Views Bangladesh Logo

স্বাধীনতা জাদুঘর এখনও তালাবদ্ধ

Misbah  Jamil

মিসবাহ জামিল

দুষ্কৃতকারীদের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত এবং ধ্বংসস্তুপে পরিণত হওয়া স্বাধীনতা জাদুঘর এখনও রয়েছে তালাবদ্ধ অবস্থায়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট একদল বিক্ষুব্ধ ব্যক্তি বাংলাদেশের প্রথম এবং একমাত্র ভূগর্ভস্থ এই জাদুঘরটিতে হামলা চালিয়ে ব্যাপক ভাংচুর ও লুটপাট চালায়। সেই ঘটনার পর প্রায় ১৯ মাস অতিবাহিত হওয়ার পরেও ঐতিহ্যবাহী এই জাদুঘরটি এখনো ‘পরিত্যক্ত’ ও বন্ধ রয়েছে।

বুধবার, ২৫ মার্চ, সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে অবস্থিত জাদুঘরটি রয়েছে তালাবদ্ধ অবস্থায়। ভেতরে ঢুকে জাদুঘরের বর্তমান অবস্থা দেখতে চাইলে সেখানে থাকা নিরাপত্তাকর্মীরা বলেন, ‘আপনারা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলেন। কর্তৃপক্ষ অনুমতি দিলে আমরা খুলে দিতে পারব। চাবি তাদের হাতে। আমাদের কিছু করার নাই।’

বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের অধীনে পরিচালিত হতো স্বাধীনতা জাদুঘর। সেখানে গিয়ে অনুসন্ধান করলে দু'জন কর্মকর্তা বলেন, ‘এ বিষয়ে যারা বলতে পারবেন, তারা এখন অফিসে নাই। রোববারে আসলে পাবেন। কাল ২৬শে মার্চ, কাল পাওয়া যাবে না।’ সেই কর্মকর্তাদের নাম ও পদবি জানতে চাইলে তারা এড়িয়ে যান। পরে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের ফোন নম্বর চাইলে, তারা সে বিষয়টিও এড়িয়ে যান।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০১৫ সালে বাংলাদেশের ৪৪তম স্বাধীনতা দিবসে স্বাধীনতা জাদুঘর জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের অধীনে পরিচালিত হয় এটি। জাদুঘরটিতে মুঘল শাসনামল থেকে ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের বিজয় দিবস পর্যন্ত বিভিন্ন ঘটনার নিদর্শন ছিল।

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বরের সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তের স্মারক হিসেবে জাদুঘরে সংরক্ষিত ছিল একটি বিশেষ রেপ্লিকা—যে টেবিলে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডার আমির আবদুল্লাহ খান নিয়াজি আত্মসমর্পণের দলিলে স্বাক্ষর করেছিলেন। এর পাশাপাশি মুক্তিযোদ্ধাদের ব্যবহৃত কামানের অংশসহ আরও নানা মূল্যবান নিদর্শন সেখানে স্থান পেয়েছিল, যা স্বাধীনতা যুদ্ধের স্মৃতি বহন করত। এখানে ১৪৪টি কাচের প্যানেলে তিন শতাধিক ঐতিহাসিক আলোকচিত্র ছিল। টেরাকোটা ও যুদ্ধের ঘটনা-সংবলিত বিভিন্ন সংবাদপত্রের কাটিংও ছিল। এছাড়া আন্তর্জাতিক পত্রিকাগুলোতে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে প্রকাশিত সংবাদের প্রতিলিপি এবং মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বহির্বিশ্বে প্রচারের জন্য তৈরি করা পোস্টারও সংরক্ষিত ছিল। কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মুখে আওয়ামী লীগের পতন হলে সেখানে হামলা ও ভাঙচুর চালিয়ে এসব গুরুত্বপূর্ণ দলিলাদি লুট ও ধ্বংস করা হয়। স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাস্কর্যসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শনেরও কোনো কিছুই অক্ষত রাখা হয় না।

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের স্বাধীনতা স্তম্ভে ঘুরতে আসা হেনা রহমান ভিউজ বাংলাদেশকে বলেন, 'জামায়াত-শিবির ও স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি এখানে হামলা ও ভাঙচুর চালিয়েছে। এখানে তাদের ও পাকিস্তানিদের অপকর্মের নানা ডকুমেন্টস ছিল। সেগুলো ধ্বংস করতেই এখানে আক্রমণ করেছে। তারা মুক্তিযুদ্ধকে ভুলিয়ে দিতে চায়। স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বকে নস্যাৎ করতে চায়।'

উদ্যানে ঘুরতে আসা আমিনুল ইসলাম পাপন ভিউজ বাংলাদেশকে বলেন, 'মহান মুক্তিযুদ্ধ আমাদের গৌরবের জিনিস। একটা সরকার পতনের আন্দোলনকে মুক্তিযুদ্ধের সমকক্ষ দেখানোর চেষ্টা করছে স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি। তারাই এখানে ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে। আমাদের ইতিহাস মুছে দিতে চেয়েছে। এখনো সে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।'

পাপন স্বাধীনতা জাদুঘর সংস্কার করে পুনরায় চালু দাবি জানান এবং এটি ভাঙচুরে জড়িতদের আইনের আওতায় এনে বিচার নিশ্চিতের দাবি করেছেন।

এদিকে, গত বছরের ১৩ নভেম্বর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের স্বাধীনতা জাদুঘরের দেয়ালে পুনরায় ভাঙচুর চালায় একদল উগ্র তরুণ। ওইদিন বিকেলে ২৫-৩০ জনের একটি দল লাঠি ও হাতুড়ি-শাবল নিয়ে উদ্যানের মধ্যবর্তী এলাকায় স্বাধীনতা জাদুঘরের ওপরের অংশে থাকা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাস্কর্যসহ আরো অনেক শিল্পকর্ম ভাঙচুর করে। ভাস্কর্যটি ১৯৭১ সালের ঐতিহাসিক ৭ মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বঙ্গবন্ধুর দেওয়া ভাষণের একটি প্রতিলিপি। এতে তাকে বক্তৃতারত অবস্থায় দেখা যেত। দেয়ালভাস্কর্যটির সামনে ঐতিহাসিক ভাষণের গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা—‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’ খোদাই করা ছিল।

গতবছর জাদুঘটি সংস্কার এবং পূণরায় চালুর ব্যাপারে প্রশ্ন করলে তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক উপদেষ্টা ফারুক-ই-আজম সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ৫ আগস্টে হামলা-ভাঙচুরে ক্ষতিগ্রস্ত মুক্তিযুদ্ধের স্থাপনাগুলো সংস্কার করা হবে। কিন্তু, পরবর্তীতে তা বাস্তবায়ন করা হয় নি।

বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের উপ-কীপার (ইতিহাস ও ধ্রুপদী শিল্পকলা বিভাগ) ও স্বাধীনতা জাদুঘরের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. গোলাম কাউছারের সঙ্গে একাধিকবার ফোনে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। ফলে এ বিষয়ে তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।

সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা আফসানা মিমি ভিউজ বাংলাদেশকে বলেন, 'স্যাররা (মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী) গত মাসের ১৭ তারিখে মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নিয়েছেন, সব বিষয় তারা বুঝে উঠতে পারেননি। তারা প্রতিটি বিষয় জানার চেষ্টা করছেন। এটা নিয়ে এখন পর্যন্ত কোনো আলোচনা হয়নি। গতকাল মন্ত্রী মহোদয় চট্টগ্রামে অবস্থিত জিয়া স্মৃতি জাদুঘর পরিদর্শন করেছেন, ওটা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে পর্যায়ক্রমে হয়তো-বা সবকিছু নিয়েই পরিকল্পনা করা হবে।'

স্বাধীনতা জাদুঘরে আক্রমণ ও ক্ষয়ক্ষতির ওপরে তদন্ত হয়েছে কি না? ভাঙচুরকারীদের বিরুদ্ধে তদন্ত ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না? কবে এটি সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হতে পারে?- এসব প্রশ্নে তিনি বলেন, 'এ ব্যাপারে আমি কিছু বলতে পারব না। মাননীয় মন্ত্রী মহোদয় যেদিন জয়েন করেছেন, আমিও সেদিন জয়েন করেছি। এটা নিয়ে কোনো আলোচনা আমার সঙ্গে হয়নি। কোনো ইস্যু চোখে পড়েনি।'

স্বাধীনতা জাদুঘর বাংলাদেশের প্রথম এবং একমাত্র ভূগর্ভস্থ জাদুঘর। জাদুঘর প্লাজা ৫ হাজার ৬৬৯ বর্গমিটার টাইলস দিয়ে আবৃত। বাংলাদেশি স্থপতি কাশেফ মাহবুব চৌধুরী ও মেরিনা তাবাসসুম ১৯৯৭ সালে একটি জাতীয় স্থাপত্য নকশা প্রতিযোগিতা জয়ের মাধ্যমে এই প্রকল্পের কাজের দায়িত্ব পান। ৬৭ একর জায়গাজুড়ে বিস্তৃত পুরো প্রকল্পটির নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় ১৭৫ কোটি টাকা।

এখানে বৃত্তকার একটি ঘরের মাঝখানে ছিল একটি জলাধার। সেখানে ফোকর দিয়ে অবিরাম পানি পড়ত, যা লাখো শহীদের মা এবং নির্যাতনের শিকার নারীদের অশ্রুকে নির্দেশ করে। ‘অশ্রুপাত’ নামে এ ফোয়ারা এখন বন্ধ। লাঠির জোরে 'অশ্রুপাত' বন্ধ করে দিলেও হাজারো স্বাধীনতাপ্রেমী বাংলাদেশির হৃদয়ের রক্তক্ষরণের কারণ এই তালাবদ্ধ স্থাপনাটি।

মতামত দিন

মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে

ট্রেন্ডিং ভিউজ