Views Bangladesh Logo

বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড

ভাঙা পাকিস্তানকে জোড়া লাগানোর চেষ্টা করেছিলেন ভুট্টো

Rahat  Minhaz

রাহাত মিনহাজ

১৯৭৪ সালের জুন মাসের শেষ সপ্তাহে ঢাকা সফরে এসেছিলেন পাকিস্তানি প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো। রাষ্ট্রীয় আচারের অংশ হলেও সে সময় ভুট্টো সাভার স্মৃতিসৌধে যেতে অপারগতা প্রকাশ করেছিলেন। তবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কঠোর অবস্থানে ১৯৭১ সালের শহীদদের শ্রদ্ধা জানাতে সেখানে যেতে বাধ্য হন ভুট্টো। তবে চতুর ভুট্টো দাপ্তরিক পোশাক নয়, স্মৃতিসৌধে যান টি-শার্ট আর গলফ টুপি পরে। তাঁর আপত্তি ছিল—সেখানে কোনো বিউগল বাজবে না, পুষ্পমাল্য অর্পণ করতে হবে না, থাকবে না কোনো গান স্যালুট! এই ছিলেন ভুট্টো। বাঙালি জাতি আর তাঁর বীর শহীদদের প্রতি এই ছিল তাঁর মনোভাব। আর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি ছিল সীমাহীন ক্ষোভ, ঘৃণা আর রাজনৈতিক ঈর্ষা।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়ার পর ভুট্টোর মনোভাব বা প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া কী ছিল, তার এক বর্ণনা পাওয়া যায় বেনজির ভুট্টোর জবানিতে। গবেষক মুনতাসির মামুন ও মহিউদ্দিন আহমেদ সম্পাদিত পাকিস্তানিদের দৃষ্টিতে একাত্তর বইয়ে এক সাক্ষাৎকারে বেনজির ভুট্টো বলেছেন, সেই রাতে (১৯৭৫, ১৫ আগস্ট) আমরা রাওয়ালপিন্ডির প্রধানমন্ত্রী ভবনে ছিলাম। বাবা (জুলফিকার আলী ভুট্টো) আমার দরজায় নক করলেন, আমাকে তাঁর ঘরে যেতে বললেন। বাবা বললেন, বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট তাঁদের লোকের হাতেই নিহত হয়েছেন। ঘটনাটা আমাদের কাছে খুবই মর্মান্তিক ও ভয়ঙ্কর মনে হলো। জানা গেল, তাঁর স্ত্রীকেও হত্যা করা হয়েছে। আস্তে আস্তে আমরা জানতে পারলাম, তাঁর শিশু সন্তানকেও খাটের নিচ থেকে বের করে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। আমরা খুবই শ্রদ্ধাভরে প্রবল আত্মবিশ্বাসী এক রাজনীতিক শেখ মুজিবকে স্মরণ করলাম।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যাকাণ্ড নিয়ে বেনজিরের এই বয়ানের সত্য-মিথ্যা যাচাইয়ের কোনো সুযোগ নেই। সাদা মনে যদি এই বর্ণনাকে সত্য বলে ধরেও নিই, সেই রাত পোহাতেই জুলফিকার আলী ভুট্টো যে সব পদক্ষেপ নেওয়া শুরু করেন, তা ছিল শোকগ্রস্ত হওয়ার সম্পূর্ণ বিপরীত। বরং স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের অস্তিত্ববিনাশী। নতুন করে ভাঙা পাকিস্তান জোড়া লাগানোর ব্যর্থ প্রচেষ্টা।

স্বাধীন বাংলাদেশের অস্তিত্ব মন থেকে কখনই মানতে চাননি ভুট্টো। এমনকি দেশ স্বাধীন হওয়ার পর নিউইয়র্ক থেকে ফেরার পথে লন্ডনে সাংবাদিকদের তিনি বলেছিলেন, বাংলাদেশ তখনও তাঁর দেশের অংশ। আর সেজন্যই হয়তো ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট শেখ মুজিব হত্যাকাণ্ডে উচ্ছ্বসিত ভুট্টো খন্দকার মোশতাক গংদের প্রতি দ্রুত সহযোগিতামূলক পদক্ষেপ নিতে কোনো ভাবনাচিন্তায় যাননি। তিনি ধরে নেন, এটাই সুবর্ণ সুযোগ।

