নরওয়ের স্বপ্নভঙ্গে লেখা হলো ইংলিশ পুনরুত্থানের কাব্য
প্রথমার্ধেই শেলদেরুপের গোলে স্বপ্নের সিঁড়িতে পা রেখেছিল নরওয়ে। কিন্তু ভেঙে পড়েনি ইংল্যান্ড। বিরতির আগে বেলিংহামের সমতাসূচক গোল, এরপর ৫৫ মিনিটে হেগেমের গোল ভিএআরে বাতিল হওয়ার নাটকীয়তা পেরিয়ে ম্যাচ গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে। ঠিক সেখানেই আবার জ্বলে ওঠেন বেলিংহাম; দ্বিতীয় গোলে থামিয়ে দেন নরওয়ের রূপকথা। ব্রাজিল-বধের বিস্ময় উপহার দেওয়া নরওয়ের স্বপ্নভঙ্গের বিপরীতে এভাবেই লেখা হলো ইংল্যান্ডের পুনরুত্থানের এক কাব্য।
দীর্ঘ ১২০ মিনিটের রুদ্ধশ্বাস লড়াই শেষে নরওয়েকে ২-১ গোলে হারিয়ে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল নিশ্চিত করেছে ইংল্যান্ড। বাংলাদেশ সময় রোববার ভোররাতে মায়ামির হার্ড রক স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত কোয়ার্টার ফাইনালের এই ম্যাচে নির্ধারিত ৯০ মিনিটে ১-১ ব্যবধানে সমতা থাকার পর অতিরিক্ত সময়ে জোড়া গোল করে দলকে জয় এনে দেন মিডফিল্ডার জুড বেলিংহাম। এই জয়ে সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের প্রতিপক্ষ হবে আর্জেন্টিনা-সুইজারল্যান্ড কোয়ার্টার ফাইনালের বিজয়ী দল।
ম্যাচের ৩৭তম মিনিটে প্রথম এগিয়ে যায় নরওয়ে। মাঝমাঠের কাছাকাছি এলাকায় ইংল্যান্ড অধিনায়ক হ্যারি কেইনের কাছ থেকে বল কেড়ে নেওয়ার পরের মুহূর্তে ঢিলে হয়ে যাওয়া বল নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নিখুঁত শটে জালে জড়ান আন্দ্রেয়াস শেল্ডেরুপ। কেইনকে ফাউল করা হয়েছিল কি না তা নিয়ে ইংলিশ শিবিরে প্রতিবাদ উঠলেও রেফারি খেলা চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত বহাল রাখেন। তবে পিছিয়ে পড়েও দমে যায়নি ইংল্যান্ড। প্রথমার্ধের যোগ করা সময়ের দ্বিতীয় মিনিটে নরওয়ের রক্ষণভাগ বল সম্পূর্ণ ক্লিয়ার করতে ব্যর্থ হলে সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে দারুণ স্থিরতায় বল নিয়ন্ত্রণ করে সমতাসূচক গোল করেন বেলিংহাম। বিরতিতে যায় দুই দল ১-১ সমতা নিয়ে।
দ্বিতীয়ার্ধের ৫৫তম মিনিটে কর্নার থেকে তৈরি হওয়া আক্রমণে ইংল্যান্ডের রক্ষণের নজর এড়িয়ে বক্সের মাঝে ফাঁকা অবস্থায় বল পেয়ে বাঁ পায়ের শটে জর্ডান পিকফোর্ডকে পরাস্ত করেন টরবিয়র্ন হেগেম। তবে উদ্যাপনের মধ্যেই ভিএআরের সংকেত পান রেফারি; আক্রমণের শুরুতে আর্লিং হালান্ডের ফাউলের প্রমাণ মেলায় দুই মিনিট পর গোলটি বাতিল ঘোষণা করা হয়, ম্যাচ থেকে যায় ১-১ ব্যবধানেই। এরপর নির্ধারিত ৯০ মিনিট ও যোগ করা অতিরিক্ত সময় শেষেও কোনো দল জয়সূচক গোলের দেখা না পাওয়ায় ম্যাচ গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে।
অতিরিক্ত সময়ের প্রথমার্ধের একেবারে শেষ মুহূর্তে, ম্যাচের ৯৩তম মিনিটে (৯২ মিনিট ৩৪ সেকেন্ডে) আবারও জ্বলে ওঠেন বেলিংহাম। দ্রুতগতির এক দলীয় আক্রমণে নরওয়ের রক্ষণের ফাঁক কাজে লাগিয়ে বক্সের মাঝখানে বল পেয়ে ডান পায়ের নিচু শটে গোলরক্ষককে পরাস্ত করেন তিনি। প্রথমার্ধে সমতাসূচক গোলের পর অতিরিক্ত সময়ে আবারও দলের ত্রাতা হয়ে ওঠেন এই মিডফিল্ডার, যা তাকে এনে দেয় ম্যাচের জোড়া গোল এবং ইংল্যান্ডকে ২-১ ব্যবধানে এগিয়ে দেয়।
এই গোলের পরও স্বস্তিতে ছিল না ইংল্যান্ড। অতিরিক্ত সময়ের ১০১তম মিনিটে বক্সের ভেতর ফাউলের দাবিতে পেনাল্টির ইঙ্গিত দেওয়া হলেও ভিএআর পর্যালোচনার পর সেই দাবি নাকচ হয়ে যায়, স্বস্তি পায় নরওয়ে। এরপর ১০৫তম মিনিটে ক্লান্তির কারণে তারকা স্ট্রাইকার হালান্ডকে তুলে ইয়র্গেন স্ট্র্যান্ড লারসেনকে নামান কোচ সোলবাক্কেন, শেষ ১৫ মিনিটে আক্রমণে নতুন গতি আনার চেষ্টা করেন তিনি। কিন্তু শেষদিকে বল দখলে রেখে খেলার গতি কমিয়ে আনা ইংল্যান্ডের সুশৃঙ্খল রক্ষণ ভাঙতে পারেনি নরওয়ে। যোগ করা সময়ে মরগান রজার্স কর্নার ফ্ল্যাগের কাছে বল ধরে রেখে মূল্যবান সময় নষ্ট করেন, আর শেষ বাঁশি বাজতেই সেমিফাইনালের টিকিট নিশ্চিত হয়ে যায় ইংল্যান্ডের।
পুরো ম্যাচে বলের নিয়ন্ত্রণ ও আক্রমণের সংখ্যায় সামান্য এগিয়ে ছিল ইংল্যান্ড, বিশেষ করে দ্বিতীয়ার্ধে বল দখলে রেখে খেলার টেম্পো নিয়ন্ত্রণ করার কৌশল কাজে দিয়েছে তাদের। নরওয়ে বরং কাউন্টার অ্যাটাক ও সেট পিসে বেশি ধারালো ছিল; হেগেমের গোল বাতিল হওয়া এবং শুরুর দিকে সোরলথ-হালান্ডের ২ বনাম ১ পরিস্থিতি তৈরি করেও তা কাজে লাগাতে না পারা দেখিয়ে দেয়, ফিনিশিংয়ে আরেকটু নিখুঁত হলে ফলাফল ভিন্নও হতে পারত। ইংল্যান্ডের রক্ষণভাগ, বিশেষত জন স্টোনস ও মার্ক গুয়েহি জুটি, বেশ কয়েকবার হালান্দ-সোরলথের আক্রমণ প্রতিহত করে দলকে বিপদমুক্ত রাখে। অন্যদিকে গোলরক্ষক জর্ডান পিকফোর্ড ও ওরিয়ান নিল্যান্ড দুজনেই একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সেভ করে নিজ নিজ দলকে ম্যাচে টিকিয়ে রাখেন।
ম্যাচে দুই দলের কোচই বেশ কয়েকটি কৌশলগত পরিবর্তন আনেন। নরওয়ে ৬০ মিনিটে রাইয়ারসনের বদলে আউর্সনেস, ৬৮ মিনিটে একসঙ্গে সোরলথ ও শেল্ডেরুপের বদলে বব ও নুসাকে নামায়, ৯০ মিনিটে মোলার ভোলফের বদলে পেডারসেন এবং অতিরিক্ত সময়ে ক্লান্ত হালান্দের বদলে স্ট্র্যান্ড লারসেনকে মাঠে নামানো হয়। ইংল্যান্ডের পক্ষে ৭১ মিনিটে গর্ডনের বদলে রিস জেমস, ৮৬ মিনিটে ও'রাইলির বদলে স্পেন্স এবং ৮৯ মিনিটে কনসার বদলে মরগান রজার্সকে নামান কোচ টমাস টুখেল; শেষ এই পরিবর্তনটিই ম্যাচ শেষের মুহূর্তে সময় ক্ষেপণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
সারা ম্যাচে বেশ কয়েকটি ফাউলের ঘটনা ঘটলেও কোনো দলই লাল কার্ড দেখেনি, ফলে পুরো সময় ১১ জনে খেলার সুযোগ পায় উভয় দল। নরওয়ের রাইয়ারসন ও আজেরের ফাউলে একাধিকবার বিপজ্জনক জায়গা থেকে ফ্রি কিক আদায় করে ইংল্যান্ড, আবার নরওয়েও ননি মাদুয়েকের হ্যান্ডবলের সুবাদে ফ্রি কিক পায়। ম্যাচে মোট ফাউল ও হলুদ কার্ডের নির্ভরযোগ্য অফিসিয়াল সংখ্যা এখনো ফিফার পরিসংখ্যান পাতায় হালনাগাদ হয়নি বলে নিশ্চিত পরিসংখ্যান দেওয়া যাচ্ছে না, তবে ম্যাচ রেফারি একাধিকবার ভিএআরের সহায়তা নিয়েছেন; একবার নরওয়ের গোল বাতিলে, আরেকবার ইংল্যান্ডের পেনাল্টির দাবি খারিজ করতে।
ফিফার অফিসিয়াল লাইভ ডেটা অনুযায়ী, প্রথমার্ধে বলের দখলে স্পষ্ট আধিপত্য দেখায় ইংল্যান্ড। ৬৯ শতাংশ সময় বল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখে তারা, বিপরীতে নরওয়ের দখলে ছিল মাত্র ২৫ শতাংশ সময়, বাকি ৬ শতাংশ সময় ছিল দুই দলের মধ্যে বিতর্কিত। তবে বল দখলে পিছিয়ে থেকেও আক্রমণে বেশি কার্যকর ছিল নরওয়ে। প্রথমার্ধে তারা মোট পাঁচটি শট নেয়, যার তিনটি ছিল লক্ষ্যে; অন্যদিকে ইংল্যান্ড নেয় চারটি শট, লক্ষ্যে ছিল দুটি। পুরো ম্যাচে মোট ফাউলের সংখ্যা ছিল তুলনামূলক কম, শুরুর দিকে গণনা অনুযায়ী প্রথমার্ধেই আটটি ফাউল হয়; যার পাঁচটি করে নরওয়ে, তিনটি ইংল্যান্ড।
শৃঙ্খলার দিক থেকে ম্যাচটি ছিল বেশ পরিচ্ছন্ন। পুরো ১২০ মিনিটে কোনো দলই লাল কার্ড দেখেনি, ফলে শেষ পর্যন্ত ১১ জনে খেলেই ম্যাচ শেষ করে দুই দল। ম্যাচে একমাত্র হলুদ কার্ডটি দেখেন নরওয়ের ডিফেন্ডার ক্রিস্টফার আয়ের, অতিরিক্ত সময়ে পিকফোর্ডের সঙ্গে সংঘর্ষের পর রেফারির সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানানোর জন্য। পেনাল্টি প্রসঙ্গে ম্যাচে দুটি উল্লেখযোগ্য ভিএআর হস্তক্ষেপ দেখা যায়। ৫৫ মিনিটে হেগেমের গোল হালান্দের ফাউলের কারণে বাতিল হয়, আর অতিরিক্ত সময়ের ১০১ মিনিটে ইংল্যান্ডের একটি পেনাল্টির দাবিও পর্যালোচনার পর নাকচ হয়ে যায়। অর্থাৎ ম্যাচে কোনো দলই পেনাল্টি থেকে গোল করার সুযোগ পায়নি।
এই ম্যাচে জোড়া গোল করে চলতি বিশ্বকাপে নিজের গোলসংখ্যা বাড়িয়ে নিলেন বেলিংহাম, যিনি ইতিমধ্যে মেক্সিকো ম্যাচেও জোড়া গোল করে ইংল্যান্ডের হয়ে এক আসরে চার গোল করা প্রথম মিডফিল্ডারের রেকর্ড গড়েছিলেন। আজকের এই দুই গোলের পর তার তালিকা আরও দীর্ঘ হলো, যা তাকে এই বিশ্বকাপে ইংলিশ মিডফিল্ডারদের মধ্যে সর্বোচ্চ গোলদাতায় পরিণত করেছে। অন্যদিকে নরওয়ের বিদায় ঘটলেও তাদের এই যাত্রা ইতিহাসে লেখা থাকবে সোনালি অক্ষরে; নিজেদের প্রথম বিশ্বকাপ কোয়ার্টার ফাইনালে পা রেখেই দল থামল, তবে ব্রাজিলকে হারিয়ে যে চমক তারা দেখিয়েছিল, তা দীর্ঘদিন মনে রাখবে ফুটবলবিশ্ব।
এই জয়ে ১৯৬৬ সালের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ইংল্যান্ড টানা দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের শেষ চারে জায়গা করে নিল। প্রসঙ্গত, ১১ জুলাই তারিখটি ইংলিশ ফুটবলের জন্য দীর্ঘদিন দুঃস্মৃতির প্রতীক ছিল; ২০১৮ সালের এই দিনে বিশ্বকাপ সেমিফাইনালে ক্রোয়েশিয়ার কাছে এবং ২০২১ সালের এই দিনে ইউরো ফাইনালে ইতালির কাছে হেরেছিল থ্রি লায়ন্স। এবার সেই অভিশপ্ত তারিখেই (স্থানীয় সময় অনুযায়ী) জয় ছিনিয়ে নিয়ে পুরনো দুঃস্মৃতি মুছে ফেলার একটি বার্তা দিল ইংল্যান্ড।
কোয়ার্টার ফাইনাল পেরিয়ে সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের প্রতিপক্ষ হবে আর্জেন্টিনা ও সুইজারল্যান্ডের মধ্যকার ম্যাচের বিজয়ী দল। হ্যারি কেইন ও জুড বেলিংহামের যুগলবন্দিতে ভর করে টমাস টুখেলের দল এখন তাকিয়ে আছে শিরোপার আরও কাছাকাছি পৌঁছানোর স্বপ্নে।
মতামত দিন