পাঠ্যপুস্তক সমন্বয় কমিটি বাতিল
শিক্ষাসংস্কারের পথে এমন দৃষ্টান্ত কাম্য নয়
ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পরে দেশেজুড়ে এক ধরনের সম্প্রদায়িক শক্তিরই উত্থান ঘটছে। বেশ কিছু ঘটনায় জনজীবনে আতঙ্ক ও অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মাধ্যমের দেশের মানুষ নিজেদের ভয়-ভীতির কথা জানান দিতে শুরু করেছেন। মাজার ভাঙা ও বিচার নিজের হাতে তুলে নেয়ার ঘট্নাগুলো দেশের বর্তমান বিশৃঙ্খলার একটা বড় উদাহরণ। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে, রাষ্ট্রীয় নীতিতে সাম্প্রদায়িক শক্তির হুমকি। এই হুমকির সাম্প্রতিক উদাহরণ পাঠ্যপুস্তক সংশোধন ও পরিমার্জন কমিটি বাতিল করে বিজ্ঞপ্তি দেয়া।
গত ১৫ সেপ্টেম্বর জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) প্রণীত ও মুদ্রিত সব পাঠ্যপুস্তক সংশোধন এবং পরিমার্জন কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন ও সমন্বয়ের লক্ষ্যে ১০ সদস্যের একটি সমন্বয় কমিটি গঠন করেছিল শিক্ষা মন্ত্রণালয়। ইসলামপন্থিদের একটি বিশেষ দলের কাছ থেকে কমিটির দুজন সদস্য সম্পর্কে অভিযোগ ওঠে এবং কমিটিতে কোনো আলেম কেন রাখা হয়নি, তা নিয়েও তারা আপত্তি তোলেন।
এরই পরিপ্রেক্ষিতে ১৩ দিনের মাথায় শিক্ষা মন্ত্রণালয় ওই কমিটি বাতিল করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। এ নিয়েও এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনা- সামান্য হুমকিতেই যদি পুরো কমিটি বাতিল করে দিতে হয়, তাহলে আগামী দিনে কাজ করবে কীভাবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। কারণ যে কোনো ইস্যুতেই বিপক্ষ দলের সব সময় আপত্তি ও অভিযোগ থাকতে পারে।
প্রাপ্ত তথ্যমতে, ওই কমিটি গঠনের পর পাঠ্যপুস্তক সংশোধন ও পরিমার্জন কমিটিতে কমপক্ষে দুজন আলেমকে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য দাবি তোলে জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ ও হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশসহ ধর্মভিত্তিক কয়েকটি দল ও সংগঠন। এ ছাড়া কমিটি থেকে দুজন সদস্যকে বাদ দেয়ার জন্য মানববন্ধন করেছে ধর্মভিত্তিক একাধিক সংগঠন। গতকাল ৩০ সেপ্টেম্বর (সোমবার) পত্রিকায় প্রকাশিত খবরে জানা যায়, মৌলবাদের সঙ্গে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের এই আপসকামিতাকে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি হিসেবে দেখছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)।
জানা গেছে, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশ অনুযায়ী কমিটি বাতিল করেছে মন্ত্রণালয়; কিন্তু কে সেই ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ, তা জানা যায়নি। না জানা গেলেও অনুমান করা যায়, সরকারের কোনো উপদেষ্টাই হয়তো হবেন। এরকম যদি হয়, পরবর্তী কমিটি তাহলে কীরকম হবে? সে কমিটি নিয়েও যদি কোনো বিশেষ মহল আপত্তি তোলে, তাহলে কি সেই কমিটিও বাতিল হয়ে যাবে।
শিক্ষাবিষয়ক বিশেষজ্ঞকরা বলছেন, আগের কমিটিটি অত্যন্ত যোগ্য লোকদের নিয়েই গঠিত হয়েছিল। নিজ নিজ ক্ষেত্রে তারা প্রত্যেকেই যোগ্য। কোনো বিশেষ বিষয় নিয়ে বিশেষ কারও আপত্তি থাকলে তা শোনা যেত, একজন আলেমকেও হয়তো অন্তর্ভুক্ত করা যেত, এর জন্য পুরো কমিটি বাতিল করে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে আপসকামিতা। আর রাষ্ট্রের সঙ্গে ধর্মের স্পষ্ট পার্থক্য আছে তাও আমাদের স্বীকার করতে হবে।
সব জায়গায় যদি ধর্মীয় জোর-জবরদস্তি চলতে থাকে, তাহলে না থাকবে রাষ্ট্র, না থাকবে ধর্ম। বাংলাদেশ হাজার বছর ধরেই বহুমত, সম অধিকারভিত্তিক, অসাম্প্রদায়িক একটি দেশ। গণঅভ্যুত্থানের আগেও এসব বিষয় নিয়ে এত কথাবার্তা হয়নি। এখন কেন তাহলে হঠাৎ করে ধর্মকে রাষ্ট্রের বিপক্ষে দাঁড় করিয়ে দেয়া হচ্ছে।
নিঃসন্দেহে তা একটি বিশেষ গোষ্ঠীর উদ্দেশ্য প্রণোদিত দাবি। আমরা চাই, এসব বিশেষ গোষ্ঠীর প্রতি রাষ্ট্র যেন নতজানু না হয়। কোনো সাম্প্রদায়িক শক্তির সঙ্গে আপস না করে বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে বহুমত, সমঅধিকার ও অসাম্প্রদায়িক চেতনায়- এটাই প্রত্যাশা।

মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে