জিন তাড়ানোর নামে যৌন নিপীড়ন: লন্ডনে বাংলাদেশি ইমামের যাবজ্জীবন
একাধিক নারী ও ১২ বছর বয়সী শিশুসহ বেশ কয়েকজন কিশোরীকে ধারাবাহিকভাবে যৌন নিপীড়নের দায়ে পূর্ব লন্ডনের একটি মসজিদের সাবেক ইমাম বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত আব্দুল হালিম খানকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন যুক্তরাজ্যের আদালত। আদালতের রায় অনুযায়ী, ৫৪ বছর বয়সী এই ব্যক্তিকে কমপক্ষে ২০ বছর কারাগারে কাটাতে হবে।
২০০৫ থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে স্থানীয় মুসলিম সম্প্রদায়ের সাতজন ভুক্তভোগীর ওপর এই পাশবিক হামলা চালান খান। অভিযোগ রয়েছে, ধর্মীয় পদের প্রভাব খাটিয়ে এবং বিশ্বাসের অমর্যাদা করে তিনি এই অপরাধগুলো সংঘটিত করেন। গত ফেব্রুয়ারিতে স্নারসব্রুক ক্রাউন কোর্ট তাকে ধর্ষণ, যৌন হয়রানি এবং শিশুদের ওপর যৌন নিপীড়নসহ মোট ২১টি অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করেন।
সাজা ঘোষণার সময় বিচারক লেসলি কাথবার্ট আব্দুল হালিম খানের কর্মকাণ্ডকে ‘ মুসলিম বিশ্বাসের ইচ্ছাকৃত বিকৃতি’ হিসেবে বর্ণনা করেন। বিচারক তাকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘আপনার হাতে উল্লেখযোগ্য ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব ছিল, যা আপনি কেবল নিজের বিকৃত যৌন লালসা মেটানোর জন্য পদ্ধতিগতভাবে অপব্যবহার করেছেন।’
আদালত পর্যবেক্ষণে বলেছেন, খান পরিকল্পিতভাবে বাংলাদেশি মুসলিম সম্প্রদায়ের নারী ও শিশুদের লক্ষ্যবস্তু বানাতেন, কারণ তিনি জানতেন সামাজিক অবস্থানের কারণে ভুক্তভোগীরা লোকলজ্জার ভয়ে মুখ খুলতে সাহস পাবে না। বিচারক আরও যোগ করেন, খান নিজেকে ধরাছোঁয়ার বাইরে মনে করতেন এবং আত্মবিশ্বাসী ছিলেন যে কেউ অভিযোগ করলেও মানুষ তাকেই বিশ্বাস করবে।
মামলার বিবরণী থেকে জানা যায়, অত্যন্ত চতুরতার সঙ্গে ভুক্তভোগীদের ওপর আধিপত্য বিস্তার করতেন খান। প্রসিকিউশন ব্যারিস্টার সারাহ মরিস কেসি জানান, খান তার ভুক্তভোগীদের বিশ্বাস করাতেন যে তাদের শরীরে ‘জিন’ রয়েছে এবং সেগুলো তাড়ানোর নামে তিনি তাদের ওপর যৌন নির্যাতন চালাতেন। অনেক ক্ষেত্রে তিনি নিজেকে ‘জ্বিন দ্বারা আবিষ্ট’ হওয়ার নাটক করতেন এবং মুখ খুললে ‘কালো জাদু’র মাধ্যমে ভুক্তভোগী বা তাদের পরিবারের বড় ধরনের ক্ষতি এমনকি মৃত্যুর ভয়ও দেখাতেন। এক কিশোরী ভুক্তভোগীকে তিনি বলেন, তার জরায়ুতে ক্যান্সার হয়েছে এবং একমাত্র তিনিই তা সারাতে পারেন; এই অজুহাতে তাকে নির্জন স্থানে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণ করেন।
আদালতে সাক্ষ্য দেওয়ার সময় একজন ভুক্তভোগী কান্নায় ভেঙে পড়েন এবং বলেন, ‘খান কোনো মানুষ নয়, সে শয়তানের প্রতিরূপ। ধর্মীয় লেবাসের আড়ালে সে মিথ্যা ও কারসাজির মাধ্যমে আমাদের মধ্যে ভীতি ছড়িয়ে দিয়েছিল।’ অন্য একজন ভুক্তভোগী এই নির্যাতনের ট্রমা সইতে না পেরে আত্মহত্যা করার চেষ্টা করেছিলেন বলেও আদালতকে জানান তিনি।
দীর্ঘ শুনানির পর আদালত তাকে নয়টি ধর্ষণ মামলা, চারটি যৌন হয়রানি, অনূর্ধ্ব ১৩ বছর বয়সী শিশুদের ধর্ষণের পাঁচটি অভিযোগসহ মোট ২১টি ধারায় সাজা প্রদান করেন। তবে চাঞ্চল্যকর এই মামলার রায় ঘোষণার আগে এই অপরাধী ও ভণ্ড ইমামের পক্ষে তার পরিবার এবং সম্প্রদায়ের কিছু সদস্য আদালত বরাবর সমর্থনের চিঠি জমা দিয়েছিলেন।

মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে