দুধে মাইক্রোপ্লাস্টিক: ফুটিয়ে কি দূর করা যায়
দেশের বাজারে পাওয়া দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্যের ৪১টি নমুনার প্রতিটিতেই মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়ার খবরটি প্রকাশের পর সবচেয়ে বেশি যে প্রশ্নটি উঠেছে, তা হলো—এখন করার কী আছে? দুধ ভালো করে ফুটিয়ে নিলে কি এই কণা দূর হয়? ছেঁকে নিলে? প্যাকেটজাত দুধ ছেড়ে কাঁচা দুধে ফিরে যাওয়া কি নিরাপদ?
উত্তরগুলো স্বস্তিদায়ক নয়, তবে জেনে রাখা জরুরি। কারণ এ ধরনের খবরের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যেসব ঘরোয়া সমাধান ছড়ায়, তার অনেকগুলোরই কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি থাকে না।
সবচেয়ে বেশি যে ধারণাটি ছড়াচ্ছে, সেটি ফুটানো নিয়ে। ২০২৪ সালে চীনের গবেষকদের একটি গবেষণা বিশ্বজুড়ে আলোচিত হয়েছিল, যেখানে দেখানো হয় ট্যাপের পানি পাঁচ মিনিট ফুটিয়ে ছেঁকে নিলে ৯০ শতাংশ পর্যন্ত মাইক্রো ও ন্যানোপ্লাস্টিক দূর করা সম্ভব। কিন্তু ওই গবেষণাটি ছিল পানি নিয়ে, দুধ নিয়ে নয়—আর এই পার্থক্যটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
পদ্ধতিটি কাজ করে খনিজসমৃদ্ধ বা ‘হার্ড ওয়াটার’-এ। ফুটানোর সময় পানিতে থাকা ক্যালসিয়াম কার্বনেট জমে প্লাস্টিক কণাগুলোকে ঘিরে ফেলে চুনের মতো দানা তৈরি করে; সেই দানা এতটাই বড় হয় যে সাধারণ কাগজের ছাঁকনি দিয়েই আলাদা করা যায়। খনিজ কম থাকা ‘সফট ওয়াটার’-এ একই পদ্ধতিতে মাত্র ২৫ শতাংশ কণা সরানো গেছে।
দুধে এই কৌশল খাটে না। প্রথমত, দুধ ছেঁকে ফেলে দেওয়ার মতো কিছু নয়—ছাঁকনিতে যা আটকাবে, তার সঙ্গে দুধের প্রয়োজনীয় উপাদানও চলে যাবে। দ্বিতীয়ত, হোমোজেনাইজড দুধে চর্বি ও প্রোটিনের কণাগুলোর আকার শূন্য দশমিক ২ থেকে ২ মাইক্রোমিটার, আর যবিপ্রবির গবেষণায় পাওয়া মাইক্রোপ্লাস্টিকের অধিকাংশই ২৫০ মাইক্রোমিটারের চেয়ে ছোট এবং আঁশ আকৃতির। এত সূক্ষ্ম ও আঁশজাতীয় কণা ঘরোয়া কোনো ছাঁকনিতে ধরা পড়ে না। দুধ ফুটালে ব্যাকটেরিয়া মরে, কিন্তু প্লাস্টিক গলে না বা উবে যায় না—কণাগুলো দুধেই ভেসে থাকে।
তাহলে কাঁচা দুধে ফিরে যাওয়াই কি সমাধান? এখানেও উত্তরটি সরল নয়। গবেষণায় কণার সংখ্যা কাঁচা দুধের চেয়ে ব্র্যান্ডের দুধে বেশি পাওয়া গেছে—প্রতি ১০০ মিলিলিটারে যথাক্রমে ৯৩ ও ১৫৬টির কাছাকাছি। এতে মনে হতে পারে কাঁচা দুধ নিরাপদ। কিন্তু ঝুঁকি মূল্যায়নের সূচকে চিত্র উল্টো: কাঁচা দুধে পাওয়া পলিমারগুলোর রাসায়নিক বৈশিষ্ট্যের কারণে সেটিকেই রাখা হয়েছে উচ্চ ঝুঁকির শ্রেণিতে, ব্র্যান্ডের দুধ রয়েছে তার পরে। অর্থাৎ কেবল কণা গুনে সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না—কোন ধরনের প্লাস্টিক, সেটাও বিবেচ্য। এর সঙ্গে যোগ করুন কাঁচা দুধের নিজস্ব ঝুঁকি: ঠিকমতো তাপ না দিলে জীবাণু সংক্রমণের আশঙ্কা।
যেখানে সত্যিই কিছু করার আছে, সেটি হলো দুধ ঘরে আসার পরের ধাপগুলো। গবেষকদের ধারণা, সংগ্রহ, পরিবহন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, প্যাকেটজাতকরণ ও কারখানার যন্ত্রপাতি-পাইপলাইনের সংস্পর্শে এসেই কণাগুলো দুধে মেশে। একই যুক্তিতে, নিজের রান্নাঘরে দুধের সঙ্গে প্লাস্টিকের সংস্পর্শ কমানো যুক্তিসংগত সতর্কতা। প্লাস্টিকের পাত্রে দুধ গরম করা বা মাইক্রোওয়েভে বসানো এড়ানো, গরম দুধ প্লাস্টিকের বোতল বা মগে না ঢালা, সংরক্ষণের জন্য কাচ বা স্টেইনলেস স্টিলের পাত্র ব্যবহার করা—এগুলো নতুন কণা যোগ হওয়া কমায়। তাপ ও প্লাস্টিকের সংযোগেই কণা ও রাসায়নিক নিঃসরণ বাড়ে, এটি প্রতিষ্ঠিত। তবে স্পষ্ট থাকা দরকার: এতে আগে থেকে দুধে থাকা কণা দূর হয় না, কেবল নতুন সংযোজন কমে।
শিশুদের ক্ষেত্রে সতর্কতা বেশি প্রয়োজন। গবেষণায় বলা হয়েছে, ৪ থেকে ১০ বছর বয়সীরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে—তাদের শরীরের ওজন কম, আর দুধের ওপর নির্ভরতা বেশি। ফলে একই পরিমাণ দুধ খেলেও শরীরের অনুপাতে তাদের ভেতরে কণা প্রবেশের হার বড়দের চেয়ে বেশি। শিশুদের ফিডার, সিপার বা টিফিন বোতলে গরম দুধ ঢালার অভ্যাসটি এ কারণেই পুনর্বিবেচনার দাবি রাখে।
স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব নিয়ে এখন কী জানা আছে, সে বিষয়েও সংযত থাকা দরকার। মানুষের রক্ত, বিভিন্ন অঙ্গ এমনকি মাতৃদুগ্ধেও মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে। পরীক্ষাগারে গবেষণায় প্রদাহ, অক্সিডেটিভ স্ট্রেস ও কোষের ক্ষতির লক্ষণ দেখা গেছে, আর প্লাস্টিকের সঙ্গে থাকা কিছু রাসায়নিক—যেমন বিসফেনল-এ বা ফ্যাথালেট—হরমোনে প্রভাব ফেলে বলে অনেক আগে থেকেই প্রমাণ আছে। তবে এখনো কোনো নির্দিষ্ট রোগকে সরাসরি মাইক্রোপ্লাস্টিকের কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা যায়নি, এবং কতটুকু গ্রহণ করলে বিপদ—এমন কোনো আন্তর্জাতিক নিরাপদ সীমাও নির্ধারিত নেই। অর্থাৎ বিষয়টি উদ্বেগের, কিন্তু আতঙ্কিত হওয়ার মতো নিশ্চিত তথ্য এখনো নেই।
সবচেয়ে সৎ কথাটি হলো, এই সমস্যার সমাধান ভোক্তার রান্নাঘরে নেই। গবেষকদের সুপারিশগুলোও তাই ব্যক্তির দিকে নয়, ব্যবস্থার দিকে তাকিয়ে—দুগ্ধ সরবরাহ ব্যবস্থায় প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানো, উন্নত ফিল্টার প্রযুক্তি ব্যবহার এবং নিয়মিত মান পরীক্ষা চালু করা। একজন ক্রেতা কাচের বোতল বেছে নিতে পারেন, কিন্তু দুধ যে পাইপলাইন ও প্যাকেজিং পেরিয়ে তাঁর কাছে পৌঁছায়, তার নিয়ন্ত্রণ তাঁর হাতে নেই।
তাই দুধ খাওয়া বন্ধ করে দেওয়ার কারণ এই গবেষণা নয়—দুধ এখনো প্রোটিন, ক্যালসিয়াম ও অন্যান্য পুষ্টির গুরুত্বপূর্ণ উৎস। বরং কারণটি হলো প্রশ্ন করার: আমাদের খাদ্য যে পথ ধরে আমাদের কাছে আসে, সেই পথে প্লাস্টিক কতটা জড়িয়ে গেছে, আর তা কমানোর দায় কার।
মতামত দিন