১৬ আগস্ট পাকিস্তান সরকার নতুন সরকারকে সমর্থন জানিয়ে বিবৃতি দেয়, যাতে এই পরিবর্তনকে ঐতিহাসিক হিসেবে উল্লেখ করা হয়। ওই বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়, ‘বাংলাদেশের ভ্রাতৃপ্রতিম জনগণের প্রতি আমাদের প্রথম ও স্বতঃস্ফূর্ত শুভেচ্ছার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে আমি (ভুট্টো) পাকিস্তানের জনগণের পক্ষ থেকে ৫০ হাজার টন চাল, ১ কোটি গজ কাপড় ও ৫০ লক্ষ গজ সূতি কাপড় পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছি। ... বিশ্ববাসী জানুক আমরা সুখে-দুঃখে ঐক্যবদ্ধ। আমরা ইসলামী সম্মেলনের সব সদস্যদের (ওআইসি) এবং তৃতীয় বিশ্বের সদস্যদের নতুন সরকারকে স্বীকৃতি দেওয়ার অনুরোধ করছি।’

এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, ১৯৭৫ সালে সৌদি আরবের সঙ্গে পাকিস্তানের অত্যন্ত সুসম্পর্ক ছিল। শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পর বাংলাদেশকে স্বাধীন-সার্বভৌম দেশ হিসেবে স্বীকৃতি দেয় দেশটি। একই সঙ্গে সৌদি আরব মোশতাক সরকারের প্রতিও সমর্থন ঘোষণা করে। ১৭ আগস্ট সৌদি আরব ও অপর মুসলিম দেশ সুদানের বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়ার খবর ফলাও করে প্রচার করা হয়।


[ছবি: ১৭ আগস্ট সৌদি আরবের স্বীকৃতির কথা ফলাও করে প্রকাশ করে বাংলাদেশের গণমাধ্যম]


এটা ছিল ভুট্টো সরকারের প্রতিক্রিয়া। তবে চতুর ভুট্টো শুধু প্রতিক্রিয়া জানিয়েই বসে থাকেননি। তাঁর পরিকল্পনা ছিল আরও সুদূরপ্রসারী। হয়তো বাসনা ছিল ভাঙা পাকিস্তান আবারও জোড়া লাগানোর। তাঁর সেই স্বপ্নে হাওয়া দিয়েছিলেন খন্দকার মোশতাক। শেখ মুজিবকে দাফনের আগেই বাংলাদেশে নতুন করে পাকিস্তানিকরণ শুরু করেছিলেন খন্দকার মোশতাক।

১৯৭১ সালে যুদ্ধ চলাকালে বাংলাদেশে প্রধান সচিব ছিলেন শফিউল আজম। পাকিস্তানে থাকা এই আমলাকে মোশতাক ফিরিয়ে এনে দায়িত্ব দেন মন্ত্রিপরিষদ সচিবের। একইভাবে একাত্তরে পাকিস্তানিদের সেবা করা স্বরাষ্ট্র সচিব সালাউদ্দীনকে দেশে ফিরিয়ে এনে দায়িত্ব দেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের। পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থার সাবেক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা সফদারকে পাকিস্তান থেকে ফিরিয়ে এনে করা হয় এনএসআইয়ের প্রধান। পাকিস্তান পররাষ্ট্র দপ্তরের কর্মকর্তা তবারক হোসেনকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল পররাষ্ট্র সচিব হিসেবে। সবকিছু মিলিয়ে চলছিল সর্বাত্মক পাকিস্তানিকরণ।

১৯৭১-এর শেষ দিকে ইয়াহিয়া খানের কাছ থেকে ক্ষমতা নেওয়ার পর বন্দি মুজিবের কাছে ভুট্টো একটাই আকুতি জানিয়েছিলেন—যেকোনোভাবে, কোনো কাঠামোয় বজায় থাক পাকিস্তান। সে সময় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে বন্দি থাকা ড. কামাল আহমেদ বলেছেন, সে সময় যেকোনোভাবে পাকিস্তান টিকিয়ে রাখতে শুধু শেখ মুজিবুর রহমানের পা ধরা বাকি রেখেছিল ভুট্টো। শেখ মুজিবের প্রতি নামকাওয়াস্তে হলেও পাকিস্তানের সঙ্গে কনফেডারেশনে যুক্ত থাকার অনুরোধ ছিল ভুট্টোর। কিন্তু বঙ্গবন্ধু তাঁকে কোনো আশ্বাস দেননি। বরং ১০ জানুয়ারি দেশে ফিরেই পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছেন, বাংলাদেশ রক্তস্নাত এক স্বাধীন দেশ। সেখানে গণহত্যাকারী, খুনিদের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক থাকার সুযোগ নেই।

কিন্তু মুজিব হত্যাকাণ্ডের পর পুরনো সেই নীলনকশা নিয়ে আবার অগ্রসর হন ভুট্টো। হেডকোয়ার্টার স্থাপন করেন লন্ডনে। যার মূল দায়িত্ব দেন বাংলাদেশে জন্মগ্রহণকারী বর্ষীয়ান রাজনীতিক মাহমুদ আলীকে। এই মাহমুদ আলী পঞ্চাশের দশকে নতুন ধর্মনিরপেক্ষ দল গঠন করে আলোচনায় ছিলেন।

যাই হোক, এই প্রক্রিয়ায় মোশতাক গংদের ভূমিকাও কম ছিল না। যার বহিঃপ্রকাশ পাওয়া যায় পীর মহসিন আলী দুদু মিয়াকে পাকিস্তানে বিশেষ দূত করে পাঠানোয়। পীর মহসিন আলী দুদু মিয়া ছিলেন ডানপন্থী রাজনীতিক। পাকিস্তানের পেয়ারা বন্ধু। এই মহসিন আলীকে মোশতাক পাকিস্তানে পাঠান সম্পর্ক আরও জোরদার করতে। যা সফল করতে লন্ডনে মাহমুদ আলীর মাধ্যমে সব ধরনের চেষ্টা করেন ভুট্টো।


[ছবি: খন্দকার মোশতাক ও ভারতীয় হাইকমিশনার সমর সেন। শেখ মুজিব হত্যার পর ২০ আগস্ট মোশতাকের সঙ্গে সমর সেনের এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়]



ভুট্টো ও মোশতাক গংদের এই চেষ্টা কেন সফল হয়নি, তা নিয়ে নানা মত আছে। অনেকেই বলেন, বিদ্রোহী অফিসাররাই এ বিষয়ে পদক্ষেপ না নিতে মোশতাককে শাসিয়েছিল। সাংবাদিক এ্যান্থনি মাসকারেনহাস লিগ্যাসি অব ব্লাড বইতে লিখেছেন, ফারুক রহমান আমাকে (মাসকারেনহাস) বলেছিল, মোশতাক যদি এমন কিছু (পুনঃএকত্রীকরণ) করার চেষ্টা করত, তাহলে আমি তাঁর মাথা উড়িয়ে দিতাম।

এই তথ্য ছাড়া এই বিষয়ে খুব একটা জোরালো তথ্য-প্রমাণ পাওয়া যায় না। তবে অন্য বেশ কয়েকটি সূত্রে ভারতীয় ভূমিকার কথা জানা যায়। ১৫ আগস্ট ভারতীয় হাইকমিশনার সমর সেন দিল্লিতে ছিলেন। শেখ মুজিব হত্যার পর ঢাকার সঙ্গে বহির্বিশ্বের বিমান যোগাযোগ বন্ধ থাকায় তিনি সেখান থেকে কলকাতা হয়ে সড়কপথে ঢাকায় পৌঁছান ১৮ আগস্ট। এরপর জরুরি কিছু বৈঠক সেরে তিনি বঙ্গভবনে খন্দকার মোশতাকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।

অনেকেই উল্লেখ করেন, ওই সাক্ষাতের কিছু কথা বা প্রচ্ছন্ন হুমকির কারণেই মোশতাক বাংলাদেশকে ইসলামী প্রজাতন্ত্র হিসেবে ঘোষণা করতে পারেননি। এগোতেও পারেননি বাংলাদেশকে পাকিস্তানি পতাকাতলে আনার পরিকল্পনা নিয়ে।

২০১১ সালের ১৫ অক্টোবর কলকাতার দ্য স্টেটসম্যান পত্রিকার সম্পাদক মানস ঘোষ এই ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে একটি নিবন্ধ লিখেছিলেন। তাতে তিনি উল্লেখ করেন, বঙ্গভবনে গিয়ে সমর সেন মোশতাককে একটি কূটনৈতিক নোট পড়ে শোনান। তাতে লেখা ছিল, ‘যদি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের নাম পরিবর্তন করা হয় এবং কোনো দেশের সঙ্গে কনফেডারেশন গঠনের চেষ্টা করা হয়, তাহলে ভারতের কাছে থাকা বৈধ চুক্তির (বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী চুক্তি) অধীনে ভারতীয় সেনাবাহিনী যথাযথ ব্যবস্থা নেবে। কিন্তু আপনি যদি নাম পরিবর্তন বা তথাকথিত কনফেডারেশন গঠনের ধারণা থেকে বিরত থাকেন, তাহলে ভারত ১৫ আগস্ট যা-ই ঘটে থাকুক না কেন, তাকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ঘটনা হিসেবেই বিবেচনা করবে।’

সমর সেনের এ বক্তব্য শোনার পর দাঁড়িয়ে থাকা মোশতাক ধপ করে বসে পড়েন। খুব সম্ভবত এরপরই দপ করে নিভে যায় ভুট্টোর কনফেডারেশন বা পুনঃএকত্রীকরণের স্বপ্ন।


রাহাত মিনহাজ
সহকারী অধ্যাপক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

মতামত দিন

Avatar

ট্রেন্ডিং ভিউজ