১৮০ দিনে বিএনপি ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে: এনসিপি
বর্তমান বিএনপি সরকারের প্রথম ১৮০ দিনের কর্মকাণ্ডকে ‘অদক্ষতা, অব্যবস্থাপনা, অপরিণামদর্শিতা ও ব্যর্থতার’ দৃষ্টান্ত বলে মন্তব্য করেছে প্রধান বিরোধী দলীয় জোটের শরিক জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)।
দলটির দাবি, ক্ষমতায় আসার পর নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখাকে সরকার অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু গত ছয় মাসে এসব প্রতিশ্রুতির প্রতিটি ক্ষেত্রেই সরকার ব্যর্থ হয়েছে।
সোমবার রাজধানীর বাংলামোটরে বিএনপি সরকারের ১৮০ দিনের কর্মকাণ্ড মূল্যায়ন করে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এনসিপির আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম দলের লিখিত খতিয়ান তুলে ধরেন।
নাহিদ ইসলাম অভিযোগ করেন, আগের অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে নেওয়া বিভিন্ন কাঠামোগত সংস্কার বিএনপি সরকার একে একে বাতিল বা দুর্বল করে দিচ্ছে।
জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, গুম প্রতিরোধ আইন ও সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ের মতো স্বাধীন প্রতিষ্ঠান গঠনের উদ্যোগ স্থবির করে পুরোনো কাঠামো ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও প্রশাসনে ব্যাপক দলীয়করণ ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগও করেছে এনসিপি। দলটির দাবি, দেশের ২০টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য নিয়োগের মধ্যে ১৯ জনেরই ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ততা রয়েছে। এ ছাড়া ১১টি সিটি করপোরেশন ও ৬৩টি জেলা পরিষদে দলীয় নেতাদের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার সিদ্ধান্তও সরকারের রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির পরিপন্থী বলে দাবি করেছে দলটি।
দেশের অর্থনীতি ও জ্বালানি পরিস্থিতি তুলে ধরে এনসিপি বলেছে, মার্চ ও এপ্রিল মাসে দেশে পেট্রোল ও ডিজেলের তীব্র সংকট তৈরি হয়েছিল। পরে জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়ে সাধারণ মানুষের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করা হয়েছে।
বিদ্যুৎ খাতেও সরকারের সমালোচনা করেছে এনসিপি। দলটির দাবি, ইশতেহারে দুই বছর বিদ্যুতের দাম না বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও তিন মাসের মাথায় পাইকারি ও খুচরা উভয় পর্যায়ে দাম বাড়ানো হয়েছে। গ্রাম ও মফস্বলে দৈনিক ১০ ঘণ্টার বেশি লোডশেডিং এবং ‘ভূতুড়ে বিল’ জনজীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে বলেও অভিযোগ করা হয়।
এনসিপির দাবি, আমন মৌসুমের শুরুতেই কৃষকদের নির্ধারিত দামের চেয়ে বস্তাপ্রতি ৩৫০ থেকে ৪৫০ টাকা বেশি দামে সার কিনতে হচ্ছে। সিন্ডিকেট ও পরিবহন খাতে চাঁদাবাজির কারণে কৃষক উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য দাম পাচ্ছেন না, অথচ ভোক্তা পর্যায়ে নিত্যপণ্যের দাম বেড়েই চলেছে।
ব্যাংকিং খাতের বিষয়ে দলটি বলেছে, ব্যাংক লুটেরাদের কাছ থেকে অর্থ উদ্ধারে সরকারের দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। বরং খেলাপি ঋণ পুনর্গঠনের মাধ্যমে পুরোনো খেলাপিদের সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। এতে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ঐতিহাসিকভাবে নিম্ন পর্যায়ে নেমে গেছে বলে দাবি করেছে এনসিপি।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ জানিয়েছে দলটি। পুলিশ সদর দপ্তর ও বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার তথ্য উদ্ধৃত করে এনসিপি দাবি করেছে, গত পাঁচ মাসে থানায় ৮৮ হাজারের বেশি মামলা হয়েছে। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনাও দেড় হাজারের কাছাকাছি বলে দাবি করা হয়েছে।
বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের পাশাপাশি সংবাদমাধ্যমের ওপর চাপ ও হয়রানি বেড়েছে বলেও অভিযোগ করেছে এনসিপি। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য উদ্ধৃত করে দলটি জানিয়েছে, বছরের প্রথম ছয় মাসে সাংবাদিক হয়রানির ২৩৭টি ঘটনা ঘটেছে।
র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন বিলুপ্ত না করে ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন’ নামে পুনর্গঠনের উদ্যোগেরও সমালোচনা করেছে দলটি। এনসিপির মতে, এতে বাহিনীটির পুরোনো ক্ষমতার অপব্যবহারের সুযোগ থেকেই যাচ্ছে।
স্বাস্থ্য খাতের পরিস্থিতি নিয়েও সরকারের সমালোচনা করেছে এনসিপি। দলটির দাবি, দেশে হাম আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর সংখ্যা ৯০০ এবং আক্রান্তের সংখ্যা ১ লাখ ছাড়িয়েছে। প্রয়োজনীয় টিকা ও জেলা পর্যায়ে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের (আইসিইউ) সেবা নিশ্চিত করতে না পারাকে সরকারের ব্যবস্থাপনাগত ব্যর্থতা হিসেবে উল্লেখ করেছে দলটি।
এ ছাড়া জুলাই অভ্যুত্থানে নিহত ব্যক্তিদের পৃথক হত্যা মামলার তদন্তে ধীরগতি এবং আহতদের পুনর্বাসনে সরকারের দৃশ্যমান উদ্যোগের অভাব রয়েছে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রেও সরকারের সমালোচনা করে এনসিপি বলেছে, সীমান্ত হত্যা বন্ধ এবং বিদেশে অবস্থানরত বিতর্কিত সাবেক কর্মকর্তাদের দেশে ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে সরকার ধারাবাহিকভাবে নিষ্ক্রিয় রয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে এনসিপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী কমিটির সদস্য সালেহ উদ্দিন সিফাত, দলের যৌথ সদস্যসচিব হুমায়রা নূর এবং জাতীয় যুবশক্তির সভাপতি তারিকুল ইসলামসহ জ্যেষ্ঠ নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
মতামত দিন