নরওয়ের কাছে অসহায় আত্মসমর্পণ ব্রাজিলের
ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর শেষ ষোলোর অন্যতম হাইভোল্টেজ লড়াইয়ে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলকে ২-১ গোলে হারিয়ে ইতিহাস গড়ল নরওয়ে। দেশটির ফুটবল ইতিহাসে এই প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের শেষ আটে জায়গা করে নিল তারা। যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সির ইস্ট রাদারফোর্ডে অবস্থিত মেটলাইফ স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত এই ম্যাচে আর্লিং হালান্ডের জোড়া গোলে ভেঙে গেল কার্লো আনচেলত্তির শিষ্যদের হেক্সা জয়ের স্বপ্ন।
ম্যাচের শুরু থেকেই আধিপত্য দেখায় নরওয়ে। তৃতীয় মিনিটে মার্টিন ওডেগার্ডের বাড়ানো বল থেকে আলেকজান্ডার সোরলথ জালে বল জড়ালেও অফসাইডের কারণে গোলটি বাতিল হয়ে যায়। এর কিছুক্ষণ পরই ম্যাচের ১৪তম মিনিটে বক্সের ভেতরে মাথেউস কুনিয়াকে ফাউল করেন নরওয়ে ডিফেন্ডার ক্রিস্টোফার আয়ের। মাঠের রেফারি শুরুতে সিদ্ধান্ত না দিলেও ভিএআর পর্যালোচনার পর পেনাল্টির বাঁশি বাজে। স্পটকিক নিতে আসেন ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের বদলে ব্রুনো গুইমারায়েস, তবে তার ডান পায়ের শট দুর্দান্তভাবে রুখে দেন নরওয়ে গোলরক্ষক ওরইয়ান নিলান্ড। ম্যাচজুড়ে একাধিকবার দুর্দান্ত সেভে দলকে বাঁচিয়েছেন এই ৩৫ বছর বয়সী গোলরক্ষক, যিনি হয়ে ওঠেন ম্যাচের অন্যতম নায়ক।
প্রথমার্ধে ভিনিসিয়ুস জুনিয়র ও গ্যাব্রিয়েল মার্টিনেলি একাধিক সুযোগ তৈরি করলেও নিলান্ডের নৈপুণ্যে গোলের দেখা পায়নি ব্রাজিল। অন্যদিকে হালান্ডকে ঘিরে সাজানো নরওয়ের আক্রমণও প্রথমার্ধে কার্যকর হয়নি, অ্যালিসন বেকার একবার ওডেগার্ডের বক্সের ভেতরের শট রুখে দলকে বিপদমুক্ত রাখেন। ফলে গোলশূন্য অবস্থাতেই বিরতিতে যায় দুই দল।
বিরতির পর একসঙ্গে দুটি পরিবর্তন আনেন নরওয়ে কোচ স্টোলে সোলবাক্কেন। আন্তোনিও নুসা ও আলেকজান্ডার সোরলথের বদলে মাঠে নামান অস্কার বব ও আন্দ্রেয়াস শেলদেরুপকে, যা ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে ব্রাজিলও আক্রমণের ধার বাড়ানোর চেষ্টা করে। ৫৭ মিনিটে কুনিয়াকে তুলে এন্দ্রিককে নামানো হলে ভিনিসিয়ুসের চমৎকার পাস থেকে সহজ সুযোগ পেয়েও গোল বঞ্চিত হন এই তরুণ ফরোয়ার্ড।
ম্যাচের ৭৯তম মিনিটে অচলাবস্থা ভাঙেন আর্লিং হালান্ড। বাঁ প্রান্ত থেকে আন্দ্রেয়াস শেলদেরুপের নিখুঁত ক্রসে লাফিয়ে উঠে গ্যাব্রিয়েল মাগালহায়েসকে পেছনে ফেলে হেডে বল জালে জড়ান তিনি, যা নরওয়েকে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে দেয়। এরপর ৯০তম মিনিটে ব্যবধান দ্বিগুণ করেন এই নরওয়েজিয়ান তারকা। আবারও শেলদেরুপের বাড়ানো বল বক্সের ভেতরে ধরে নিয়ন্ত্রণে এনে জোরালো শটে বল পাঠান জালের বাঁ কোণায়, যা ফিরিয়ে দেওয়ার কোনো সুযোগই পাননি অ্যালিসন। এই গোলের মাধ্যমে টুর্নামেন্টে নিজের চতুর্থ ম্যাচেও গোল করার কীর্তি গড়েন হালান্ড। ১৯৯৮ সালের পর ইতালির ক্রিস্টিয়ান ভিয়েরির পর তিনিই প্রথম ইউরোপীয় খেলোয়াড় যিনি বিশ্বকাপের প্রথম চার ম্যাচেই গোল করলেন।
দুই গোলে পিছিয়ে পড়ার পরপরই একটি বিতর্কিত মুহূর্তের জন্ম হয়। প্রতিপক্ষের প্রতি-আক্রমণ থামাতে গিয়ে মার্টিন ওডেগার্ডকে কঠোরভাবে ফাউল করেন বদলি হিসেবে মাঠে নামা নেইমার, যার জন্য তাকে হলুদ কার্ড দেখান রেফারি। ম্যাচের একেবারে শেষদিকে লিও ওস্টিগার্ডের অসতর্ক কনুইয়ের আঘাতে বক্সের ভেতরে ফাউলের শিকার হন এক ব্রাজিলিয়ান ফরোয়ার্ড, ফলে দ্বিতীয়বারের মতো পেনাল্টি পায় ব্রাজিল। এবার স্পটকিক থেকে ভুল করেননি নেইমার, নিখুঁত শটে নিলান্ডকে পরাস্ত করে ব্যবধান ২-১ করেন তিনি। তবে যোগ করা সময়ের একেবারে শেষপ্রান্তে আসা এই গোল সমতা ফেরানোর জন্য যথেষ্ট ছিল না।
ফিফার সর্বশেষ অফিসিয়াল পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বল দখলে স্পষ্ট আধিপত্য দেখিয়েছে নরওয়ে। ৬৭ শতাংশ সময় বল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখেছিল তারা, ব্রাজিলের দখলে ছিল ৩৩ শতাংশ। পাসের সংখ্যা ও নির্ভুলতাতেও এগিয়ে ছিল নরওয়ে; তাদের ৬১৬টি পাসের ৯১ শতাংশ ছিল নির্ভুল বিপরীতে ব্রাজিলের ২৭৭টি পাসের নির্ভুলতা ছিল ৮৫ শতাংশ। তবে বড় সুযোগ তৈরিতে দুই দলই ছিল কাছাকাছি এবং সামগ্রিক লড়াইয়ে ডুয়েল জেতার দিক থেকে ব্রাজিল (৪৩টি) সামান্য এগিয়ে ছিল নরওয়ের (৪২টি) চেয়ে।
ফাউলের হিসাবে ব্রাজিল করেছে ৭টি, নরওয়ে ৬টি। পুরো ম্যাচে দুই দলই দুটি করে পেনাল্টি বক্সের ফাউলে জড়িয়েছিল, যার দুটিই পেয়েছে ব্রাজিল। গোলরক্ষকদের নৈপুণ্যেও ছিল পার্থক্য; নরওয়ের ওরইয়ান নিলান্ড করেছেন ৪টি গুরুত্বপূর্ণ সেভ, অ্যালিসন বেকার করেছেন ৩টি। পুরো ম্যাচে হলুদ কার্ড দেখেছেন কেবল নেইমার, কোনো লাল কার্ড দেখানো হয়নি এবং কোনো দলকেই বাড়তি খেলোয়াড় নিয়ে খেলতে হয়নি।
ব্রাজিল মাঠে নামে অ্যালিসন; দানিলো, মার্কুইনহোস, গ্যাব্রিয়েল, দগলাস সান্তোস; কাসেমিরো, ব্রুনো গুইমারায়েস; রায়ান, গ্যাব্রিয়েল মার্টিনেলি, ভিনিসিয়ুস জুনিয়র; মাথেউস কুনিয়াকে নিয়ে। ৫৭ মিনিটে কুনিয়ার বদলে নামেন এন্দ্রিক, এরপর প্রায় ৬৮ মিনিটে মার্টিনেলির জায়গায় নেইমার ও রায়ানের বদলে দানিলো সান্তোস মাঠে নামেন, শেষদিকে আক্রমণে বৈচিত্র্য আনতে নামানো হয় এদেরসনকেও।
অন্যদিকে নরওয়ে খেলে নিলান্ড; পেডারসেন, আয়ের, হেগেম, মোলার-উলফে; ওডেগার্ড, বার্গে, বার্গ; সোরলথ, হালান্ড, নুসা—এই একাদশ নিয়ে। বিরতির পর একসঙ্গে সোরলথ ও নুসাকে তুলে বব ও শেলদেরুপকে নামান কোচ সোলবাক্কেন, আর দ্বিতীয়ার্ধের মাঝামাঝি চোটের কারণে মোলার-উলফের বদলে মাঠে নামেন লিও ওস্টিগার্ড।
এই হারে গত আটটি বিশ্বকাপে টানা কোয়ার্টার ফাইনাল খেলার ধারাবাহিকতা ভাঙল ব্রাজিলের। ২০০২ সালে সবশেষ বিশ্বকাপ জেতার পর থেকে এ নিয়ে টানা ষষ্ঠবারের মতো ইউরোপীয় কোনো দলের কাছে হেরে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিতে হলো সেলেসাওদের।
অন্যদিকে ইতিহাস গড়ল নরওয়ে। দেশটির ফুটবল ইতিহাসে এই প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে জায়গা করে নিল তারা। আগামী ১১ জুলাই মায়ামিতে কোয়ার্টার ফাইনালে নরওয়ে মুখোমুখি হবে মেক্সিকো অথবা ইংল্যান্ডের বিজয়ী দলের সঙ্গে। সাত গোল নিয়ে গোল্ডেন বুটের দৌড়েও এখন সবার ওপরে আর্লিং হালান্ড, যার হাত ধরেই ইতিহাস গড়ার স্বপ্ন দেখছে নরওয়েজিয়ান ফুটবল।
মতামত দিন