ধানমন্ডিতে বহুতল ভবন থেকে পড়ে শিশু গৃহকর্মীর মৃত্যু ঘিরে বিতর্ক, পরিবারের দাবি ‘হত্যা’
রাজধানীর ধানমন্ডি এলাকায় বহুতল ভবন থেকে পড়ে ১১ বছর বয়সী এক শিশু গৃহকর্মীর রহস্যজনক মৃত্যুকে কেন্দ্র করে নতুন করে বিতর্ক ও প্রশ্নের জন্ম হয়েছে। শুক্রবার (১৯ জুন) সকালে গুরুতর আহত অবস্থায় শিশুটিকে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
নিহত শিশুটির নাম রিক্তা (১১)। শিশুটির বাড়ি সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলায়। তার বাবা পেশায় দিনমজুর। চার বোন এক ভাইয়ের মধ্যে সে ছিল দ্বিতীয়। পরিবারের দাবি, মাত্র ৪ হাজার টাকা মাসিক বেতনে তাকে ঢাকায় গৃহকর্মীর কাজে পাঠানো হয়েছিল। কোরবানি ঈদের ১৫ দিন আগে তাকে নিয়োগ দেয়া হয়েছিল একজন উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তার বাসায়।
ঘটনার পর থেকেই এটি দুর্ঘটনা নাকি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড—সে বিষয়ে ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য পাওয়া যাচ্ছে। পুলিশ বলছে, বিষয়টি তদন্তাধীন এবং ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনের পর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিশ্চিত হওয়া যাবে। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ নিয়ে নানা প্রশ্ন তুলছেন নেটিজেনরা। কেউ বলছেন এটি হত্যা, আবার কেউ বলছেন প্ররোচিত আত্মহত্যা।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ধানমন্ডি জোনের সহকারী কমিশনার সাদ্দাম হোসাইন জানান, শিশুটি ধানমন্ডির ১০ তলার একটি ফ্ল্যাটে গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করত। সকালে তাকে গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়া হয় এবং চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। পরে মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।
পুলিশের প্রাথমিক ভাষ্য অনুযায়ী, শিশুটি ছাদ বা উঁচু স্থান থেকে পড়ে গিয়ে মারা গেছে। তবে এটি কীভাবে ঘটেছে—দুর্ঘটনা, আত্মহত্যা নাকি অন্য কোনো কারণ—তা নিশ্চিত নয়।
অন্যদিকে শিশুটির পরিবার দাবি করছে, এটি কোনো দুর্ঘটনা নয় বরং পরিকল্পিতভাবে তাকে হত্যা করা হয়েছে।
শিশুটির বাবা কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, কয়েক দিন আগে মেয়ে ফোন করে কান্নাকাটি করে জানিয়েছিল যে সে আর ওই বাসায় কাজ করতে চায় না। পরিবারের দাবি, পরে তাকে বাড়িতে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন তারা।
পরিবারের অভিযোগ, শিশুটিকে ওই বাসায় যার মাধ্যমে পাঠানো হয়েছিল, সে গৃহকর্তার কাছ থেকে এককালীন ১০ হাজার টাকা গ্রহন করে। এই টাকা ফেরত না পেলে গৃহকর্তা শিশুটিকে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দিতে অস্বীকৃতি জানান।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে এখনও অভিযুক্তদের কারো বক্তব্য নেয়া সম্ভব হয়নি।
ঘটনার পর থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। অনেকেই শিশু শ্রম, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, এবং গৃহকর্মীদের সুরক্ষা আইন কার্যকর না হওয়ার বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন।
পুলিশ জানিয়েছে, শিশুটির শরীরে কোনো আঘাতের চিহ্ন ছিল কি না এবং ঘটনাস্থলের পরিস্থিতি কেমন ছিল—তা ময়নাতদন্ত ও ফরেনসিক রিপোর্টের পর স্পষ্ট হবে।
একই সঙ্গে ভবনের সিসিটিভি ফুটেজ, প্রত্যক্ষদর্শীদের জবানবন্দি এবং সংশ্লিষ্ট বাসার সদস্যদের বক্তব্য যাচাই করা হচ্ছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ধানমন্ডি এলাকায় এর আগেও গৃহকর্মী শিশুদের মৃত্যুর একাধিক ঘটনা ঘটেছে, যা নতুন করে এই ঘটনার সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছে। এতে এলাকাটিতে শিশু গৃহশ্রমিকদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে।
পুলিশ বলছে, এটি অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি ঘটনা। তাই এখনই কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাচ্ছে না। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন ও তদন্ত শেষ হলে প্রকৃত সত্য জানা যাবে বলে জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
এদিকে নিহত শিশুটির পরিবার দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছে।
মতামত দিন