ত্রাণ বিতরণে সমন্বয় জরুরি
দেশের ১১ জেলায় ভয়াবহ চলমান বন্যায় দেশবাসী নজিরবিহীন তৎপরতা ও মানবিকতা দেখিয়েছে। এ ক্ষেত্রে বিশেষ করে আলাদাভাবে ছাত্রদের সাংগঠনিক কর্মদক্ষতার কথা স্বীকার করতেই হয়। ত্রাণ সংগ্রহে ছাত্রদের তাৎক্ষণিক আহ্বানে সাধারণ মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে সাড়া দিয়েছে। টিএসসি প্রাঙ্গণ ভরে গেছে ত্রাণে। ২১-২২ আগস্ট টিএসসির সামনে গাড়ি চলাচলেরও জায়গা ছিল না। ত্রাণ নিয়ে একের পর এক ট্রাক গেছে ফেনী, কুমিল্লা অঞ্চলে। দেশের সাধারণ মানুষ, অন্যান্য সংগঠনও প্রশংসনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করেছে ত্রাণ সংগ্রহে ও বিতরণে।
যার যার সামর্থ্য অনুযায়ী নৌকা, ট্রলার স্পিডবোট, খাবার, চিকিৎসার সরঞ্জাম ইত্যাদি জরুরি প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে ছুটে গেছেন বন্যাদুর্গত এলাকায়; কিন্তু গত তিন-চার দিন ধরেই আমরা জানতে পারছি ত্রাণ বিতরণে এক ধরনের সমন্বয়হীনতা চলছে। দুর্গম দুর্গত এলাকার মানুষ ত্রাণ না পেয়ে কাছাকাছি অবস্থিত মানুষই বারবার ত্রাণ পাচ্ছেন। বিভিন্ন সংগঠনের স্বেচ্ছাসেবকরা ত্রাণ নিয়ে পৌঁছেছেন একই এলাকায়।
গতকাল বুধবার (২৮ আগস্ট) সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবর থেকে জানা যায়, বন্যাকবলিত মানুষের অভিযোগ, সড়কের পাশের বাড়িঘর ও আশ্রয়কেন্দ্রগুলোর মানুষজন একাধিকবার ত্রাণ পাচ্ছে; কিন্তু প্রত্যন্ত এলাকায় পর্যাপ্ত ত্রাণ যাচ্ছে না। মূলত ত্রাণ বিতরণে সমন্বয়হীনতার কারণে দুর্গতদের সবার কাছে সমানভাবে ত্রাণ পৌঁছাচ্ছে না। এ জন্য ত্রাণ বিতরণে স্থানীয় প্রশাসন ও সরকারের সহায়তা চেয়েছেন বন্যাকবলিত ব্যক্তিরা। আর স্থানীয় প্রশাসন বলছে, বন্যার্ত মানুষের বিপরীতে বরাদ্দকৃত ত্রাণের পরিমাণ কম।
জনসাধারণের এমন স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে কিছুটা সমন্বয়হীনতা হবে সেটা স্বাভাবিক। তা ছাড়া এ মুহূর্তে অনেক স্থানে প্রশাসন ঠিক মতো কাজ করতে পারছে না। একে তো সরকার পরিবর্তনের কারণে স্থানীয় প্রশাসনব্যবস্থা অনেকটা বিশৃঙ্খল অবস্থায় আছে, দ্বিতীয়ত, হঠাৎ অপ্রত্যাশিত বন্যাও সবকিছু অগোছালো করে দিয়েছে। তারপরও প্রথম থেকে একটা কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপনা বলবৎ থাকলে পরিস্থিতি আরও সুশৃঙ্খলভাবে সামাল দেয়া যেত।
তারপরও সেই সময় হয়তো এখনো চলে যায়নি। গোমতী নদীর বাঁধ ভেঙে যাওয়ার কারণে অনেক জায়গা নতুন করে প্লাবিত হচ্ছে। ফেনী অঞ্চলে অনেক জায়গায় পানি কমলেও বন্যা-পরবর্তী সমস্যা বাড়ছে। অনেকে তার ঘরবাড়িসহ সর্বস্ব হারিয়েছেন। তাদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। সরকারি সাহায্যসহ সর্বমহলের সহযোগিতায় আশানুরূপ ত্রাণ-সামগ্রী ও নগদ অর্থ পাওয়া গেছে। এখন দরকার একটি কেন্দ্রীয় সমন্বয় কমিটি গঠন। কেন্দ্রীয় সমন্বয় কমিটি ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হবে না। তা না-হলে অনেকেই বঞ্চিত হবেন।
স্বেচ্ছাসেবক, সংশ্লিষ্ট প্রশাসক, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি এ সময় সাংবাদিকদেরও গুরুত্ব অপরিসীম। প্রত্যন্ত অঞ্চল ঘুরে ঘুরে তাদের সঠিক খবর সংগ্রহ করে প্রশাসক ও জনগণকে জানাতে হবে। অনেক অঞ্চলে যোগাযোগ ব্যবস্থা স্বাভাবিক হয়েছে, বিদ্যুৎ ফিরে এসেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখন খবর ছড়িয়ে দেয়ার গুরুত্বপূর্ণ উপায়। স্থানীয় লোকজনই তা জানাতে পারেন যে কোন কোন অঞ্চল এখনো সাহায্য পাওয়ার হাত থেকে বঞ্চিত। তাতে স্বেচ্ছাসেবক, সমন্বয়কারী ও প্রশাসনের জন্য সুবিধা হবে।
সর্বোপরি স্থানীয় প্রশাসনকেই জরুরি ভিত্তিতে দায়িত্বভার গ্রহণ করতে হবে। দেশের এমন দুর্যোগ পরিস্থিতে আর বিলম্ব করার সুযোগ নেই। বন্যার পানি নেমে গেলে অনেক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন হয়তো সরে যাবেন; কিন্তু, বন্যা-পরবর্তী দুর্যোগ সামাল দেয়ার দায়িত্ব পালন করতে হবে বর্তমান সরকারকেই। সরকারের উচিত ত্রাণ বিতরণসহ বন্যা-দুর্গতদের পুনর্বাসনের জন্য এখনই জরুরি ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে