বিএমডিএর সেচ ও খাল খননে বদলে গেছে চাঁপাইনবাবগঞ্জের কৃষি
এক সময়কার শুষ্ক ও মরুপ্রায় বরেন্দ্র জনপদ এখন দেশের অন্যতম শস্যভান্ডার। বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিএমডিএ) আধুনিক সেচ ব্যবস্থা, বিশেষ করে খাল খনন ও ভূপরিস্থ পানির সর্বোত্তম ব্যবহারের ফলে চাঁপাইনবাবগঞ্জের কৃষি ও অর্থনীতিতে এসেছে বৈপ্লবিক পরিবর্তন।
ওই অঞ্চলের সুফলভোগী কৃষক কয়েকজন কথা বলেছেন ভিউজ বাংলাদেশের সঙ্গে। তারা জানান, বিএমডিএর সেচব্যবস্থা, খাল খনন, পুকুর সংস্কার ও গাছ লাগানোর কাজের কারণে ওই অঞ্চলের কৃষিতে বড় পরিবর্তন এসেছে। আগে অনাবাদি বা অনুপযোগী জমি এখন চাষের আওতায় এসেছে, ফলে কৃষকদের উৎপাদন ও জীবনমান উন্নত হয়েছে। তারা মনে করেন, বিএমডিএকে আরও বড় দায়িত্ব দিলে এলাকার সামগ্রিক উন্নয়ন আরও দ্রুত হবে।
সদর উপজেলার প্রবীণ কৃষক জুবাইয়ের হোসেন (৬৫) বলেন, ‘বিএমডিএ আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে পানি সরবরাহ করায় আমাদের কৃষিতে বিপ্লব ঘটছে। খাল খনন করে নদী থেকে পানি আনা এবং পুকুর সংস্কার করে উপরিভাগের পানির ব্যবহার বাড়ানোয় চাষাবাদ সহজ হয়েছে। গাছ রোপণ ও খাল খননে বিএমডিএর যে দক্ষতা, তাতে তাদের আরও বড় দায়িত্ব দিলে এই অঞ্চলের চেহারা পাল্টে যাবে।’
একই এলাকার বাসিন্দা আব্দুল মাতিন (৫০) বলেন, ‘১৯৯১-৯২ সালে বিএমডিএ প্রতিষ্ঠার পর থেকে এই অঞ্চলের পরিবেশগত বিবর্তন শুরু হয়। এক সময়ের অনুপযোগী জমি এখন ফসলে ভরা।’ তিনি আরও বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের খাল খনন ও চারা রোপণের দূরদর্শী পদক্ষেপ বিএমডিএর মাধ্যমে বাস্তবায়িত হয়ে কৃষকের ভাগ্যোন্নয়ন ঘটাচ্ছে।’
চাঁপাইনবাবগঞ্জ রিজিয়ন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বিএমডিএর কার্যক্রম এই জেলায় ব্যাপক ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। ১ হাজার ৬৩৯টি ফোর্স মোড পাম্পের মাধ্যমে ৬২ হাজার হেক্টর জমিতে বছরে তিনটি ফসল চাষ হচ্ছে, যা আগে ছিল মাত্র একটি; এতে উপকৃত হচ্ছে ১ লাখ ৩২ হাজার কৃষক পরিবার। মহানন্দা ও পুনর্ভবা নদী থেকে ১০০টি এলএলপি পাম্পের মাধ্যমে ৪ হাজার হেক্টর জমিতে সেচ দেওয়া হচ্ছে। প্রতি বছর প্রায় ৬ লাখ ৫০ হাজার মেট্রিক টন ফসল উৎপাদিত হচ্ছে, যার বাজারমূল্য প্রায় ১ হাজার ৬২৫ কোটি টাকা। পানির অপচয় রোধে ২০০৩ সাল থেকে চালু রয়েছে স্মার্ট কার্ডভিত্তিক প্রিপেইড মিটার ব্যবস্থা।
শুধু সেচ নয়, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় বিএমডিএ এ পর্যন্ত দেড় কোটি ফলজ, বনজ ও ঔষধি গাছ রোপণ করেছে। এ ছাড়া বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের জন্য ২৩০ কিলোমিটার খাল এবং ১ হাজার ৯১টি পুকুর পুনঃখনন করা হয়েছে, যা ভূগর্ভস্থ পানির স্তরের ওপর চাপ কমিয়েছে।
গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নেও বিএমডিএর ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। ২৩৪টি স্থাপনার মাধ্যমে প্রায় ২ লাখ মানুষের জন্য সুপেয় পানি নিশ্চিত করা হয়েছে। এ ছাড়া ১ হাজার ৪০০ কিলোমিটার বেরিড পাইপ (সেচনালা) এবং ১৮৬ কিলোমিটার সংযোগ সড়ক নির্মাণ করা হয়েছে, যা কৃষিপণ্য বাজারজাতকরণ সহজ করেছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ রিজিয়ন কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আল মামুনুর রশিদ জানান, মহানন্দা নদীর পানি ব্যবহার করে প্রায় ১৮ হাজার হেক্টর তীব্র খরাপ্রবণ এলাকায় সেচ সুবিধা পৌঁছে দিতে কৃষি মন্ত্রণালয়ে দুটি বড় প্রকল্প প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। এর মধ্যে ডাবল লিফটিং পদ্ধতি প্রকল্পের আনুমানিক ব্যয় ৮৩৯ কোটি টাকা এবং জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রভাব প্রশমন প্রকল্পের আনুমানিক ব্যয় ৫৮৭ কোটি টাকা। এই প্রকল্পগুলোর আওতায় ২১০ কিলোমিটার খাল ও ১৫০টি পুকুর পুনঃখননসহ সাড়ে পাঁচ লাখ বৃক্ষরোপণ এবং সোলার সেচযন্ত্র স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। বর্তমানে আরও ৬ কিলোমিটার খাল এবং দুটি বড় বিল (চুড়ইল ও কালন) পুনঃখনন প্রক্রিয়াধীন।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. ফারহাত তাসনীম ভিউজ বাংলাদেশকে বলেন, ‘বিএমডিএ যেহেতু কৃষি ও সেচ ব্যবস্থাপনায় অত্যন্ত দক্ষ, তাই তাদের এই কাজে আরও বেশি সম্পৃক্ত করা হলে বরেন্দ্র অঞ্চলের আর্থসামাজিক অবস্থার দ্রুত উন্নতি ঘটবে।’
আধুনিক প্রযুক্তি ও প্রাকৃতিক সম্পদের সমন্বয়ে বিএমডিএ যেভাবে কাজ করছে, তাতে শুধু চাঁপাইনবাবগঞ্জ নয়, সারা দেশের খাদ্য নিরাপত্তায় এটি একটি মডেল হিসেবে দাঁড়িয়েছে। সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এই প্রতিষ্ঠানটি বরেন্দ্র অঞ্চলের চেহারা পুরোপুরি বদলে দিতে সক্ষম।

মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে