Views Bangladesh Logo

সত্যিই কি পশ্চিমা আধিপত্যের বিশ্বব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করছে ব্রিকস?

ব্রিকসের একটি সদস্য দেশ কয়েক মাস ধরে হামলার শিকার হয়েছে। পরে সেই দেশই ব্রিকসের আরেক সদস্যের বিরুদ্ধে পাল্টা হামলা চালিয়েছে। আগামী সপ্তাহান্তে সেই দেশগুলোই একই কক্ষে বসবে। চলতি বছর বৈশ্বিক রাজনীতিতে সবচেয়ে বেশি আলোচিত এবং অর্থনীতিকে সবচেয়ে বেশি চাপে ফেলা একটি যুদ্ধ নিয়ে ঐকমত্যে পৌঁছানোর ব্যাপারে এটি হবে তাদের তৃতীয় চেষ্টা।

শনিবার থেকে নয়াদিল্লিতে শুরু হচ্ছে ব্রিকস নেতাদের সম্মেলন। আয়োজক ভারত এমন এক সময়ে সংগঠনটির গুরুত্ব বাড়ানোর চেষ্টা করছে, যখন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে ইরানের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধ ব্রিকসের অভ্যন্তরীণ বিভাজনও স্পষ্ট করে তুলেছে। এই সংঘাতে তেহরান ও আবুধাবি কার্যত বিপরীত অবস্থানে রয়েছে। রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন শুক্রবার সকালে নয়াদিল্লিতে পৌঁছেছেন।

১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বরের এই সম্মেলন অনুষ্ঠিত হচ্ছে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা শুরুর ছয় মাসেরও বেশি সময় পর। ইরান ২০২৪ সালে ব্রিকসের সদস্য হয়। একই বছর সংগঠনটিতে যোগ দেয় সংযুক্ত আরব আমিরাতও।

ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকা নিয়ে গড়ে ওঠা ব্রিকস পরে ইরান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, মিসর, ইথিওপিয়া ও ইন্দোনেশিয়াকে অন্তর্ভুক্ত করেছে। উদীয়মান অর্থনীতির এই জোটের মূল লক্ষ্য ছিল পশ্চিমা নেতৃত্বাধীন বৈশ্বিক ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করা।

তবে ব্রিকস প্রতিষ্ঠার প্রায় দুই দশক পূর্ণ হওয়ার পথে বিশ্লেষকদের মূল্যায়ন হলো, বিশ্বকে আরও বহুমেরুকেন্দ্রিক করে তুলতে সংগঠনটি ভূমিকা রাখলেও পশ্চিমা ব্যবস্থার কার্যকর ও সুসংহত কোনো বিকল্প এখনো তৈরি করতে পারেনি।

ব্রিকস পশ্চিমা নেতৃত্বাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর বাইরে একটি নতুন প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেছে। এর মাধ্যমে বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলো কিছুটা বেশি দর-কষাকষির ক্ষমতা পেয়েছে এবং অর্থনৈতিক বিকল্পও তৈরি হয়েছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে মার্কিন ডলারের আধিপত্য এখনো অটুট। একই সঙ্গে পররাষ্ট্রনীতি ও নিরাপত্তার প্রশ্নে সদস্য দেশগুলোর বিভাজন তাদের সম্মিলিত পদক্ষেপ নেওয়ার সক্ষমতাকে সীমিত করছে।

তবে কিছু বিশ্লেষকের যুক্তি, ব্রিকসের সাফল্যকে পশ্চিমা নেতৃত্বাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর বিকল্প হয়ে ওঠার সক্ষমতা দিয়ে বিচার করা ঠিক হবে না। বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত—পশ্চিমা আধিপত্যকে আগের তুলনায় কঠিন করে তুলতে ব্রিকস কতটা সক্ষম হয়েছে।

