Views Bangladesh Logo

সিয়াটলের নাটকীয় রাতে সেনেগালের কান্না, শেষ ষোলোয় বেলজিয়াম

Sports Desk

ক্রীড়া ডেস্ক

বিশ্বকাপের এবারের আসরে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে নাটকীয় ম্যাচের সাক্ষী হলো সিয়াটল। দুই গোলে পিছিয়ে থেকেও অতিরিক্ত সময়ের শেষ মুহূর্তে পেনাল্টি থেকে গোল করে ৩-২ ব্যবধানে জিতে শেষ ষোলোয় জায়গা করে নিয়েছে বেলজিয়াম। এই হৃদয়বিদারক হারে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিতে হলো সেনেগালকে।

ম্যাচের ২৫তম মিনিটে দীর্ঘ এক আক্রমণ পর্বের সমাপ্তি টেনে সেনেগালকে এগিয়ে নেন হাবিব দিয়ারা। দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে, ৫১তম মিনিটে ব্যবধান দ্বিগুণ করেন ইসমাইলা সার। দুই গোলে পিছিয়ে পড়ে বিপাকে পড়া বেলজিয়ামের কোচ রুডি গার্সিয়া তখন এক সাহসী সিদ্ধান্ত নেন; তারকা খেলোয়াড় কেভিন ডি ব্রুইনা ও জেরেমি দোকুকে তুলে নিয়ে নতুন খেলোয়াড় নামান মাঠে। আর সেই ঝুঁকিপূর্ণ পরিবর্তনই বদলে দেয় ম্যাচের গতিপথ।

৮৬তম মিনিটে বক্সের ভেতর জায়গা করে নিয়ে নিখুঁত ফিনিশিংয়ে ব্যবধান কমান রোমেলু লুকাকু। এরপর মাত্র তিন মিনিট পরই, ৮৯তম মিনিটে প্রতিপক্ষের রক্ষণের ভুলের সুযোগ নিয়ে সমতাসূচক গোলটি করেন ইউরি টিলেমান্স। মাত্র চার মিনিটের ব্যবধানে দুই গোল হজম করে হতভম্ব হয়ে পড়ে সেনেগাল, ম্যাচ গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে।

অতিরিক্ত সময়ের প্রথমার্ধে সুযোগ তৈরি করেও কাজে লাগাতে পারেনি কোনো দল। থমাস মুনিয়েরের একটি শট পোস্টে লেগে ফিরে আসে, লিয়ান্দ্রো ত্রোসার ও লুকাকুর প্রচেষ্টাও রুখে দেন সেনেগালের গোলরক্ষক মোরি জিয়াও। অন্যদিকে সেনেগালও শেষ চেষ্টা চালায়- ইদ্রিসা গায়ের একটি দূরপাল্লার শট সামান্যের জন্য লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়, ইব্রাহিম বায়ের একটি প্রচেষ্টাও যায় বাইরে দিয়ে।

নাটকের ইতি ঘটেনি তখনো। ম্যাচের একেবারে শেষ দিকে ডোডি লুকেবাকিওর একটি শট ক্রসবারের ওপরের অংশে লেগে ফিরে আসে, যা প্রায় নিশ্চিত করে দিচ্ছিল বেলজিয়ামের জয়। এরপরই মাঠে নামে বিতর্কের ছায়া- লামিন কামারার ট্যাকলে বক্সের কাছে পড়ে যান টিলেমান্স, রেফারি প্রথমে খেলা চালিয়ে গেলেও ভিএআর পর্যালোচনার পর অতিরিক্ত সময়ের ১২৫তম মিনিটে বেলজিয়ামকে পেনাল্টির নির্দেশ দেন। এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানায় সেনেগালের খেলোয়াড়েরা, মাঠে কিছুক্ষণের জন্য বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিও তৈরি হয়।

দীর্ঘ প্রতিবাদ ও পর্যালোচনার পর অবশেষে স্পট-কিক নিতে আসেন টিলেমান্সই। ঠান্ডা মাথায় গোলরক্ষককে ভুল দিকে পাঠিয়ে বল জালের ওপরের ডান কোণায় জড়িয়ে দেন তিনি। এই গোলেই নিশ্চিত হয়ে যায় বেলজিয়ামের ৩-২ ব্যবধানের রোমাঞ্চকর জয়।

শেষ মুহূর্তে সমতা ফেরানোর মরিয়া চেষ্টায় সেনেগাল একটি পেনাল্টির আবেদনও তোলে নিকোলাস রাসকিনের হ্যান্ডবলের অভিযোগে, তবে রেফারি মার্টিনেজ জানান ফাউলটি বক্সের বাইরে হয়েছে। এরপর পাওয়া ফ্রি-কিক থেকে পাপে সারের নেওয়া শট ক্রসবারের অনেক ওপর দিয়ে চলে যায়, আর তাতেই শেষ হয়ে যায় সেনেগালের বিশ্বকাপ স্বপ্ন।

ম্যাচজুড়ে আক্রমণের ধার ও সুযোগ তৈরির দিক থেকে বেশ কিছুটা এগিয়ে ছিল বেলজিয়াম, বিশেষ করে নিয়মিত সময়ের শেষদিক থেকে অতিরিক্ত সময় পর্যন্ত তারা প্রতিপক্ষের ওপর ক্রমাগত চাপ ধরে রাখে। বিপরীতে সেনেগাল ম্যাচের বড় একটা সময় দাপট দেখালেও শেষরক্ষা করতে পারেনি অভিজ্ঞতা ও মানসিক দৃঢ়তার ঘাটতিতে।

ম্যাচ শেষে ফিফার অফিসিয়াল পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ৩-২ গোলের জয়ী বেলজিয়াম বল দখলে সামান্য এগিয়ে ছিল ৫৩-৪৭ ব্যবধানে এবং মোট ২১টি শট নিয়েছে, যার মধ্যে লক্ষ্যে ছিল ৫টি, লক্ষ্যের বাইরে গেছে ১০টি ও প্রতিহত হয়েছে ৬টি; বিপরীতে সেনেগাল নিয়েছে ১৯টি শট, যার ৫টি লক্ষ্যে, ১১টি লক্ষ্যভ্রষ্ট ও ৩টি ব্লক হয়েছে।

গোলরক্ষকদের নৈপুণ্যেও ছিল সমানে সমান লড়াই। বেলজিয়ামের গোলরক্ষক ৩টি সেভ করেছেন, সেনেগালের গোলরক্ষক করেছেন ২টি সেভ। কর্নার আদায়ে এগিয়ে ছিল বেলজিয়াম (৪-২), তবে ফ্রি কিক আদায়ে স্পষ্ট এগিয়ে ছিল সেনেগাল (২২-১১)। ফাউলের সংখ্যায় বেলজিয়াম করেছে ২১টি ও সেনেগাল ১১টি ফাউল, যা বলে দেয় ম্যাচের শারীরিক লড়াইয়ের তীব্রতা কতটা ছিল।

উভয় দলই একটি করে হলুদ কার্ড দেখেছে, কোনো লাল কার্ড দেখানো হয়নি এই ম্যাচে। অফসাইডের ফাঁদে দুই দলই পড়েছে সমান দুইবার করে, আর নিয়মিত সময় ও অতিরিক্ত সময় মিলিয়ে উভয় দলই ব্যবহার করেছে ৬টি করে পরিবর্তন, যা প্রমাণ করে দীর্ঘ ১২০ মিনিটের এই লড়াইয়ে দুই কোচই কতটা কৌশলী পরিবর্তন এনেছিলেন দলে।

এই জয়ে ইতিহাস গড়ার অপেক্ষায় থাকা সেনেগালের স্বপ্নভঙ্গ হলো সবচেয়ে বেদনাদায়কভাবে। দুই গোলের লিড নিয়েও শেষ পর্যন্ত মাঠ ছাড়তে হলো খালি হাতে। অন্যদিকে সময়মতো বড় সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং বদলি খেলোয়াড়দের দুর্দান্ত পারফরম্যান্সেই বেলজিয়াম প্রমাণ করল, কেন তাদের অভিজ্ঞ ও শক্তিশালী দল বলা হয়।

মতামত দিন

Avatar

ট্রেন্ডিং ভিউজ