Views Bangladesh Logo

হাঁস শিকারের আড়ালে বাঙালি নিধনের নকশা

Rahat  Minhaz

রাহাত মিনহাজ

সমৃদ্ধ সিন্ধু সভ্যতার গোড়াপত্তন সিন্ধু নদ ও তার অববাহিকাকে কেন্দ্র করে। ভারত-পাকিস্তানে বিস্তৃত এই নদের তীরে যেসব শহর গড়ে উঠেছে সেগুলোর মধ্যে অন্যতম পাকিস্তানের লারকানা। দেশটির সিন্ধু প্রদেশের অন্যতম সৃমদ্ধ ও গুরুত্বপূর্ণ শহর এটি। হাজার মাইল দূরের এই শহরটির সাথে বাঙালি জাতির স্বাধীনতা আন্দোলনের এই গুরুত্বপূর্ণ এক অধ্যায় জড়িয়ে আছে। কারণ এই শহরেই চূড়ান্ত হয়েছিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের বদলে বাঙালি নিধনযজ্ঞের নীলনকশা। দিনটি ছিল ১৯৭১ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি। যেদিন ভারী ভূরিভোজ, রঙ্গীন পানীয় আর ক্ষমতায় নেশায় বাঙালি জাতিকে একটি রক্তাক্ত শিক্ষা দেওয়ার পরিকল্পনা চূড়ান্ত করেছিল প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ও জুলফিকার আলী ভুট্টো ও পাকিস্তানি শীর্ষ সেনা কর্তারা।

পাকিস্তানি রাজনীতির এক বড় চরিত্র ক্ষমতালিপ্সু জুলফিকার আলী ভুট্টো। ধুরন্ধর ভুট্টো এই লারকানার নবাব হিসেবে পরিচিত ছিলেন। ভুট্টো ছিলেন লারকানার বিখ্যাত জমিদার পরিবারের উত্তরাধিকারী। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে উচ্চশিক্ষা শেষে তিনি পাকিস্তানের রাজনীতিতে যুক্ত হয়েছিলেন। ১৯৫৮ সালেই হয়েছিলেন পাকিস্তানের সর্বকনিষ্ঠ মন্ত্রী। এরপর আইয়ুব খান ও ইয়াহিয়া খানের মন্ত্রিসভাতেও ছিলেন। উচ্চভিলাষী ভুট্টো ১৯৬৭ সালে গঠন করেন পাকিস্তান পিপলস্ পার্টি। ১৯৭০ সালের জাতীয় নির্বাচনে ভুট্টো ছিলেন দ্বিতীয় সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা। তবে একটা বিষয় ছিল লক্ষ্যণীয়। পূর্ব পাকিস্তানে একটি আসনও পায়নি ভুট্টোর দল, বিপরীতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আওয়ামী লীগও পশ্চিম পাকিস্তানে আসন শূণ্য ছিল। যদিও ফলাফল নির্ধারণী ১৯৭০ সালের সেই নির্বাচনে পূর্ব-পশ্চিম পাকিস্তান মিলে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আওয়ামী লীগ। নিয়মতান্ত্রিকভাবে আওয়ামী লীগেরই কেন্দ্রে ও প্রদেশ হিসেবে পূর্ব পাকিস্তানে সরকার গঠনের কথা।

নির্বাচনের পর প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান অন্তত দুইবার সাংবাদিকদের সাথে কথা বলার সময় শেখ মুজিবুর রহমানকে আগামী দিনে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন। নির্বাচনী ফল অনুযায়ী ক্ষমতা হস্তান্তরে আপাতদৃষ্ঠিতে ইয়াহিয়া খানকে কিছুটা আগ্রহী মনে হলেও ভুট্টোর চিন্তা ছিল ভিন্ন। ক্ষমতার প্রশ্নে ভুট্টো ছিলেন কঠোর, কট্টর, কুচক্রী ও প্রবলভাবে বাঙালি বিদ্বেষী। বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করে বিরোধী দলীয় নেতার চেয়ারে বসার কোনো আগ্রহ বা ইচ্ছে ভুট্টোর ছিল না। আর এজন্যেই ছয় দফাকে সামনে নিয়ে আসে ভুট্টো। ভুট্টো বাঙালির মুক্তির এই সনদকে বিচ্ছিন্নতাবাদের সনদ বলে অভিহিত করেন। ছয় দফার প্রশ্নে ভুট্টো ছিলেন সংশয়বাদী। তিনি প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেন ছয় দফা মেনে নিয়ে পাকিস্তান টিকবে না। যে কারণেই ছয় দফা অনুযায়ী শসনতন্ত্র প্রণয়নে ভুট্টো কট্টর বিরোধিতা শুরু করেন। এ সময় তাঁর সাথে ছিলেন পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বেশ কয়েকজন উচ্চপদস্থ জেনারেল।

একটু পেছন ফিরে তাকানো যাক। ১৯৭০ সালের জাতীয় নির্বাচন ছিল গোটা পাকিস্তানের প্রথম কোনো জাতীয় নির্বাচন। পাকিস্তানি গোয়েন্দাদের ধারণা ছিল শেখ মুজিবুর রহমান হয়তো ভোটে জিতবেন কিন্তু একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবেন না। সেই প্রতিবেদনকে মিথ্যা প্রমাণ করে ১৯৭০ সালের নির্বাচনে ভূমধস বিজয় পান শেখ মুজিবুর রহমান। এরপরই শুরু হয় ষড়যন্ত্রের জাল বোনা। যে কূটচক্রের ফলাফল নির্ধারণী বৈঠক হয়েছিল ভুট্টোর লারকানার সেই জমিদার বাড়িতে। জাতীয় নির্বাচনের পর ১৯৭১ সালের ১১ জানুয়ারি প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ঢাকায় এসে শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে সাক্ষাৎ করেন। জাতীয় পরিষদের অধিবেশন আহ্বান ও শাসনতন্ত্র নিয়ে আলাপ হয় বঙ্গবন্ধু ও তাঁর সহযোগিদের সাথে। মুজিবের সাথে ইয়াহিয়া খানের এই বৈঠকটি সৌহার্দপূর্ণ ছিল না। দীর্ঘ সাত ঘন্টার বৈঠকে তাঁরা কোনো সিদ্ধান্তে আসতে পারেননি। অনেকেই তাঁদের বৈঠককে হতাশাব্যাঞ্জক বলে অভিহিত করেছেন। এরপরই ঘটনার নাটকীয় মোড়। ঢাকা থেকে করাচী ফিরে হঠাৎই ভুট্টোর আতিথ্য গ্রহণ করেন ইয়াহিয়া খান।

১৭ ফেব্রুয়ারি ১৯৭১ দলবলে লারকানা যান পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট। এ সময় তাঁর সাথে ছিলেন সেনাবাহিনীর চিফ-অব-স্টাফ জেনারেল আব্দুল হামিদ খান, প্রধান স্টাফ অফিসার লে.জে. পরীজাদাসহ পাকিস্তানি শীর্ষ সেনা কর্মকর্তারা। রাজনৈতিক ক্রান্তিকাল দেশের দ্বিতীয় সংখ্যাগরিষ্ট দলের নেতার বাড়িতে এমন আতিথ্য গ্রহণ নিশ্চিতভাবেই দৃষ্টিকটূ ছিল। এই সফরের প্রকাশ্য উদ্দেশ্য ছিল পাকিস্তান পিপলস পার্টি (পিপিপি) প্রধান জুলফিকার আলী ভুট্টোর পৈত্রিক বাড়িতে হাঁস শিকার করা। যদিও ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, হাঁস শিকারের আড়ালে ক্ষমতা হস্তান্তরের বদলে চূড়ান্ত হয়েছিল শক্তি প্রয়োগের সিদ্ধান্ত। এই লারকানাতেই গণহত্যা চালিয়ে বাঙালি জাতিকে পদানত করার সিদ্ধান্ত নিয়ে ছিলেন হাঁস শিকারী পশ্চিম পাকিস্তানিরা। বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদন ও পাকিস্তানি জেনারেলদের লেখায় উঠে এসেছে, লারকানার ওই মহাভোজের পর ভুট্টো খুবই উচ্ছ্বসিত ছিলেন। কারণ এই বৈঠকেই সংখ্যাগরিষ্টদের নেতা শেখ মুজিবকে পাশ কাটিয়ে ভুট্টোকে কাছে টেনে নেন পাকিস্তানি জেনারেলরা। যার ফলে ছয় দফা প্রশ্নে ভুট্টো আরও কট্টর অবস্থানে চলে যান।

লারকানায় ভুট্টো-ইয়াহিয়া আঁতাতের পরই পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যেতে শুরু করে। লারকানার ঔই বৈঠকের এক সপ্তাহ পরেই ৩ মার্চ ঢাকায় অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া গণপরিষদের অধিবেশন ১ মার্চ ১৯৭১ স্থগিত করেন ইয়াহিয়া খান। শুরু হয় ষড়যন্ত্রেকে চূড়ান্ত রূপ দেওয়ার প্রক্রিয়া। এখানে একটি বিষয় লক্ষ্যণীয়, শেখ মুজিবর রহমান ছিলেন সংখ্যাগরিষ্ট দলের নেতা কিন্তু তারপরও অধিবেশন স্থগিত করার আগে তাঁকে কিচ্ছুই জানানো হয়নি। এখানেই পরিষ্কার হয়ে যায়, ইয়াহিয়া-ভুট্টো নতুন কোনো চক্রান্ত করেছেন। যাই হোক, অধিবেশন স্থগিত হওয়ার পরই বাংলার শহর-বন্দর-গ্রামে শুরু হয় অভূতপূর্ব গণআন্দোলন। তোমার আমার ঠিকানা পদ্মা-মেঘনা-যমুনা, ঢাকা না পিন্ডি, ঢাকা ঢাকা- এইসব শ্লোগানে তখন প্রকম্পিত সারাবাংলার আকাশ-বাতাস। যে আন্দোলনের স্রোতে পাকিস্তানি শাসন কাঠামো পুরোপুরি ভেঙ্গে পড়ে। শেখ মুজিবর রহমান পরিণত হন ডি-ফ্যাক্ট লিডারে। অন্যদিক পাকিস্তানিরাও বসে থাকেনি। গণহত্যার নীলনকশা বাস্তবায়নে সিভিল ড্রেসে বেসামরিক বিমানে সেনা আসতে থাকে ঢাকায়। গণতন্ত্রের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ও অনেকটা নমনীয় পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর রিয়াল এ্যাডমিরাল আহসানকে প্রত্যাহার করে তাঁর স্থানে নিয়োগ দেওয়া হয় বেলুচিস্তানের কসাই খ্যাত টিক্কা খানকে। এছাড়া শক্তি প্রয়োগে সম্মত না হওয়ায় সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল ইস্টার্ন কমান্ডের প্রধান জেনারেল সাহেবজাদা ইয়াকুব খানকেও। এরআগে বেসামরিক মন্ত্রিসভাও বাতিল করা হয়।

এদিকে পহেলা মার্চ থেকেই ঢাকাসহ সারাদেশ অগ্নিগর্ভ। শেখ মুজিবর রহমান ২ মার্চ হরতালের ডাক দেন। ৭ই মার্চ উচ্চারণ করেন বাঙালির মুক্তির অমর বাণী। সাথে চলতে থাকে অহিংস অসহযোগ। এ সময় সামরিক আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানো হয়। পরিবহন সেবা অচল হয়ে পড়ে। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশনা অনুযায়ী কর দেওয়া বন্ধ হয়। আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো নিস্ক্রিয় হয়ে পড়ে। বন্ধ হয়ে যায় আন্তঃপ্রাদেশিক লেনদেন। বলা যায়, সর্বত্রই কার্যকর ছিল শেখ মুজিবর রহমানের নির্দেশনা। এমনকি ক্যান্টনমেন্টে পাকিস্তানি সেনাদের জন্য খাবারও সরবরাহও বন্ধ করে দেওয়া হয়। যদিও এরইমধ্যেই বাঙালি জাতিকে শায়েস্তা করার পূর্ব পরিকল্পনা চূড়ান্ত করে পাকিস্তান। আলোচনার নামে কালক্ষেপণের মধ্যেই খুব সম্ভবত ১৮ অথবা ১৯ মার্চ অপারেশান সার্চলাইটের অনুমোদন দেন ইয়াহিয়া খান। ২৫ মার্চ বিকেলে গোপনে ঢাকা ত্যাগের পরই শুরু হয়ে ইতিহাসের বর্বরতম হত্যাযজ্ঞের চূড়ান্ত প্রস্তুতি। ঢাকা থেকে কলম্বো হয়ে ইয়াহিয়া খানকে বহনকারী বিমান যখন মাঝ আকাশে তখন তিনি খবর পর ঢাকার বুকে শুরু হয়েছে ইতিহাসের বর্বরতম হত্যাযজ্ঞ। বসন্তের হিমহিম বাতাসে ঢাকা শহরে হালাকু খানের তাণ্ডব শুরু করেছে পাকিস্তানি সেনারা।

এখানে বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন। জুলফিকার আলী ভুট্টোর আত্মজীবনীভিত্তিক জুলফি ভুট্টো ওব পাকিস্তান : হিজ লাইফ এন্ড টাইমস্ (Zulfi Bhutto of Pakistan: His Life and Times) নামের একটি গ্রন্থ আছে। যার লেখক ছিলেন স্ট্যানলি ওয়ালপর্ট। ১৯৯৩ সালে প্রকাশিত গ্রন্থটিতে ফ্রি ইলেকশান এ্যান্ড বার্থ ওক বাংলাদেশ (১৯৭০-১৯৭১)

Free Elections and the Birth of Bangladesh (1970-1971) শিরোনামের একটি বড় অধ্যায় রয়েছে। কিন্তু খুবই অবাক করা বিষয় ২২ ফেব্রুয়ারি ১৯৭১ লারকনায় অনুষ্ঠিত সেই ষড়যন্ত্রের বৈঠক নিয়ে একটি বাক্যও বইটিতে নেই।

যদিও বইটির ১৮৭ পৃষ্ঠায় জুলফিকার আলী ভুট্টোর বিভিন্ন জনসভার বক্তৃতার বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, এমন পরিস্থিতিতে ঢাকায় ৩ মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন বসলে সেখানে পশ্চিম পাকিস্তানের প্রতিনিধিরা জিম্মি (hostages) হতে পরেন। এছাড়া এই পরিষদ কসাইখানায় (slaughter house) পরিণত হতে পারে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে ওই আলোচনায়।

যদিও এই ষড়যন্ত্রের আড়ালে পুরো বাংলাদেশকেই কসাইখানায় পরিণত করার যে নীলনকশা এগিয়ে চলছে সে বিষয়ে একটি শব্দও লেখা হয়নি গ্রন্থটিতে। যার আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়েছিল ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালরাতে।

(লেখক: সহকারী অধ্যাপক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়)

মতামত দিন

মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে

ট্রেন্ডিং ভিউজ