর্তৃত্বের অপব্যবহার, আবার কোথাও সালিশের মাধ্যমে অপরাধের অভিযোগ নিষ্পত্তির অপচেষ্টা, এই ঘটনাগুলো এক গভীর প্রাতিষ্ঠানিক সংকটের দিকে ইঙ্গিত করে।
বিষয়টি কেবল বিচ্ছিন্ন সংবাদ নয়। মানবাধিকার সংগঠন জাস্টিসমেকার্স বাংলাদেশ ইন ফ্রান্সের ১ অক্টোবর ২০২৬-এ প্রকাশিত গণমাধ্যমভিত্তিক পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মাদ্রাসার ভেতরে ছেলেশিশু ধর্ষণ ও ধর্ষণচেষ্টার ৭২টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে, যেখানে ভুক্তভোগী ১০৯ জন। সংগঠনটির পর্যবেক্ষণে ৬৫টি ঘটনায় ৮১ জন মাদ্রাসাশিক্ষকের বিরুদ্ধে ধর্ষণ কিংবা ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এগুলো সংবাদভিত্তিক নথিভুক্ত অভিযোগের হিসাব, আদালতে প্রমাণিত অপরাধের সংখ্যা নয়। তথাপি এই পরিসংখ্যানকে উপেক্ষা করার কোনো নৈতিক অবকাশ নেই।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, কিছু মাদ্রাসায় অপরাধের অভিযোগ প্রকাশিত হলে প্রতিষ্ঠানের সম্মান রক্ষার অজুহাতে তা গোপন করার প্রবণতা। কোথাও ভুক্তভোগীর পরিবারকে ভয় দেখানো হয়, কোথাও সামাজিক মর্যাদার দোহাই দিয়ে মুখ বন্ধ রাখতে বলা হয়, কোথাও সালিশের নামে গুরুতর অপরাধকে আপসযোগ্য বিবাদে পরিণত করার চেষ্টা চলে। অথচ শিশুধর্ষণ কোনো পারিবারিক মনোমালিন্য নয়; এটি গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি রক্ষার নামে এমন অভিযোগ ধামাচাপা দেওয়া নৈতিকতার চরম পরাভব।
এখানেই ধর্মীয় গোঁড়ামি ও অন্ধ আনুগত্যের বিপজ্জনক ভূমিকা। কোনো শিক্ষককে ‘হুজুর’ সম্বোধন করলেই তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা নিষিদ্ধ হয়ে যায় না। প্রকৃত আলেমের পরিচয় তাঁর নৈতিকতা, মানবিকতা ও চরিত্রে। যাঁরা ধর্মের আবরণে শিশু নির্যাতন করেন, তাঁদের অপরাধের সঙ্গে ধর্মীয় মর্যাদাকে একাকার করা অনুচিত। আলেমের মুখোশ পরিধান করলেই জালেমের অপরাধ পবিত্র হয়ে যায় না।
রাষ্ট্রকে এখন মাদ্রাসার অভ্যন্তরীণ শিশুসুরক্ষা ব্যবস্থা ঢেলে সাজাতে হবে। বিশেষত আবাসিক মাদ্রাসাগুলোতে বাধ্যতামূলক নিবন্ধন, নিয়মিত স্বাধীন পরিদর্শন, শিক্ষক নিয়োগে যথাযথ যাচাই, শিশুদের নিরাপদ অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা এবং অভিভাবকদের অবাধ যোগাযোগ নিশ্চিত করতে হবে। প্রতিটি যৌন নিপীড়নের অভিযোগে নিরপেক্ষ তদন্ত, শিশু-সংবেদনশীল বিচারপ্রক্রিয়া ও ভুক্তভোগীর পুনর্বাসন নিশ্চিত করা অপরিহার্য।
যেসব মাদ্রাসার কর্তৃপক্ষ অপরাধের অভিযোগ জেনেও তা গোপন করেছে কিংবা অপরাধীকে পালাতে সহায়তা করেছে বলে প্রমাণিত হবে, তাদেরও আইনের আওতায় আনতে হবে। প্রমাণিত গুরুতর অপরাধে প্রাতিষ্ঠানিক প্রশ্রয় থাকলে সংশ্লিষ্ট মাদ্রাসার অনুমোদন বাতিল ও কার্যক্রম বন্ধ করতে হবে। একই সঙ্গে নিরপরাধ শিক্ষার্থীদের বিকল্প শিক্ষাব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
মনে রাখতে হবে, আমাদের প্রতিবাদ মাদ্রাসাশিক্ষার বিরুদ্ধে নয়; প্রতিবাদ সেই সমস্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে, যাঁরা মাদ্রাসার ধর্মীয় মর্যাদাকে শিশু নির্যাতনের আড়াল হিসেবে ব্যবহার করেন। অপরাধীর ধর্মীয় পরিচয় নয়, তাঁর অপরাধই বিচারের একমাত্র বিবেচ্য হওয়া উচিত। যে মাদ্রাসার চার দেয়ালে শিশুর কান্না চাপা পড়ে, যে প্রতিষ্ঠানে নির্যাতিতের আর্তনাদের চেয়ে অভিযুক্ত শিক্ষকের সম্মান অধিক গুরুত্ব পায়, সেখানে ধর্মীয় শিক্ষার নৈতিক উদ্দেশ্যই বিপন্ন হয়।
শিশুর সম্ভ্রমের চেয়ে কোনো হুজুরের মর্যাদা বড় নয়; শিশুর জীবনের চেয়ে কোনো মাদ্রাসার সুনাম মূল্যবান নয়। ধর্মের আবরণে বলাৎকারের অভিযোগ গোপন করার দিন শেষ হোক। মাদ্রাসার প্রতিটি শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত হোক। আর আলেমের মুখোশে অপরাধ সংঘটনকারী প্রত্যেক জালেমের বিচার হোক আইনের কঠোরতম প্রয়োগের মাধ্যমে।
[লেখক: কলামিস্ট ও জনসংযোগ পেশাজীবী]
মতামত দিন