ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬
মরক্কোর ধাক্কায় কেঁপে উঠল ব্রাজিল
বিশ্বকাপ মানেই ব্রাজিলকে ঘিরে বাড়তি প্রত্যাশা। পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের প্রতিটি আসর শুরু হয় শিরোপা জয়ের স্বপ্ন নিয়ে। কিন্তু ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এ সেই স্বপ্নযাত্রার প্রথম ধাপেই বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়েছে সেলেসাওদের। যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে মরক্কোর বিপক্ষে ১-১ গোলের ড্রয়ে শেষ হওয়া ম্যাচটি শুধু পয়েন্ট হারানোর গল্প নয়, বরং ব্রাজিলের খেলার নানা দুর্বলতা সামনে এনে দিয়েছে।
ম্যাচের শুরু থেকেই আফ্রিকার অন্যতম শক্তিশালী দল মরক্কো দেখিয়ে দেয় তারা কোনোভাবেই আন্ডারডগ নয়। বরং প্রথম ২০ মিনিটে মাঠের নিয়ন্ত্রণ ছিল তাদের হাতেই। দ্রুতগতির আক্রমণ, মাঝমাঠে আধিপত্য এবং ব্রাজিলের রক্ষণে চাপ সৃষ্টি করে মরক্কো বারবার গোলের সুযোগ তৈরি করে। সেই চাপের ফলও পায় তারা। ম্যাচের ২১তম মিনিটে ব্রাহিম দিয়াজের বাড়ানো বল থেকে ইসমাইল সাইবারি দুর্দান্ত ফিনিশে মরক্কোকে এগিয়ে দেন।
ব্রাজিল অবশ্য দ্রুত ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে। ম্যাচের ৩২ মিনিটে দলের সবচেয়ে বড় তারকা ভিনিসিয়ুস জুনিয়র সমতা ফেরান। তবে গোলটি ব্রাজিলকে আত্মবিশ্বাস দিলেও তাদের খেলায় কাঙ্ক্ষিত ছন্দ ফেরাতে পারেনি। পুরো ম্যাচজুড়েই দেখা গেছে পাসিংয়ে ভুল, মাঝমাঠে সমন্বয়ের অভাব এবং রক্ষণভাগে অস্বস্তি।
ম্যাচ শেষে ব্রাজিল শিবিরের প্রতিক্রিয়াও ছিল আত্মসমালোচনায় ভরা। বদলি হিসেবে মাঠে নামা ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার দানিলো কোনো রাখঢাক না করেই বলেন, প্রথমার্ধে ব্রাজিলের পারফরম্যান্স ছিল ‘খুবই বাজে’। তার মতে, খেলোয়াড়দের অবস্থান, টেকনিক কিংবা কৌশল—কোনো কিছুই পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ করেনি। সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল মানসিক চাপ।
দানিলোর ভাষায়, খেলোয়াড়রা এতটাই উদ্বিগ্ন ছিল যে নিজেদের ভুলেই বারবার বিপদ ডেকে এনেছে। তিনি স্বীকার করেন, ভাগ্য সহায় না হলে প্রথমার্ধেই ব্রাজিল আরও পিছিয়ে যেতে পারত। তবে দ্বিতীয়ার্ধে দল কিছুটা ছন্দ ফিরে পেয়েছে বলেও মনে করেন তিনি। বলের দখল বাড়ানো এবং সুযোগ তৈরি করার সক্ষমতা ভবিষ্যতের ম্যাচগুলোর জন্য ইতিবাচক বার্তা হিসেবে দেখছেন এই মিডফিল্ডার।
অভিজ্ঞ কাসেমিরোও একই সুরে কথা বলেছেন। তার মতে, মরক্কোকে সহজ প্রতিপক্ষ ভাবার সুযোগ ছিল না। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আফ্রিকান দলটি ধারাবাহিকভাবে নিজেদের শক্তি প্রমাণ করেছে। তাই উদ্বোধনী ম্যাচে ড্র হতাশাজনক হলেও এটি বাস্তবতার একটি শিক্ষা।
মরক্কোর জন্য এই ড্র ঐতিহাসিক গুরুত্ব বহন করে। বিশ্বকাপ ইতিহাসে দক্ষিণ আমেরিকার কোনো দলের বিপক্ষে এটিই তাদের প্রথম পয়েন্ট। এর আগে ১৯৭০ সালে পেরুর কাছে এবং ১৯৯৮ সালে ব্রাজিলের কাছে হেরেছিল দলটি। শুধু তাই নয়, ১৯৬৬ সালের পর বিশ্বকাপে দ্বিতীয় দল হিসেবে ম্যাচের প্রথম ১০ মিনিটেই ব্রাজিলের গোলমুখে পাঁচটি শট নেওয়ার কীর্তি গড়েছে মরক্কো।
দলটির আরেকটি বিশেষ দিকও আলোচনায় এসেছে। বিশ্বকাপ ইতিহাসে এই প্রথম কোনো দল তাদের শুরুর একাদশে এমন ১১ জন খেলোয়াড়কে মাঠে নামিয়েছে, যাদের সবার জন্ম নিজ দেশের বাইরে। আধুনিক ফুটবলের বৈশ্বিক চরিত্রের প্রতিফলন যেন দেখা গেছে মরক্কোর এই দলে।
অন্যদিকে ব্রাজিলের জন্য কিছু ইতিবাচক পরিসংখ্যানও রয়েছে। সর্বশেষ ২১টি বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম ম্যাচে হারেনি সেলেসাওরা। ১৯৩৪ সালের পর উদ্বোধনী ম্যাচে তাদের কোনো পরাজয় নেই। ১৭ জয় ও ৪ ড্র নিয়ে এটি বিশ্বকাপ ইতিহাসের দীর্ঘতম উদ্বোধনী অপরাজিত থাকার রেকর্ড।
এছাড়া ভিনিসিয়ুস জুনিয়র জাতীয় দলের হয়ে নিজের ১০ম গোল করেছেন। তবে তার গোল করা ম্যাচে এই প্রথম জয় পায়নি ব্রাজিল। ফলে ব্যক্তিগত অর্জনের আনন্দ পুরোপুরি উপভোগ করতে পারেননি রিয়াল মাদ্রিদের এই তারকা।
মরক্কোর অধিনায়ক আশরাফ হাকিমিও ম্যাচটি দিয়ে নতুন একটি মাইলফলক স্পর্শ করেছেন। বিশ্বকাপে নিজের ১১তম ম্যাচ খেলে তিনি আফ্রিকান ফুটবলারদের মধ্যে সর্বাধিক ম্যাচ খেলার যৌথ রেকর্ডে উঠে এসেছেন।
সব মিলিয়ে ব্রাজিলের জন্য এটি ছিল সতর্কবার্তার ম্যাচ। ড্রয়ের ফলে বিশ্বকাপ যাত্রা থেমে যায়নি, কিন্তু শিরোপা জয়ের স্বপ্নপথ যে সহজ হবে না, তা স্পষ্ট হয়ে গেছে। এখন সামনে হাইতির বিপক্ষে ম্যাচ। সেখানে শুধু জয় নয়, নিজেদের হারানো ছন্দও ফিরে পেতে চাইবে সেলেসাওরা। কারণ বিশ্বকাপের মঞ্চে ভুলের সুযোগ খুব কম, আর মরক্কোর বিপক্ষে ম্যাচটি দেখিয়ে দিয়েছে—নামের জোরে আর কোনো ম্যাচ জেতা সম্ভব নয়।

মতামত দিন