Views Bangladesh Logo

বেইলি রোড অগ্নিকাণ্ড

স্বজনহারাদের আজ কেবলই কান্না

চারিদিকে শ্মশানের মত দাউদাউ করে জ্বলছে আগুন। অসহায় দৃষ্টিতে চেয়ে চেয়ে দেখা ছাড়া করার ছিল না কিছুই।গতকাল বৃহস্পতিবার (২৯ ফেব্রুয়ারি) সপ্তাহের শেষ রাতে বেইলি রোডের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর, ঢাকা মেডিকেলে লাশ সনাক্ত করতে এসে স্বজনদের আহাজারি যেন আর থামছেই না। কোনো কোনো পরিবারের প্রায় সবাইকেই আগুনের লেলিহান শিখা কেড়ে নিয়েছে। প্রিয়জন হারানোর ক্ষত বুকে নিয়ে তাই বিরামহীন বিলাপ করছেন তাঁরা।

মর্মান্তিক এই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে মারা গেছেন ১০ জন। এ ছাড়া ভর্তি রয়েছে আরও অনেকে। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে আরও ৩৩ জন।

কেউ রইলো না মোবারকের পরিবারে
প্রবাসী সৈয়দ মোবারক হোসেন ইতালিতে ব্যবসা করতেন। দেশে এসেছিলেন ছুটি কাটাতে। রাতের খাবার খেতে গিয়ে গত রাতে অগ্নি দুর্ঘটনায় পড়ে যান। হতভাগ্য মোবারকের সঙ্গে থাকা তাঁর স্ত্রী স্বপ্না, দুই মেয়ে সৈয়দা কাশফিয়া ও সৈয়দা নূর, একমাত্র ছেলে সৈয়দ আব্দুল্লাহর কেউই আর বেঁচে নেই।

মোবারকের চাচাতো ভাই ফয়সাল জানান, মোবারক তার পরিবারের সকলকে নিয়ে ইতালি যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলো কিন্তু ভয়াবহ এই আগুন তাদের সব কিছু কেড়ে নিয়েছে। খবর পেয়ে তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজে এসে মোবারক ও তার পরিবারের সকলের লাশ সনাক্ত করেছেন।

হায় বার্গার!
‘খানস’ এ বার্গার খেতে ঢুকেছিলেন নাজিয়া। সঙ্গে ছিল দুই ছেলে। কিন্তু বার্গার খেয়ে আর ঘরে ফেরা হলো না তাদের।

নাজিয়ার স্বজনরা বলছেন, সন্ধ্যের পর স্বামী আশিককে ফোনে নাজিয়া জানিয়েছিলেন ছেলেরা রেস্টুরেন্টে খাওয়ার বায়না ধরেছে। আশিক তখন তাদেরকে বাসার কাছের রেস্টুরেন্টে খাওয়ার জন্য যেতে বলেন।

আগুন লাগার পরও নাজিয়ার সঙ্গে আশিকের যোগাযোগ হয়। নাজিয়া ফোন করে জানিয়েছিলেন তারা আগুনের মধ্যে পড়ে গেছেন। শেষের দিকে একবার ফোন করে জানিয়েছিলেন, তিনি তার ছোট ছেলে তিন বছরের আয়ানকে হারিয়ে ফেলেছেন। এক সময় পরিবার স্বজন সবাই বেইলি রোডে ছুটে আসেন। বারবার নাজিয়াকে ফোন করেও ওপর প্রান্ত থেকে কোন সাড়া পাননি। নাজিয়ার পরিবারের সদস্য রিফাত জানান, নাজিয়ারা স্বামীর সঙ্গে বেইলি রোডের বেইলি রিচ অ্যাপার্টমেন্টে থাকতেন।

কুরবান আলীর কান্না আর থামবে না
নারায়ণগঞ্জের পোশাক কারখানা রিয়া ফ্যাশনের স্বত্বাধিকারী কুরবান আলী। একমাত্র মেয়ে রিয়াকে পড়তে পাঠিয়েছিলেন মালেশিয়ায়। রিয়া ছুটি কাটাতে এসেছিলেন ঢাকায়। আগামীকাল ২ মার্চ তার আবার মালেশিয়ায় ফিরে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু আগুনের ভয়াবহতা কেড়ে নিয়েছে একমাত্র আদরের মেয়ের প্রাণ।

বইমেলা থেকে বেইলি রোড, এরপর মৃত্যু
বাঙালির প্রাণের উৎসব বইমেলা শেষ হচ্ছে। দুই ছেলে-মেয়েকে নিয়ে পপি পোদ্দার মেলায় গিয়েছিলেন। ফেরার পথে মেয়ে আদৃতা আর ছেলে সংকল্পকে নিয়ে ‘কাচ্চি ভাই’তে ঢুকেছিলেন। ভাই পীযূষকেও ডেকেছিলেন খেয়ে যেতে। পীযূষ আসেনি। এর কিছুক্ষণ পরে যখন আগুন লাগে, পপি আর ভেতর থেকে বের হতে পারেননি।

পীযূষ পোদ্দার বলেন, “আমাকেও খেতে যাওয়ার জন্য ফোন করেছিল। কিন্তু আমি যাইনি। টিভিতে খেলা দেখছিলাম। একটু পর আমার বোন ফোন করে ‘আগুন লেগেছে’ বলে চিৎকার করতে থাকে। পাশে থাকা ভাগ্নিও চিৎকার করে বলছিল, ‘মামা আমাদের বাঁচাও। আমরা বের হতে পারছি না।’ আমি শান্তিনগরের বাসা থেকে এক দৌড়ে গিয়েছি। কিন্তু গিয়ে দেখি রেস্টুরেন্টে শ্মশানের মতো আগুন জ্বলছে। বাইরে থেকে চেয়ে চেয়ে দেখা ছাড়া আর কিছুই করার ছিল না।”

মতামত দিন

মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে

ট্রেন্ডিং ভিউজ