সাও পাওলো বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্রিকস স্টাডিজ গ্রুপের ব্রাজিলীয় গবেষক অক্টাভিও অলিভেইরা ও এনজো গোদিনহোর মতে, ব্রিকসের প্রতিটি উদ্যোগকে কেবল এ কারণে খাটো করে দেখা হয় যে সেটি প্রত্যাশিত বিপ্লব ঘটাতে পারেনি। জাতিসংঘের মতো নির্দিষ্ট ভূরাজনৈতিক সংকট মোকাবিলায় ব্রিকসের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা হয়তো নেই, কিন্তু বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোর নিজেদের কথা বলার এবং পশ্চিমকে পাশ কাটিয়ে সহযোগিতা করার একটি প্ল্যাটফর্ম হিসেবে এর অস্তিত্বই গুরুত্বপূর্ণ।

তাদের মতে, ব্রিকস পশ্চিমা নেতৃত্বাধীন ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করার জন্য তৈরি হলেও সেটিকে পুরোপুরি প্রতিস্থাপন করার উদ্দেশ্যে গড়ে ওঠেনি।

২০০৮ সালের বৈশ্বিক আর্থিক সংকট এবং বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার দোহা রাউন্ডের ব্যর্থতার পর ব্রিকসের উত্থান ঘটে। দোহা রাউন্ডের লক্ষ্য ছিল এমন একটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা, যা বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোর স্বার্থকে আরও বেশি প্রতিফলিত করবে।

অলিভেইরা ও গোদিনহোর ভাষায়, যে দেশগুলো নিজেদের ভবিষ্যৎ উন্নত বিশ্বের অংশ হিসেবে দেখতে চেয়েছিল, তারা বুঝতে পেরেছিল যে সম্মিলিতভাবে সংগঠিত হলেই আন্তর্জাতিক পরিসরে তাদের কণ্ঠস্বর বেশি জোরালো হবে।

প্রচলিত আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ও জাতিসংঘের বাইরে একটি অভিন্ন উন্নয়ন এজেন্ডা নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার সেই প্রচেষ্টার মধ্য দিয়েই ব্রিকসের জন্ম। সেই অর্থে এর জন্মলগ্ন থেকেই সংগঠনটি পশ্চিমা নেতৃত্বাধীন বিশ্বব্যবস্থার এক ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছিল।

উদীয়মান শক্তিগুলো এমন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে নিজেদের প্রভাব বাড়াতে চেয়েছিল, যেগুলোকে তারা পশ্চিমা আধিপত্যাধীন বলে মনে করত। আজও এটি ব্রিকসের সদস্যদের মধ্যে অন্যতম প্রধান ঐক্যের জায়গা বলে মনে করেন কানাডার কার্লেটন বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের সহযোগী অধ্যাপক শন বার্গেস।

তার মতে, ব্রিকসের দেশগুলোকে মূলত দুটি বিষয় একত্রে রাখে—আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মাধ্যমে অর্থনৈতিক লাভ বাড়ানোর আকাঙ্ক্ষা এবং অধিকার ও গণতন্ত্রের মতো বিষয়ে পশ্চিমা দেশগুলোর নৈতিক উপদেশ দেওয়ার প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসার ইচ্ছা।

অর্থাৎ ব্রিকসের লক্ষ্য পশ্চিমা নেতৃত্বাধীন উদার আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে উচ্ছেদ করা নয়; বরং সংস্কার, অধিক স্বায়ত্তশাসন এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে নিজেদের প্রভাব বাড়ানো।

প্রশ্ন হলো, ব্রিকসের দেশগুলো কেন জি-৭-এর সদস্যদের মতো বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থার পুরো দায়িত্ব নিজেদের কাঁধে নিতে চাইবে? বরং তারা এমন বিকল্প পথ তৈরি করতে চায়, যার মাধ্যমে নিজেদের স্বার্থ—বিশেষ করে জাতীয় উন্নয়ন ও দারিদ্র্য হ্রাস—অগ্রাধিকার দিয়ে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ পরিচালনা করা যায়।

চীনের শর্তহীন উন্নয়ন সহায়তা এবং ব্রাজিলের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর মধ্যে সরাসরি মুদ্রা বিনিময় বা কারেন্সি সোয়াপ নিয়ে আলোচনা এর দুটি উদাহরণ। এর ফলে শুধু ব্রিকসের সদস্যদের মধ্যেই নয়, বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোর মধ্যেও অর্থনৈতিক লেনদেন বেড়েছে।

অন্যদিকে উন্নয়ন সহায়তার সঙ্গে মানবাধিকার ও গণতন্ত্রের মতো শর্ত যুক্ত করার প্রবণতাও ধীরে ধীরে কমছে। এটি বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের মতো প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমেও পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

তবে ব্রিকস যখন গঠিত হয়েছিল, তখনকার ‘পশ্চিম’ এবং বর্তমান পশ্চিম এক নয়। ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক গাই বার্টনের মতে, ২০০০-এর দশকের শুরুতে যে ট্রান্সআটলান্টিক পশ্চিমের ধারণা ছিল, সেটিও এখন ভেঙে পড়ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সম্পর্কেই যখন টানাপোড়েন বাড়ছে, তখন ব্রিকস আসলে কাকে চ্যালেঞ্জ করছে—আমেরিকাকে, নাকি ইউরোপকে—সেই প্রশ্নও সামনে আসছে।

অর্থনৈতিক শক্তির দিক থেকে ব্রিকস নিঃসন্দেহে বিশাল। কিন্তু সেই শক্তিকে সম্মিলিতভাবে ব্যবহার করার সক্ষমতা এখনো তুলনামূলকভাবে দুর্বল।

ভূকৌশল বিশ্লেষক ও ফরেন পলিসি ইন ফোকাসের জ্যেষ্ঠ ফেলো ইমরান খালিদের হিসাবে, ব্রিকস এখন বিশ্বের প্রায় অর্ধেক জনসংখ্যার প্রতিনিধিত্ব করে। ক্রয়ক্ষমতার ভিত্তিতে বৈশ্বিক উৎপাদনের প্রায় ৪০ শতাংশ, বিশ্বের মোট তেল উৎপাদনের ৪৪ শতাংশ এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যের প্রায় এক-চতুর্থাংশ এই জোটের আওতায়।

আইএমএফের হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছর ১১ সদস্যের ব্রিকসের প্রবৃদ্ধি প্রায় ৩ দশমিক ৭ শতাংশ হতে পারে, যেখানে জি-৭-এর প্রবৃদ্ধি প্রায় ১ শতাংশ।

তবু এই বিপুল অর্থনৈতিক ও জনসংখ্যাগত শক্তির তুলনায় ব্রিকসের বাস্তব প্রভাব বা দর-কষাকষির ক্ষমতা এখনো সীমিত।

এর একটি বড় উদাহরণ নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক বা এনডিবি। ২০২৪ সালের শেষ নাগাদ ব্যাংকটি মোট প্রায় ৩৯ বিলিয়ন ডলারের প্রকল্প অনুমোদন করেছে। বৈশ্বিক উন্নয়ন অর্থায়নের বিচারে এটি বিশ্বব্যাংকের কয়েক মাসের প্রতিশ্রুত অর্থের সমান। তাছাড়া এনডিবিও এখনো তার অধিকাংশ অর্থ ডলারে সংগ্রহ করে।

ব্রাজিলের গবেষকদের মতে, পশ্চিমা অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করার মতো বড় কোনো নতুনত্ব এনডিবি এখনো দেখাতে পারেনি। এর অনেক কাঠামোই বিদ্যমান বহুপাক্ষিক উন্নয়ন ব্যাংকগুলোর আদলে তৈরি।

বৈশ্বিক জিডিপিতে ব্রিকসের অবদানও এখনো জি-৭-এর তুলনায় পিছিয়ে। সংগঠনটির অর্থনৈতিক সম্প্রসারণ মূলত চীন ও ভারতের প্রবৃদ্ধির ওপর নির্ভরশীল।

পশ্চিমা অর্থনৈতিক শক্তিকে চ্যালেঞ্জ করার ক্ষেত্রে ব্রিকসের সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা সম্ভবত মার্কিন ডলারের ওপর এর অব্যাহত কাঠামোগত নির্ভরতা।

ডি-ডলারাইজেশন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে অনেক কথা হলেও ব্রিকসের অধিকাংশ বাণিজ্য এখনো মার্কিন ডলারেই সম্পন্ন হয়। অধিকাংশ সদস্য দেশও বিপুল পরিমাণ ডলার রিজার্ভ ধরে রেখেছে। বিশ্বের প্রধান রিজার্ভ মুদ্রা হিসেবে ডলারের অবস্থান এখনো অক্ষুণ্ন থাকায় ব্রিকসের নীতিগত স্বাধীনতাও কাঠামোগতভাবে সীমাবদ্ধ।

চীন আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ইউয়ানের ব্যবহার বাড়ানোর চেষ্টা করছে। সৌদি আরবও অন্য মুদ্রায় বাণিজ্যের সম্ভাবনা নিয়ে কথা বলেছে। কিন্তু আগামী এক দশকে ডলারের সামনে কোনো গুরুতর বিকল্প তৈরি হবে—এমন সম্ভাবনা এখনো কম।

ব্রিকস সামগ্রিকভাবে ডলার থেকে সরে যাচ্ছে না; বরং সদস্য দেশগুলো একেকটি দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের মাধ্যমে ধীরে ধীরে নিজেদের ডলারের ওপর নির্ভরতা কমাচ্ছে। এই প্রক্রিয়া ধীর, কিন্তু একবার এগোলে তা আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়াও কঠিন হতে পারে।

তবে এর অর্থ এই নয় যে ব্রিকসের অর্থনৈতিক অর্জনকে অবহেলা করা যায়। এনডিবি এমন একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান, যার সদস্য ও কাঠামোর মধ্যে কোনো পশ্চিমা দেশ নেই—যদিও এটি এখনো উদার আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ভেতরেই কাজ করছে।

২০২৪ সালে ব্রিকসের সম্প্রসারণও সংগঠনটির সম্মিলিত দর-কষাকষির ক্ষমতা বাড়িয়েছে। সৌদি আরব, ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো বড় তেল উৎপাদক দেশ যুক্ত হওয়ায় বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে ব্রিকসের প্রভাব আরও বেড়েছে।

চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের মাধ্যমে অন্যান্য ব্রিকস দেশে বিনিয়োগ এবং দ্বিপক্ষীয় অন্যান্য আর্থিক প্রবাহও উদীয়মান অর্থনীতির জন্য বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের মতো ব্রেটন উডস প্রতিষ্ঠানের বাইরে অর্থায়ন ও উন্নয়নের বাস্তব বিকল্প তৈরি করছে।

তবে ব্রিকসের সবচেয়ে বড় শক্তি—বিশ্বের বিশাল একটি জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব—একই সঙ্গে এর সবচেয়ে বড় দুর্বলতাও হতে পারে। কারণ সদস্য দেশগুলোর মধ্যে বিভাজন এখনো প্রবল।

এর সাম্প্রতিক উদাহরণ মে মাসে ভারতে অনুষ্ঠিত ব্রিকস পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠক। ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ নিয়ে সদস্য দেশগুলো কোনো ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারেনি।

ইমরান খালিদের মতে, মে মাসের বৈঠক কোনো যৌথ বিবৃতি ছাড়াই শেষ হয়েছিল, কারণ ইরান চেয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডকে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হোক, কিন্তু সংযুক্ত আরব আমিরাত তাতে সম্মত হয়নি।

তবে বর্তমান যুদ্ধের সময়ে যুদ্ধবিরতির উদ্যোগগুলোর বড় অংশই এসেছে বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোর কাছ থেকে। ওয়াশিংটন থেকে এ ধরনের কোনো উদ্যোগ আসেনি।

গাই বার্টনের মতে, ব্রিকস সম্প্রসারণ সংগঠনটির অভ্যন্তরীণ বিভাজন কমানোর পরিবর্তে আরও জটিল করেছে। এতে বৈশ্বিক দক্ষিণের প্রতিনিধিত্ব বেড়েছে ঠিকই, কিন্তু সংগঠনটির আগের যে সামান্য হলেও অভিন্ন অবস্থান ছিল, সম্প্রসারণের ফলে সেটিও দুর্বল হয়েছে।

ইরানের ক্ষেত্রেও বিষয়টি স্পষ্ট। ব্রিকসের সদস্য হওয়ায় তেহরান একটি আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্ম পেয়েছে। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে ব্রিকসের অন্য সদস্যরা ইরানের সঙ্গে নিজেদের নীতি এক করে ফেলেছে।

ব্রিকসে ‘একজনের জন্য সবাই, সবার জন্য একজন’—এমন কোনো নীতি নেই। বরং সদস্য দেশগুলো ইচ্ছাকৃতভাবেই নিজেদের স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ ধরে রেখেছে। এ দিক থেকে ব্রিকস কোনো সমন্বিত সামরিক বা ভূরাজনৈতিক জোটের সম্পূর্ণ বিপরীত।

শন বার্গেসও একই বাস্তবতার কথা বলছেন। তার মতে, আন্তর্জাতিক বিষয়ে নিজেদের কণ্ঠস্বর আরও জোরালো করার আকাঙ্ক্ষা সব সদস্যের মধ্যে থাকলেও তারা সেই কণ্ঠস্বর কী বার্তা বহন করবে, সে বিষয়ে মোটেও একমত নয়।

ব্রাজিলের গবেষক অলিভেইরা ও গোদিনহোর মতে, শুরুতে ব্রিকসের সদস্যসংখ্যা কম হওয়া বৈশ্বিক দক্ষিণের বৈচিত্র্যের তুলনায় একটি সীমাবদ্ধতা ছিল। এখন আবার অতিরিক্ত সম্প্রসারণ সংগঠনটির সম্মিলিত অর্জনকে দুর্বল করে দিতে পারে।

তবে তারা ব্রিকসের নতুন সদস্য এবং সংগঠনে যোগ দেওয়ার জন্য অপেক্ষমাণ দেশগুলোর সংখ্যা বৃদ্ধিকে ইতিবাচক সংকেত হিসেবেই দেখছেন। কারণ এত ভিন্ন স্বার্থের দেশ একই টেবিলে বসতে পারছে—এটিই একটি পরিবর্তনশীল বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থার প্রমাণ।

সব মিলিয়ে ব্রিকসকে পশ্চিমা নেতৃত্বাধীন বিশ্বব্যবস্থার সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখার চেয়ে স্বায়ত্তশাসনের একটি প্ল্যাটফর্ম হিসেবে দেখা বেশি বাস্তবসম্মত। কোনো অভিন্ন মুদ্রা নেই, অভিন্ন শুল্কনীতি নেই, প্রতিরক্ষা সহযোগিতার বাধ্যবাধকতাও নেই। ফলে প্রচলিত অর্থে ব্রিকস কোনো ভূরাজনৈতিক জোট নয়।

তবে সংগঠনটি পশ্চিমা প্রতিষ্ঠানগুলোর বাইরে বিকল্প উন্নয়ন অর্থায়নের ব্যবস্থা তৈরি করেছে এবং বাণিজ্যের নতুন পথ খুলেছে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোর সামনে ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মধ্যে নিজেদের স্বার্থ অনুযায়ী কৌশলগতভাবে চলার আরও বেশি সুযোগ তৈরি হয়েছে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ব্রিকস হয়তো পশ্চিমের আধিপত্যকে পুরোপুরি প্রতিস্থাপন করার চ্যালেঞ্জ তৈরি করেনি। কিন্তু পৃথক দেশগুলোর ওপর পশ্চিমা চাপ প্রয়োগের খরচ আগের তুলনায় বাড়িয়ে দিয়েছে।

এই অর্থেই ব্রিকসের প্রকৃত গুরুত্ব নিহিত থাকতে পারে—পশ্চিমা বিশ্বব্যবস্থাকে উৎখাত করার সক্ষমতায় নয়, বরং সেই ব্যবস্থার একক আধিপত্যকে ক্রমশ কঠিন করে তোলার ক্ষমতায়।

মতামত দিন

Avatar

ট্রেন্ডিং ভিউজ