উপকূলীয় কৃষিতে রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার, অর্থনীতি ও পরিবেশে প্রভাব
সুন্দরবন–সংলগ্ন সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলায় কৃষিতে রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার বাড়ছে। এতে কৃষকের উৎপাদন খরচ বাড়ছে, মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হচ্ছে এবং পরিবেশের ক্ষতি হচ্ছে।
উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকায় কয়েক দশক ধরে ফসলের জমিতে নদী থেকে লোনা পানি তুলে চিংড়ি চাষ করা হয়েছে। এতে মাটিতে লবণাক্ততা বেড়েছে। বর্তমানে এসব জমিতে মিষ্টি পানি দিয়ে চাইলেও কৃষিকাজ করা যাচ্ছে না।
তবু গত এক দশক ধরে স্থানীয় কৃষকরা মিষ্টি পানির ফসল ফলানোর চেষ্টা করছেন। তাঁরা বছরে একাধিকবার ধান চাষ করছেন। হারিয়ে যাওয়া বীজ সংগ্রহ করে স্থানীয় জাতের সবজি ও ফসলও চাষ করছেন। তবে এ কাজে তাঁদের নানা সমস্যায় পড়তে হচ্ছে।
উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি
লবণাক্ত মাটির কারণে কৃষকরা বেশি পরিমাণে রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছেন। এতে জমির উর্বরতা কমছে, পরিবেশ ও স্বাস্থ্যের ক্ষতি হচ্ছে এবং কৃষকের খরচও বাড়ছে।
সময়মতো সার ও কীটনাশক না দিলে ফলন কমে যায়। কৃষকরা জানান, এক বিঘা জমিতে প্রাকৃতিক সার ব্যবহার করে যে ফসল পাওয়া যায়, রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহার করলে তার প্রায় পাঁচগুণ ফসল পাওয়া যায়। এ কারণেই তাঁরা রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহার করছেন।
এর মধ্যে শ্যামনগরে কর্মরত বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান বারসিকের সহায়তায় কিছু কৃষক ধীরে ধীরে প্রাকৃতিক সার ও জৈব বালাইনাশক ব্যবহার করছেন। এতে তাঁরা সম্ভাবনা দেখছেন।
ঋণনির্ভরতা
অতিরিক্ত সার ও কীটনাশক কিনতে কৃষকরা ঋণ নিচ্ছেন। কৃষকরা আর্থিকভাবে সচ্ছল নন। চাষের সময় তাঁদের হাতে টাকা থাকে না। বীজ কিনে চাষ শুরুর পর সময়মতো সার ও কীটনাশক দিতে না পারলে ফলন কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।
এ কারণে কৃষকরা মৌসুমে বীজ কোম্পানি, স্থানীয় সার ডিলার, কীটনাশক ব্যবসায়ী, মহাজন ও ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ঋণ নেন। এই ঋণ শোধ করতে তাঁদের সারা বছর কিস্তি দিতে হয়। বেশির ভাগ ক্ষুদ্র কৃষক পরিবার নারী সদস্যদের মাধ্যমে ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নেয়। কখনো কখনো তাঁরা স্থানীয় মহাজনের কাছ থেকে উচ্চ সুদে ঋণ নিতে বাধ্য হন।
পরিবেশের ক্ষতি
দীর্ঘদিন রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহারের ফলে এলাকার পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়েছে। এখন এ অঞ্চলে আম, জাম, লেবু, নারকেল, সফেদা ও জামরুলের গাছ প্রায় দেখা যায় না।
আগে প্রতিটি বাড়িতে বিভিন্ন ফলের গাছ ছিল। এসব গাছের কাঠ ঘর ও আসবাব তৈরিতে ব্যবহার করা হতো। এখন এসব গাছ খুঁজে পাওয়া যায় না। কোথাও নারকেল, কদবেল, তাল ও কাঁঠালের দু-একটি গাছ থাকলেও আগের মতো ফল ধরে না। লবণাক্ততা ও কীটনাশকের প্রভাবে স্থানীয় জাতগুলো হারিয়ে যাচ্ছে।
ফলের গাছ কমে যাওয়ায় পাখির বাসা বাঁধার জায়গাও কমেছে। শামুক, ব্যাঙ, সাপ, জোনাকি ও বিভিন্ন প্রজাতির পাখি এখন এলাকায় প্রায় নেই। অনেক প্রজাতি পুরোপুরি হারিয়ে গেছে।
কর্পোরেট কোম্পানির ওপর নির্ভরতা
উপকূলের কৃষকরা এখন বীজ, সার ও কীটনাশকের জন্য কর্পোরেট কোম্পানির ওপর নির্ভরশীল। লবণাক্ততার কারণে স্থানীয় জাতের সব বীজ চাষ করা যাচ্ছে না। ফলে কৃষকদের কোম্পানির বীজ কিনতে হচ্ছে। এসব বীজ চাষ করতে হলে রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহার করতে হয়। না করলে ফলন হয় না।
প্রতিবছর কৃষকদের নতুন করে বীজ কিনতে হয়। আগে কৃষকরা নিজের জমির ফসল থেকে বীজ সংরক্ষণ করতেন এবং একে অপরের সঙ্গে বীজ বিনিময় করতেন। এখন তাঁদের হাতে বীজের নিয়ন্ত্রণ নেই। তাঁদের যথেষ্ট প্রাকৃতিক সার, কীটনাশক বা মূলধনও নেই। টিকে থাকার তাগিদে তাঁরা পূর্বপুরুষের জ্ঞান ছেড়ে কোম্পানির ওপর নির্ভর করে কৃষিকাজ চালাতে বাধ্য হচ্ছেন।
স্বাস্থ্যঝুঁকি
ধারাবাহিকভাবে রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহারের ফলে উৎপাদিত সবজি ও ফসল স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে। উচ্চফলনশীল জাতের সবজি ও ধান এবং লবণাক্ততা মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়াচ্ছে। নারী ও শিশুরা বেশি আক্রান্ত হচ্ছে।
বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের প্রভাবে এখানকার নারীরা জরায়ু ক্যানসার, দৃষ্টিস্বল্পতা, প্রজনন স্বাস্থ্যের সমস্যা, হৃদরোগ ও নিয়মিত সর্দিজ্বরসহ নানা রোগে ভুগছেন।
নীতিগত ও কাঠামোগত সংকট
উপকূলের মানুষের টিকে থাকার লড়াই রাষ্ট্র ও রাজনীতিতে গুরুত্ব পাচ্ছে না বলে কৃষকরা মনে করেন। তাঁদের মতে, এ অঞ্চলের কৃষকরা কখনো রাজনৈতিক গুরুত্ব পাননি। দেশের অন্যান্য অঞ্চলের কৃষির সমস্যা ও উপকূলীয় কৃষির সমস্যা এক নয়। কিন্তু রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে এ অঞ্চলের কৃষকদের জন্য আলাদা কোনো সেল নেই।
দুর্যোগপ্রবণ এ অঞ্চলের কৃষির জন্য কৃষকরা আলাদা মন্ত্রণালয় বা অধিদপ্তর গঠনের দাবিতে দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করছেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো সরকার উপকূলীয় কৃষি ও কৃষকদের টিকে থাকার জন্য উল্লেখযোগ্য কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। এ কারণে তাঁরা বঞ্চিত থেকে গেছেন।
বারসিকের সহায়তায় বিষমুক্ত চাষ
এই সংকটের মধ্যেও কয়েকজন কৃষক সম্ভাবনার কথা জানিয়েছেন। সরেজমিনে তাঁদের খেতে বসে কথা হয় কৃষক টুম্পা রানী মণ্ডল, কল্পনা রানী মিস্ত্রি ও যোগেশ চন্দ্র মণ্ডলের সঙ্গে। তাঁরা জানান, স্থানীয়ভাবে কর্মরত বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান বারসিক বিষমুক্ত সবজি, ধান, ফল ও ফসল উৎপাদনে তাঁদের প্রযুক্তিগত সহায়তা দিচ্ছে।
বারসিক শ্যামনগরে দীর্ঘদিন ধরে কৃষি ও কৃষকদের টিকে থাকার জন্য কাজ করছে। প্রতিষ্ঠানটির সংগঠিত ‘শতবাড়ি’ দলের সদস্য টুম্পা রানী মণ্ডল মুন্সিগঞ্জ ইউনিয়নের কুলতলী গ্রামে ১০ কাঠা জমিতে কৃষি খামার করেছেন। বারসিকের সহায়তায় তিনি প্রাকৃতিক সার ও কীটনাশক ব্যবহার করছেন।
টুম্পা রানী বলেন, তাঁর বাবা-মা খেতে কাজ করতেন। তখন এত সার-কীটনাশক কিনে জমিতে দিতে হতো না। তাঁর বাবা, চাচা, দাদা ও পূর্বপুরুষরা বাড়ির আবর্জনা, তরকারির খোসা ও ছাই জমিয়ে বছরে একবার জমিতে দিতেন। তার ওপরই চাষ করতেন। এখন বীজ, সার ও কীটনাশক কোম্পানির কাছ থেকে কিনতে হয়। অনেক সময় কোম্পানির লোকজন বাড়িতে এসে নতুন জাতের বীজ এবং নতুন সার ও কীটনাশকের নমুনা দিয়ে যান।
