মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে তেলের দাম ১০০ ডলার ছাড়াল
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানের চলমান সংঘাতের প্রভাব বিশ্ব জ্বালানি বাজারে বড় ধাক্কা দিয়েছে। সংঘাত তীব্র হওয়ায় প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ব্যারেল তেলের সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম আবারও ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে উঠে গেছে, যা ২০২২ সালের পর প্রথমবার। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান এ তথ্য জানিয়েছে।
সোমবার (৯ মার্চ) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, মধ্যপ্রাচ্যে সহিংসতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তেলের সরবরাহ সংকট নিয়ে উদ্বেগ দ্রুত বেড়েছে। এর প্রভাবে তেলের দাম চার বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে এবং বৈশ্বিক শেয়ারবাজারেও বড় ধরনের দরপতন দেখা গেছে।
সপ্তাহান্তে ইরানের রাজধানী তেহরান ও আশপাশের অন্তত পাঁচটি জ্বালানি স্থাপনায় হামলার খবর পাওয়া গেছে। হামলার পর তেহরানে ধ্বংসস্তূপের মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রে দাবি করা হয়েছে। একই সময়ে সম্ভাব্য প্রতিশোধমূলক হামলার আশঙ্কায় কুয়েতের জাতীয় তেল কোম্পানিও সতর্কতামূলকভাবে উৎপাদন কমানোর ঘোষণা দিয়েছে।
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ হরমুজ প্রণালি প্রায় এক সপ্তাহ ধরে কার্যত বন্ধ রয়েছে। সাধারণত সমুদ্রপথে পরিবাহিত বিশ্ব তেল ও গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই প্রণালি দিয়েই পরিবহন করা হয়। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামে বড় ধরনের ঊর্ধ্বগতি দেখা দিয়েছে।
এশিয়া–প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের লেনদেন শুরুতেই আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ১৬ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১০৮ দশমিক ১০ ডলারে দাঁড়ায়। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের বেঞ্চমার্ক ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) তেলের দাম ১৯ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১০৮ দশমিক ৭২ ডলারে পৌঁছায়।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বলেছেন, তেলের এই মূল্যবৃদ্ধি বিশ্বের নিরাপত্তা ও শান্তি নিশ্চিত করার জন্য সামান্য মূল্য এবং এটি যুদ্ধের স্বল্পমেয়াদি প্রভাব। তাঁর দাবি, ইরানের পারমাণবিক হুমকি নির্মূল হলে তেলের দাম দ্রুত কমে আসবে।
অন্যদিকে ইরান সতর্ক করে জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা অব্যাহত থাকলে তেলের দাম আরও বাড়তে পারে। দেশটির বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর এক মুখপাত্র বলেছেন, যদি ব্যারেলপ্রতি ২০০ ডলারের বেশি তেলের দাম মেনে নেওয়ার প্রস্তুতি থাকে, তাহলে এই যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া যেতে পারে।
এদিকে তেলের দামের ঊর্ধ্বগতির প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক শেয়ারবাজারেও। সোমবার টোকিওতে জাপানের নিক্কেই সূচক ৬ দশমিক ৩ শতাংশ কমেছে। দক্ষিণ কোরিয়ার কোস্পি সূচক কমেছে ৫ দশমিক ৯ শতাংশ এবং অস্ট্রেলিয়ার এএসএক্স ২০০ সূচক প্রায় ৩ দশমিক ৯ শতাংশ নেমে গেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ব্যারেল তেলের ঘাটতি বৈশ্বিক বাজারে বড় চাপ তৈরি করেছে এবং পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক হওয়ার কোনো ইঙ্গিত নেই। বছরের শুরুতে যেখানে তেলের দাম ছিল ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৬০ ডলার, সেখানে এখন তা প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ বেড়ে গেছে।
কাতারের জ্বালানি মন্ত্রীও সতর্ক করে বলেছেন, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে উপসাগরীয় অঞ্চলের তেল রপ্তানিকারক দেশগুলো কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই উৎপাদন বন্ধ করতে বাধ্য হতে পারে। সে ক্ষেত্রে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১৫০ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে।
এদিকে হরমুজ প্রণালিতে চলাচলকারী শত শত তেলবাহী জাহাজ এখন কার্যত আটকে আছে। ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী হুঁশিয়ারি দিয়েছে, এই পথ ব্যবহার করলে যেকোনো জাহাজে হামলা চালানো হতে পারে।

মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে