ব্রিকস সম্মেলনে মধ্যপ্রাচ্য সংঘাত বন্ধ ও বাণিজ্য প্রবাহ স্বাভাবিক রাখার আহ্বান
ভারতের নয়াদিল্লিতে শুরু হওয়া ১৮তম ব্রিকস সম্মেলনের শেষ পর্যায়ে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত বন্ধে সব পক্ষকে সংযত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন জোটের নেতারা। একই সঙ্গে বৈশ্বিক বাণিজ্য প্রবাহ স্বাভাবিক রাখার ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন তারা।
ব্রিকস সম্মেলনে চীন ও ভারতের সম্পর্কের বরফ গলবে কি না, কিংবা রাশিয়া নতুন কোনো কৌশল নিয়ে এগোচ্ছে কি না—এ নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নানা আলোচনা চলছে। সাত দেশের রাষ্ট্রপ্রধান ও প্রতিনিধিদের সঙ্গে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির রুদ্ধদ্বার বৈঠকে কী আলোচনা হয়েছে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে সম্মেলন ঘিরে বিশ্বের নজর এখন নয়াদিল্লিতে।
সম্মেলনের দ্বিতীয় ও সমাপনী দিন রোববার স্থানীয় সময় সকাল থেকেই আয়োজক দেশ ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিসহ ব্রিকসের সদস্যরাষ্ট্রগুলোর সরকারপ্রধান এবং আমন্ত্রিত রাষ্ট্রীয় অতিথিরা মূল ভেন্যুতে আসতে শুরু করেন। অভ্যর্থনা পর্ব শেষে নেতারা ঐতিহ্যবাহী গ্রুপ ছবিতে অংশ নেন। এরপর শুরু হয় সম্মেলনের মূল আকর্ষণ ওপেন প্লেনারি অধিবেশন।
এই অধিবেশনে বৈশ্বিক বাণিজ্য কাঠামো, কার্বন নিঃসরণ কমিয়ে টেকসই উৎপাদন ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং প্রযুক্তিগত সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হয়। এর আগে অনুষ্ঠিত সম্মিলিত বৈঠকে শুধু পূর্ণাঙ্গ সদস্যরাষ্ট্রের সরকারপ্রধানরা অংশ নিলেও ওপেন সেশনে ব্রিকসের সহযোগী দেশ, আমন্ত্রিত অতিথি এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিরাও অংশ নেন।
স্বাগত বক্তব্যে নতুন বিশ্বব্যবস্থার রূপরেখা নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেন নরেন্দ্র মোদি। ইরান যুদ্ধের কারণে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি অস্থিরতা এবং পশ্চিম এশিয়ার রাজনৈতিক ভারসাম্য রক্ষায় ব্রিকসের সদস্যদের ওপর আস্থা রাখার কথা জানান তিনি।
সম্মেলনে শুল্কযুদ্ধ, সন্ত্রাসবাদ, মধ্যপ্রাচ্য সংকট এবং পশ্চিম এশিয়ার রাজনৈতিক সমীকরণ বিশ্বনেতাদের আলোচনায় গুরুত্ব পায়। যদিও সম্মেলনের মূল পর্ব রাখা হয় সমাপনী দিনে, প্রথম দিনেই বিভিন্ন দেশের নেতাদের সঙ্গে একাধিক দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেন মোদি।
চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান, মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম, আবুধাবির জায়েদ আল নাহিয়ান, ভিয়েতনামের লে মিন হুং এবং জাতিসংঘের বিদায়ী মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের সঙ্গে বৈঠক করেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী। ফলে সম্মেলনের মূল অধিবেশনের চেয়েও এসব পার্শ্ববৈঠককে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
শনিবারের বৈঠকগুলো থেকে পাওয়া বার্তাগুলোর মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার বিষয়টি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। এ বিষয়ে চীন, রাশিয়া, ইরান ও ভারতসহ ব্রিকসের ১১ সদস্যরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে একটি যৌথ বিবৃতিও দেওয়া হয়েছে।
সাম্প্রতিক সংঘাতের কারণে ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে তৈরি হওয়া উত্তেজনা কমাতে ভারত মধ্যস্থতার ভূমিকা নিতে চাইছে। সম্মেলন থেকে এ বিষয়ে কোনো নির্দিষ্ট বার্তা না এলেও মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম এ নিয়ে কথা বলেছেন। এনডিটিভিকে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, ইরানের সঙ্গে সংঘাতের উৎস স্বীকার করতে অনেক দেশের মধ্যে এক ধরনের অনীহা রয়েছে।
এদিকে ভারত ও চীনের মধ্যেও সম্পর্ক উন্নয়ন এবং সীমান্তে শান্তি প্রতিষ্ঠার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানা গেছে।
অন্যদিকে, সম্মেলন শেষে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে কিছুটা হতাশ করেছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। দীর্ঘ ভ্রমণ ও একের পর এক কর্মসূচিতে ক্লান্ত হয়ে পড়ায় মোদির দেওয়া নৈশভোজে অংশ নেননি তিনি। পরে আগামী সম্মেলন আয়োজনের দায়িত্ব নিয়েই নয়াদিল্লি ত্যাগ করেন চীনা প্রেসিডেন্ট।
বিশ্ব রাজনীতি ও অর্থনীতিতে পশ্চিমা আধিপত্যের বাইরে একটি শক্তিশালী বিকল্প বৈশ্বিক মঞ্চ গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে ব্রিকস। তবে প্রতিষ্ঠার প্রায় ১৭ বছর পরও জোটটি নানা বৈশ্বিক সংকটের মুখে পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধের কারণে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকট তীব্র হয়েছে। অন্যদিকে, ইউরোপেও রাশিয়ার সংশ্লিষ্টতায় সংঘাত অব্যাহত রয়েছে।
এ অবস্থায় বৈশ্বিক এসব সংকট সমাধানে ব্রিকস এবং এর শীর্ষ সম্মেলন কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
মতামত দিন