তবে বারসিকের সহায়তায় তিনি এখন স্থানীয় বীজ সংগ্রহ ও সংরক্ষণ শুরু করেছেন। নিজের ও বর্গা নেওয়া জমিতে ধান ও অন্যান্য ফসলে প্রাকৃতিক সার, জৈব বালাইনাশক ও পোকা ধরার ফাঁদ ব্যবহার করছেন। টুম্পা রানী জানান, এতে তাঁর ফসলের একটি নিয়মিত ক্রেতা গ্রুপ তৈরি হয়েছে। ক্রেতারা প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে উৎপাদিত ফসল কেনার জন্য নিয়মিত যোগাযোগ করেন। তাঁর সবজি ও ধান দ্রুত বিক্রি হয়ে যায়।
মুন্সিগঞ্জ ইউনিয়নের জেলেখালী গ্রামের কৃষক যোগেশ চন্দ্র মণ্ডল বলেন, বর্তমান সময়ে কৃষিতে অনেক পরিবর্তন এসেছে। কর্পোরেট কোম্পানিগুলো নিয়মিত প্রান্তিক কৃষকদের সঙ্গে যোগাযোগ করছে। তারা বিভিন্ন বাজার ও পাড়ায় গিয়ে নতুন বীজ, সার ও কীটনাশক দিচ্ছে। প্রতিবছর নতুন জাতের হাইব্রিড সবজি ও ধানের বীজ প্রথমবার কখনো বিনামূল্যে, কখনো নামমাত্র মূল্যে দিয়ে যাচ্ছে।
তাঁর ভাষ্য, কৃষকরা এসব জাত চাষ করার পর পরের বছর বেশি লাভের আশায় ওই কোম্পানির ডিলারদের কাছ থেকেই বীজ, সার ও কীটনাশক নিতে বাধ্য হন। কারণ এসব জাতের উৎপাদন বেশি। দেশীয় ও স্থানীয় জাতের ধান ও সবজির ফলন কম।
যোগেশ চন্দ্র মণ্ডল বলেন, আগে তাঁদের বাপ-দাদারা স্থানীয় জাতের বীজ সংরক্ষণ করে পরের বছর ব্যবহার করতেন। ছাই, তরকারির খোসা, গাছের পচা পাতা ও গরুর শুকনো গোবরের মতো প্রাকৃতিক সার দিয়ে চাষ করতেন। কিন্তু দীর্ঘদিন লোনা পানির প্রভাবে এলাকায় গাছপালা কমে গেছে। কোথাও কোথাও গাছ প্রায় নেই।
তিনি আরও বলেন, তাঁর মতো আরও অনেক কৃষক বারসিকের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। তাঁরা সীমিত পরিসরে স্থানীয় জাতের বীজ দিয়ে চাষ শুরু করেছেন। সেখানে প্রাকৃতিক সার ও বালাইনাশক ব্যবহার করছেন।
ঈশ্বরীপুর ইউনিয়নের ধুমঘাট গ্রামের কৃষক কল্পনা রানী মিস্ত্রি বলেন, তিনি কয়েক বছর ধরে বারসিকের সঙ্গে যুক্ত। বারসিকের সহায়তায় তিনি এলাকার নারী কৃষকদের নিয়ে কয়েকটি কৃষক দল গড়েছেন। এই দলের সদস্যরা প্রায় এক দশক ধরে স্থানীয় জাতের ধান, সবজি, ফল ও ফুলসহ বিভিন্ন বীজ সংরক্ষণ ও বিনিময় করছেন। বর্তমানে কল্পনা রানীর সংগ্রহে চার শতাধিক জাতের স্থানীয় বীজ রয়েছে। তিনি এলাকার কৃষকদের মধ্যে বীজ বিতরণ ও বিনিময় করেন। তাঁর বীজের সংগ্রহ বাড়ছে।
কৃষি বিভাগের বক্তব্য
সাতক্ষীরা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (খামারবাড়ি) ভারপ্রাপ্ত উপপরিচালক কৃষিবিদ ইকবাল আহমেদ বলেন, শ্যামনগরের লবণাক্ত জমিতে ফসল, সবজি ও ধান চাষে কৃষি বিভাগ বিভিন্ন কর্মসূচি নিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে:
লবণসহিষ্ণু জাতের সম্প্রসারণ
জৈব সার ও পলিমালচের ব্যবহার বৃদ্ধি
বস্তায় আদা ও সবজি চাষ সম্প্রসারণ
মিনি পুকুর খনন
ড্রিপ সেচ
ঘেরের আইলে অমৌসুমি তরমুজ ও সবজি চাষ
বিনা চাষে সরিষা, খেসারি ও ভুট্টা চাষ
সাথি ফসল হিসেবে সবজি চাষ (আখের সঙ্গে মসুর ও ছোলা, স্বল্পজীবনকালীন সবজি)
সবুজ সার হিসেবে ধইঞ্চা চাষ বৃদ্ধি
টাওয়ার পদ্ধতিতে সবজি চাষ
সরজান পদ্ধতির ব্যবহার
বেড-নালা পদ্ধতিতে শাক ও সবজি চাষ
লবণসহিষ্ণু ফল ও ফসল (সূর্যমুখী, কদবেল, সফেদা, তেঁতুল, নারকেল, আমলকি) চাষ
মতামত দিন