৫০০ বছরের ঐতিহ্যে উদযাপিত হচ্ছে কোচবিহারের বড় দেবী পূজা
কোচবিহারের ঐতিহ্যের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বড় দেবী বা বড় মা। কথিত আছে, মহারাজা নরনারায়ণের আমলে এই পুজো শুরু হয় আনুমানিক ১৫৩০ সাল নাগাদ। হিসেব কষলে, এই পূজা এখন প্রায় ৫০০ বছরের।
সারা বাংলায় দুর্গাপূজার প্রস্তুতি চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। কোচবিহারে বড় দেবীর পূজাকে ঘিরে চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। ৫০০ বছরের পুরোনো রাজকীয় ঐতিহ্য অত্যন্ত শ্রদ্ধার সাথে সংরক্ষণ এবং অনুশীলন করা হয়েছে।
প্রতিমার স্বতন্ত্র রঙ এবং এটিকে ঘিরে অনেক আকর্ষণীয় আচার ও গল্প এই পূজাকে আলাদা করে। কেউ কেউ দাবি করেন, মহারাজা নরনারায়ণ দেবী পূজা শুরু করার জন্য স্বপ্নে আদেশ পেয়েছিলেন। অন্যরা বিশ্বাস করেন, মহারাজা বিশ্ব সিংহ ৯ বছর বয়সে শুকনো ময়না কাঠের ডাল এবং বাঁশ দিয়ে একটি মূর্তি তৈরি করে দেবী দুর্গার পূজা শুরু করেছিলেন। এই প্রথা তখন থেকে রাজপরিবারের লালিত ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে।
বড় দেবীর মূর্তি ময়না কাঠ ব্যবহার করে ভাস্কর্য করা হয়েছে। শ্রাবণের শুক্ল অষ্টমীতে কোচবিহারের ডাংরাই মন্দিরে ময়না কাঠকে প্রথম পবিত্র করা হয়। সেই সন্ধ্যার পরে এটি কোচবিহারের মদন মোহন বাড়িতে এক মাসব্যাপী পূজার জন্য রাখা হয়। রাধাষ্টমীতে ময়না কাঠ একটি পালকিতে দেবী বাড়ি মন্দিরে নিয়ে যাওয়া হয় যেখানে ময়না কাঠের কাঠামোর মধ্যে দেবী বড় দেবীর মূর্তিটি দক্ষতার সাথে ভাস্কর্য করা হয়। কোচবিহারের চিত্রকর পরিবারের সদস্যরা নিপুণভাবে প্রতিমা তৈরি করে এই ঐতিহ্যটি আজও বিশ্বস্তভাবে অনুসরণ করে আসছে। চিত্রকর পরিবারের সদস্য প্রভাত চিত্রকর গত ৩৩ বছর ধরে এই প্রতিমাটি তৈরি করে আসছেন।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হচ্ছে, বড় দেবী মূর্তির উভয় পাশে গণেশ, লক্ষ্মী, সরস্বতী বা কার্তিক নেই। বরং এখানে জয়া এবং বিজয়া রয়েছে।
অতীতে স্থানীয়দের দাবি, এই পূজার একটি অনুষ্ঠান ছিল মানুষ বলিদান কিন্তু এই প্রথা বন্ধ করা হয়েছে। তবে বড় দেবী পূজার সময় মানুষের রক্ত দেওয়ার প্রথা এখনও বিদ্যমান।
'গুপ্ত পূজা' নামে পরিচিত একটি বিশেষ পূজা 'অষ্টমী' রাতে পরিচালিত হয়, যে সময়ে কোচবিহারের সিদ্ধেশ্বরী এলাকার রাজপরিবারের সদস্যরা তাদের আঙুল কেটে রক্ত দেওয়ার প্রাচীন রীতি অনুসরণ করে। এই অনুষ্ঠানের সময় সাধারণ মানুষ উপস্থিত থাকে না। এ ছাড়াও অষ্টমীর দিনে, একটি মহিষ বলি দেওয়া হয় ঐতিহ্য অনুসারে। যদিও এখন রাজার আমল নেই। রাজার অনুপস্থিতি সত্ত্বেও রাজকীয় যুগের সমস্ত আচার-অনুষ্ঠান এখনো বহাল রয়েছে।
দেবী বাড়ি মন্দির এলাকায় একটি মেলারও আয়োজন করা হয়। যা শুধুমাত্র কোচবিহার থেকে নয়, আসাম এবং পার্শ্ববর্তী জেলা থেকেও দর্শকদের আকর্ষণ করে।
রাজকীয় পুরোহিত হীরেন্দ্র নাথ ভট্টাচার্য বলেন,“কোচবিহারের মহারাজাদের দ্বারা সূচিত এই পূজার সমস্ত আচার-অনুষ্ঠান অতীতের রাজকীয় যুগের একটি প্রমাণ হিসেবে অব্যাহত রয়েছে। কোচবিহারের দেবী বাড়ি মন্দিরে পূজা অনুষ্ঠিত হয়। সপ্তমী, অষ্টমী এবং নবমীতে নৈবেদ্য এবং বলি পূজার একটি অংশ। অষ্টমীতে কোচবিহারের জেলা ম্যাজিস্ট্রেট, রাজকীয় প্রতিনিধি হিসেবে প্রথম 'অঞ্জলি' প্রদান করেন, তার পরে সাধারণ জনগণ আচার শুরু করেন। কোচবিহারে বড় দেবী পূজার ঐতিহ্য রাজকীয় উত্তরাধিকার রক্ষা করে মানুষকে বিমোহিত করে চলেছে।”
প্রসঙ্গত, পূর্ব ভারতের সর্বপ্রথম দূর্গাপূজা বড় দেবী অর্থাৎ ডাঙর আঈর বিসর্জন না করা পর্যন্ত কোচবিহার শহরের অন্যান্য দূর্গা প্রতিমা বিসর্জনের জন্য নেওয়া হয় না।

মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে