বাংলাদেশ থেকে ইলিশ আসার খবরে উচ্ছ্বসিত পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিরা
বেশ কিছুদিন ধরেই পদ্মার ইলিশ নিয়ে বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে চলছিল টানাপোড়েন। এমনকি বিষয়টি গড়িয়েছিল কূটনৈতিক চাপান-উতোরে। সোশ্যাল মিডিয়াতেও তার প্রতিচ্ছবি দেখা গেছে। শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর বাংলাদেশের ইলিশ পশ্চিমবঙ্গে আসবে কি না, তা নিয়ে নানা জল্পনা চলছিল। এরই মধ্যে বাংলাদেশের ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার জানিয়েছিল, দুর্গাপূজা তথা উৎসবের মৌসুমে পশ্চিমবঙ্গে ইলিশ পাঠানো হবে না। ফলে বেশ মন খারাপ ছিল কলকাতা তথা পশ্চিবঙ্গের ইলিশপ্রেমীদের। অবশেষে শনিবার বাংলাদেশ সরকার জানিয়েছে, বাংলাদেশ থেকে ৩ হাজার মেট্রিক টন ইলিশ ঢুকবে পশ্চিমবঙ্গে। এই খবরে বেজায় খুশি এই বঙ্গের বাঙালিরা।
পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী অন্য বছরের মতো এ বছর ইলিশ পশ্চিম বাংলায় আসবে না বলেই জানানো হয়েছিল বাংলাদেশ সরকারের তরফে; কিন্তু শেষ মুহূর্তে কেন এই সিদ্ধান্ত বদল- তা নিয়েও জোর জল্পনা শুরু হয়েছে। ভারত ও বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক মজবুত করতেই এই সিদ্ধান্ত পরিবর্তন বলে মনে করছেন অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক।
ভারতে ইলিশ রপ্তানি বন্ধ হলে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কিছুটা হলেও চাপ পড়ত বলে অনেক বিশ্লেষকের মত। তাছাড়া দুই প্রতিবেশী দেশের সুসম্পর্ক বজায় রাখতে ইলিশ রপ্তানির নয়া সিদ্ধান্ত অনেকটাই কার্যকর হবে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একটা বড় অংশ মনে করছেন। অন্যদিকে বাংলাদেশের বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ফৈয়জ আহমেদ তৈয়বের মতো অনেকেই বাংলাদেশ সরকারকে পরামর্শ দিয়েছিলেন, ইলিশ পাঠিয়ে ভারত সরকারকে বন্ধুত্ব ও সৌহার্দের বার্তা দেয়া হোক। সেই পদক্ষেপই নিয়েছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার।
ভারতের ‘ফিশ ইম্পোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন’-এর পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, শারদোৎসবের জন্য অন্যান্য বছর সেপ্টেম্বরের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গে বাংলাদেশের ইলিশ চলে আসে; কিন্তু চলতি বছর ভারতে ইলিশ রপ্তানি বন্ধ ছিল। বাংলাদেশ সরকারের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদার কারণেই ভারতে ইলিশ রপ্তানি বন্ধ রাখা হয়েছে। যদিও শনিবার বাংলাদেশের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জারি করা বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, ভারতের যেসব মৎস্য ব্যবসায়ী বাংলাদেশ থেকে ইলিশ আমদানির জন্য আবেদন করেছিলেন, তাদের আর নতুন করে আবেদন করার প্রয়োজন নেই। শনিবার বাংলাদেশ সরকার ইলিশ পাঠানোর ছাড়পত্র দেয়ায় খুশির হাওয়া বইছে ‘ফিশ ইম্পোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন’-এ। সংগঠনের সম্পাদক সৈয়দ আনোয়ার মকসুদ বলেন, ‘মাছ আসছে নিশ্চিত। একটি জটিলতা তৈরি হয়েছিল। এখন সেই জটিলতা কেটে গিয়ে ইলিশ আসছে। আমরা খুশি। উৎসবের মৌসুমে পদ্মার ইলিশ এ বঙ্গের বাঙালির পাতে পড়বে।’
এর আগে ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দাবি করেছিল, ইলিশের মতো ‘ক্ষুদ্র ইস্যু’ ভারত-বাংলাদেশের কূটনৈতিক এবং অর্থনৈতিক সম্পর্কে কোনো প্রভাব ফেলবে না। সম্প্রতি ভারত থেকে ডিম আমদানির পরে আলু এবং পেঁয়াজ আমদানি করেছে বাংলাদেশ। শনিবার ইলিশ পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়। কূটনীতিবিদদের একাংশ মনে করছেন, দুদেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের উন্নতি ঘটাতে ইউনূস সরকারের এই পদক্ষেপ ফলপ্রসূ হবে।
অন্যদিকে ভারতে ইলিশ আসার খবর ছড়িয়ে পড়তেই পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিদের মধ্যে খুশির আমেজ। কলকাতা-সংলগ্ন অঞ্চল গড়িয়ার বাসিন্দা শংকর দে জানান, ‘পূজার আগে পদ্মার ইলিশ পাতে পড়বে এর থেকে আনন্দের খবর আর কী হতে পারে? অপেক্ষার অবসান ঘটতে চলেছে।’ অন্যদিকে সাহিত্যিক সঞ্জয় কুমার মুখোপাধ্যায় বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে যে পূজার আগে বাংলাদেশ থেকে ইলিশ পাঠানোর ঐতিহ্য ছিল, সেটা বজায় থাকছে দেখে ভালো লাগছে। এগুলো অনেকটা দুদেশের সম্পর্কেও প্রভাব ফেলে, এটা স্বাভাবিক। তবে যার শেষ ভালো তার সব ভালো।’ শিয়ালদহের কাছে বিবেকানন্দ রোডের ক্রসিংয়ে কলকাতার অন্যতম মাছ বাজারের মাছ বিক্রেতা শিবেন মাইতি বলেন, ‘ক্রেতারা অনেকদিন ধরেই খোঁজ নিচ্ছিলেন পদ্মার ইলিশের। এবার তাদের দিতে পারব। আমরাও খানিকটা লাভবান হবো। তবে মাছের দাম এখনই কিছু বলতে পারছি না।’

মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে