গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সূচকে ভারত-পাকিস্তানের চেয়ে এগিয়ে বাংলাদেশ
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গণমাধ্যম ও সাংবাদিকতার স্বাধীনতা গত কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছেছে। সম্প্রতি চলতি বছরের গণমাধ্যম স্বাধীনতা সূচক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্স’ (আরএসএফ)। তবে আশার বিষয় হলো, এ সূচকে এশিয়ার মধ্যে ভারত ও পাকিস্তানের তুলনায় বাংলাদেশ উন্নত অবস্থানে রয়েছে। দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা গেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, স্বাধীনতা সূচকে ৩৩.৫০ স্কোর নিয়ে ১৫২তম স্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। ৩২.৬১ স্কোর নিয়ে ১৫৩তম স্থানে পাকিস্তান এবং ৩১.৯৬ স্কোর নিয়ে ১৫৭তম স্থানে রয়েছে ভারত। এছাড়া একই স্কোর (৩৩.৫০) নিয়ে ভুটান রয়েছে ১৫০তম স্থানে।
সর্বশেষ প্রকাশিত এই বার্ষিক প্রতিবেদনে বৈশ্বিকভাবে গণমাধ্যমের স্বাধীনতার ক্রমাবনতির চিত্র উঠে এসেছে। ১৮০টি দেশের তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি 'ওয়ার্ল্ড প্রেস ফ্রিডম ইনডেক্স'-এ গত ২৫ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন গড় স্কোর রেকর্ড করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইতিহাসে এই প্রথমবারের মতো বিশ্বের অর্ধেকেরও বেশি দেশে সংবাদপত্রের স্বাধীনতার অবস্থা ‘কঠিন’ অথবা ‘অত্যন্ত গুরুতর’ বলে চিহ্নিত হয়েছে। ২০০২ সালে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ মানুষ সংবাদপত্রের স্বাধীনতার দিক থেকে ‘ভালো’ অবস্থানে থাকা দেশে বাস করত; সেই হার এখন নাটকীয়ভাবে কমে ১ শতাংশেরও নিচে নেমে এসেছে।
সংবাদপত্রের স্বাধীনতা পরিমাপে মূলত পাঁচটি ক্ষেত্র— অর্থনৈতিক, আইনি, নিরাপত্তা, রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতি— বিবেচনায় নেওয়া হয়। চলতি বছর এর মধ্যে ‘আইনি পরিবেশের’ সবচেয়ে বেশি অবনতি ঘটেছে।
আরএসএফ জানিয়েছে, বিভিন্ন দেশের সরকার সংবাদমাধ্যমের কণ্ঠরোধ করতে ক্রমবর্ধমান হারে ‘নিবর্তনমূলক আইনি হাতিয়ার’, বিশেষত জাতীয় নিরাপত্তা আইনের অপব্যবহার করছে। সংস্থাটি সতর্ক করে বলেছে, গত ২৫ বছর ধরে গণতান্ত্রিক দেশগুলোতেও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ক্রমাগত সংকুচিত হচ্ছে এবং সাংবাদিকতাকে ক্রমশ ‘অপরাধ’ হিসেবে গণ্য করার প্রবণতা বাড়ছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে নিয়মিত আক্রমণকে ‘পদ্ধতিগত নীতি’ হিসেবে বর্ণনা করেছে আরএসএফ। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্র ৭ ধাপ পিছিয়ে ৬৪তম স্থানে নেমে গেছে। ইকুয়েডর ও পেরুতেও উল্লেখযোগ্য অবনতি দেখা গেছে।
অন্যদিকে, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে সন্ত্রাসবাদ ও চরমপন্থাবিরোধী আইন ব্যবহার করে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা দমনে ‘বিশেষজ্ঞ’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। দেশটিতে বর্তমানে ৪৮ জন সাংবাদিক কারাগারে বন্দি রয়েছেন।
গত বছরের তুলনায় ২ ধাপ এগিয়ে যুক্তরাজ্য ১৮তম স্থানে উঠে এসেছে। তবে ২০২৪ সালে লন্ডনে ইরান ইন্টারন্যাশনালের এক সাংবাদিকের ওপর ছুরিকাঘাতের ঘটনা নিরাপত্তা ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ জিইয়ে রেখেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, টানা ১০ বছর ধরে তালিকার শীর্ষে রয়েছে নরওয়ে। অন্যদিকে, টানা তিন বছর ধরে সর্বশেষ (১৮০তম) স্থানে রয়েছে ইরিত্রিয়া। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে বাশার আল-আসাদ সরকারের পতনের পর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের ফলে সিরিয়া সূচকে ৩৬ ধাপ এগিয়ে ১৭৭তম থেকে ১৪১তম স্থানে উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনে আরও জানানো হয়, নাইজার ৩৭ ধাপ পিছিয়ে ১২০তম স্থানে নেমেছে। এছাড়া ২০২৫ সালে সাংবাদিক তুর্কি আল-জাসারকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়াসহ সাংবাদিকদের ওপর অব্যাহত সহিংসতার কারণে সৌদি আরবের অবস্থান ১৪ ধাপ নিচে নেমেছে।
২০২৬ সালের সূচকে ভারতের অবস্থানের আরও অবনতি ঘটেছে। ২০২৫ সালে ১৫১তম স্থানে থাকলেও এবার ৬ ধাপ পিছিয়ে ভারত ১৫৭তম স্থানে নেমে গেছে। ৩১.৯৬ স্কোর নিয়ে দেশটি এখন সংবাদপত্রের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে ‘অত্যন্ত গুরুতর’ শ্রেণিভুক্ত।
প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় ভারতের অবস্থান এখন অনেকটাই নিচে। তালিকায় নেপাল ৮৭তম, মালদ্বীপ ১০৮তম, শ্রীলঙ্কা ১৩৪তম, ভুটান ১৫০তম, বাংলাদেশ ১৫২তম এবং পাকিস্তান ১৫৩তম স্থানে রয়েছে। তবে ভারত এখনও মিয়ানমার (১৬৬তম), আফগানিস্তান (১৭৫তম) ও চীনের (১৭৮তম) চেয়ে এগিয়ে আছে।

মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে