তিন দিনেই বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে গেল তিন আয়োজক
ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর শেষ ষোলো যেন হয়ে উঠল টুর্নামেন্টের তিন যৌথ আয়োজক দেশের জন্য এক ভয়াবহ দুঃস্বপ্নের প্রতীক। প্রথমবারের মতো তিনটি দেশ মিলে আয়োজিত এই বিশ্বকাপে নিজেদের মাটিতে খেলার বাড়তি সুবিধা নিয়েও শেষ পর্যন্ত রক্ষা পায়নি কেউই। মাত্র তিন দিনের স্বল্প ব্যবধানে একে একে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিতে হলো কানাডা, মেক্সিকো ও যুক্তরাষ্ট্রকে; যেন পূর্বনির্ধারিত এক চিত্রনাট্যের মতোই একের পর এক ভেঙে পড়ল আয়োজক দেশগুলোর স্বপ্ন।
প্রতিটি দলই হেরেছে তাদের চেয়ে তুলনামূলক শক্তিশালী ও অভিজ্ঞ প্রতিপক্ষের কাছে, যদিও হারের ধরন ও প্রেক্ষাপট ছিল একেবারেই ভিন্ন তিন রকম। কারো জন্য এই বিদায় ছিল ইতিহাস গড়ার পরের এক গর্বের সমাপ্তি, কারো জন্য আবার টানা কয়েক আসরের পুরনো হতাশারই পুনরাবৃত্তি। ফুটবল বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ এই আসরে আয়োজক হওয়ার সুবিধা যে মাঠের লড়াইয়ে সবসময় কাজে আসে না, তিন দেশের এই টানা বিদায় যেন আরও একবার সেই বাস্তবতাই মনে করিয়ে দিল।
কানাডা: ইতিহাস গড়েও থামতে হলো মরক্কোর কাছে
মরক্কোর বিপক্ষে ৩-০ গোলে হেরে বিশ্বকাপ শেষ হয়েছে কানাডার ঐতিহাসিক অভিযানের। হিউস্টন স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত এই ম্যাচে প্রথমার্ধে বেশ ভালো ছন্দেই ছিল কানাডা, একাধিক কর্নার ও আক্রমণ তৈরি করে চাপে রেখেছিল মরক্কোর রক্ষণকে, তবে মরক্কো গোলরক্ষক ইয়াসিন বোনোর দৃঢ়তায় গোলের দেখা পায়নি স্বাগতিকরা। বিরতির পর ৫০ মিনিটে অধিনায়ক আশরাফ হাকিমির ফ্রি-কিক থেকে বল পেয়ে নিচু শটে জাল খুঁজে নেন আজেদিন ওনাহি, যা ভাঙে ম্যাচের অচলাবস্থা। এরপর ৮২ মিনিটে ব্রাহিম দিয়াজের নিখুঁত পাস থেকে পাল্টা আক্রমণে ব্যবধান দ্বিগুণ করেন ওনাহি নিজেই, আর যোগ করা সময়ে দিয়াজের আরও একটি অ্যাসিস্ট থেকে ব্যবধান ৩-০ করেন সুফিয়ান রাহিমি; যা দিয়াজের এই বিশ্বকাপে চতুর্থ অ্যাসিস্ট এবং আফ্রিকান খেলোয়াড়দের মধ্যে এক আসরে সর্বোচ্চ অ্যাসিস্টের নতুন রেকর্ড।
হারলেও এই আসরকে কানাডার ফুটবলের জন্য এক যুগান্তকারী সাফল্য হিসেবেই দেখা হচ্ছে, কেননা নিজেদের ইতিহাসে এই প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের রাউন্ড অব ১৬-এ পৌঁছেছিল তারা। শৃঙ্খলাবদ্ধ ও সুসংগঠিত মরক্কোর বিপক্ষে দ্বিতীয়ার্ধে গিয়ে আক্রমণভাগে নিজেদের ছন্দ খুঁজে পায়নি কানাডা, ধীরে ধীরে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বড় ব্যবধানে হারের মুখ দেখে দলটি। উল্লেখযোগ্যভাবে, মাত্র পাঁচটি শট নিয়েই এই জয় তুলে নেয় মরক্কো, যা ১৯৬৬ সালের পর বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে জয়ী কোনো দলের সর্বনিম্ন শট সংখ্যার রেকর্ড। তবে নিজেদের ইতিহাসের সেরা ফলাফল নিয়ে বিদায় নিলেও এই হার স্পষ্ট করে দিয়েছে অভিজাত পর্যায়ের দলগুলোর সঙ্গে কানাডার এখনো কতটা ব্যবধান রয়ে গেছে।
মেক্সিকো: নিখুঁত গ্রুপ পর্বের রাজত্ব শেষ হলো নকআউটের প্রথম ধাপেই
ইংল্যান্ডের বিপক্ষে নাটকীয় ৩-২ গোলের হারে থেমে গেছে মেক্সিকোর বিশ্বকাপ অভিযান। গ্রুপ ‘এ’-তে টানা তিন জয়ে এবং কোনো গোল হজম না করেই শীর্ষে থেকে গ্রুপ পর্ব শেষ করা মেক্সিকোকে নকআউট পর্বে পড়তে হয় আরও কঠিন পরীক্ষায়। মেক্সিকো সিটির ঐতিহাসিক আজতেকা স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত এই ম্যাচে প্রথমার্ধেই জুড বেলিংহাম মাত্র ৯৮ সেকেন্ডের ব্যবধানে জোড়া গোল করে ইংল্যান্ডকে ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে দেন, তবে বিরতির আগেই দুর্দান্ত এক ভলিতে ব্যবধান কমান হুলিয়ান কিনোনেস। দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই বড় ধাক্কা খায় ইংল্যান্ড— ৫৪ মিনিটে ভিএআর পর্যালোচনার পর সরাসরি লাল কার্ড দেখেন জারেল কুয়ানসাহ, ফলে বাকি পুরো সময়টাই ১০ জন নিয়ে খেলতে হয় থ্রি লায়ন্সদের। এরপরও ৬০ মিনিটে পেনাল্টি থেকে ব্যবধান বাড়ান হ্যারি কেইন, আর জবাবে নিজেদের পাওয়া আরেকটি পেনাল্টি থেকে ব্যবধান ৩-২ করেন রাউল হিমেনেজ।
শেষ ২১ মিনিট ও যোগ করা সময়জুড়ে ইংল্যান্ডকে রীতিমতো চেপে ধরেছিল স্বাগতিকরা, তবে গোলরক্ষক জর্ডান পিকফোর্ডের একের পর এক দুর্দান্ত সেভে শেষ পর্যন্ত সমতা ফেরানো সম্ভব হয়নি। এই হারের মধ্য দিয়ে আজতেকা স্টেডিয়ামে বিশ্বকাপের ইতিহাসে নিজেদের প্রথম হারের স্বাদ পেল মেক্সিকো, আর ১৯৮৬ সালের পর প্রথমবার কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার স্বপ্নও অধরাই থেকে গেল তাদের। ফলে টানা কয়েক আসরের মতো এবারও নকআউট পর্বের প্রথম ধাপেই থেমে গেল মেক্সিকোর হতাশাজনক যাত্রা।
যুক্তরাষ্ট্র: সবচেয়ে বড় ব্যবধানে বিদায় স্বাগতিকদের
তিন আয়োজকের মধ্যে সবচেয়ে বড় ব্যবধানের হার নিয়ে বিদায় নিতে হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রকে। সিয়াটল স্টেডিয়ামে বেলজিয়ামের কাছে ৪-১ গোলে হেরেছে স্বাগতিকরা। ম্যাচের নবম মিনিটেই ইউরি তিলেমান্সের নিখুঁত পাস থেকে চার্লস দে কেতেলারের গোলে পিছিয়ে পড়ে যুক্তরাষ্ট্র। ৩১ মিনিটে সেট-পিস থেকে মালিক টিলম্যানের দুর্দান্ত হেডে সাময়িকভাবে সমতায় ফিরলেও সেই স্বস্তি স্থায়ী হয় মাত্র দুই মিনিট। ৩৩ মিনিটে ফের গোল করে জোড়া গোল পূর্ণ করেন দে কেতেলার।
টুর্নামেন্টের শুরুর দিকের পর্বগুলোয় সাবলীলভাবে এগিয়ে যাওয়া যুক্তরাষ্ট্র এই ম্যাচে ছিল অস্বাভাবিক রকমের নার্ভাস, রক্ষণভাগে একের পর এক গুরুতর ব্যক্তিগত ভুল করে বসে তারা, যার সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগায় বেলজিয়াম। দ্বিতীয়ার্ধে ৫৭ মিনিটে বদলি খেলোয়াড় হান্স ভানাকেনের গোলে ব্যবধান আরও বাড়ে, আর অতিরিক্ত সময়ে ভানাকেনের অ্যাসিস্ট থেকে রোমেলু লুকাকুর গোলে ব্যবধান দাঁড়ায় ৪-১। এভাবেই একের পর এক রক্ষণভাগের ভুল আর বেলজিয়ামের ক্ষুরধার পাল্টা আক্রমণে সম্পূর্ণভাবে চাপা পড়ে যায় যুক্তরাষ্ট্রের সব আশা, আর তার মধ্য দিয়েই বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিতে হলো শেষ আয়োজক দেশটিকেও।
মতামত দিন