বছর সমাপনী
২০২৩ সালে বিশ্বে ডেঙ্গুতে মৃত্যুর এক-তৃতীয়াংশই বাংলাদেশে
বিদায়ী ২০২৩ সালে স্বাস্থ্যখাতে গোটা দেশে ভীতিকর অবস্থা দেখা গেছে। স্বাধীনতার পর এই প্রথমবারের মতো ডেঙ্গুর প্রকোপ ছিল বছরজুড়ে। ২০২৩ সালের প্রথম থেকে ৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত বিশ্বে সাড়ে পাঁচ হাজার মানুষের মৃত্যু ঘটেছে। এর মধ্যে ২৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত এক হাজার ৬৯৭ জনের প্রাণ গেছে কেবল বাংলাদেশেই।
এই চিত্র এতটাই ভয়াবহ ছিল যে দেশের স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ ডেঙ্গু প্রতিরোধে টিকা প্রয়োগের চিন্তা-ভাবনা করছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোভিড-১৯ মহামারির পর একটা ভালো পরিস্থিতি আসবে বলে ভাবা হয়েছিল। কিন্তু তার পরই ডেঙ্গুর হানা স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষকে আরেক পরীক্ষায় ফেলে দিয়েছে। তাদের মতে, জাতীয় পর্যায়ে সুষ্ঠু পরিকল্পনার অভাব এই রোগ সামলানোর কাজটাকে অনেক কঠিন করেছে।
সূত্রমতে, ২০২৩-এর ২৪ ডিসেম্বরের মধ্যে দেশের বিভিন্ন শহরে ডেঙ্গুতে প্রাণ গেছে এক হাজার ৬৯৭ জন মানুষের। এই সংখ্যা ২০২২ সালে ডেঙ্গুতে মৃত্যুর (২৮১ জন) ছয়গুণ এবং ২০১৯ সালের (১৭০ জনের মৃত্যু) দশগুণ।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের (ডিজিএইচএস) তথ্যে জানা যায়, ২০২৩ সালের ২৪ ডিসেম্বরের মাঝে তিন লাখ ২০ হাজার ৪৬০ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন বলে রেকর্ড হয়। ভয়ের খবরটি হলো, এদের মধ্যে কেবল ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনেই ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা ছিল এক লাখ ৯ হাজার ৮১৭। বাকি দুই লাখ ১০ হাজার ৬৪৩ জন ডেঙ্গু রোগীর অবস্থান ঢাকার বাইরে।
মূলত ২০২২ সালে ডেঙ্গু তার ভয়াল থাবা বিস্তার করে। কিন্তু সেই সময় দেশজুড়ে করোনা মোকাবেলায় টিকা দান কর্মসূচি চলছিল। ফলে রোগটির এই ভয়াবহতা মনোযোগের আড়ালেই থেকে যায়। তবে দিন যাওয়ার সঙ্গে ডেঙ্গু ক্রমশই দুশ্চিন্তার বিষয়ে হয়ে ওঠে।
গেল বছর দেশে মানুষের মাঝে ডেঙ্গু নিয়ে অভূতপূর্ব আতঙ্ক বিরাজ করছিল। রোগী ভর্তির জন্য হাসপাতালগুলোতে কোনো শয্যা খালি ছিল না। এ রোগের ওষুধ এবং ডাব, মাল্টার মতো প্রয়োজনীয় খাবারের দাম বেড়ে যায়।
বৈশ্বিক পরিস্থিতির দিকে দৃষ্টি মেললেই দেখা যায়, সবখানেই ডেঙ্গুর প্রকোপ বেড়েছে এবং ২০২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র ডেঙ্গুতে ৮০ শতাংশ রোগী বৃদ্ধি রেকর্ড করে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) অনুসারে, ২৯ লাখ ডেঙ্গু আক্রান্ত নিয়ে শীর্ষে অবস্থান করে ব্রাজিল। আর তিন লাখেরও বেশি রোগী নিয়ে দ্বিতীয়তে ছিল বাংলাদেশ। এখানে শঙ্কার বিষয় হলো, ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সংখ্যা সর্বোচ্চ ছিল বাংলাদেশে। বিশ্বে ডেঙ্গুতে আক্রান্তদের ৩৫ শতাংশের মৃত্যু ঘটেছে।
সেভ দ্য চিলড্রেন জানায়, বিশ্বে ২০২৩ সালে ৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত ডেঙ্গুতে সাড়ে পাঁচ হাজার মানুষের মৃত্যু ঘটেছে। ডেঙ্গুতে মৃত্যু তুলনামূলক সবচেয়ে বেশি ঘটেছে বাংলাদেশ, পেরু এবং বুরকিনা ফাসোতে। আর সর্বাধিক আক্রান্তের রেকর্ড মেলে ব্রাজিলে।
বাংলাদেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, এটি মূলত শহরাঞ্চলে বেশি ছড়িয়েছে, বিশেষ করে ঢাকার দুই সিটিতে। আইইডিসিআর-এর সাবেক গবেষক এবং উপদেষ্টা ড. মোহাম্মদ মুশতাক হোসেন বলেন, ডেঙ্গুর বিস্তার আর শহরে আবদ্ধ নেই, বিশেষ করে কেবল ঢাকা শহরে। গ্রামেও এর বিস্তার ঘটেছে। এখন ঢাকা ও ঢাকার বাইরে ডেঙ্গু আক্রান্তের অনুপাত প্রায় সমান।
তারপরও রাজধানী শহরে ডেঙ্গুর কিছু হটস্পট রয়েছে। তবে শেষ হওয়া বছরটাতে ঢাকার আনাচে কানাচে থেকেও ডেঙ্গু আক্রান্তের খবর আসছে। আবার দেখা গেছে, হাসপাতালের দুই কিলোমিটারের মাঝে ৮৬ শতাংশ ডেঙ্গু রোগীর বসবাস। কাজেই এমন আরও আক্রান্ত রয়েছেন যাদের চিহ্নিত করা যায়নি। পাশাপাশি রোগটি তাদের মৌসুম-ভিত্তিক আনাগোনা পাল্টে ফেলেছে। অর্থাৎ, এখন নির্দিষ্ট কোনো সময়ে ডেঙ্গুর প্রকোপ দেখা যায় না। এটি বছরজুড়ে হানা দিয়ে চলেছে।
ডিজিএইচএস-এর সংক্রামক ব্যাধি বিশেষজ্ঞ এবং সাবেক পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রণ) প্রফেসর ড. বে-নজীর আহমেদ জানান, কোভিডের সময়ের মতো দেশের স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ এবং প্রশাসনের সমন্বিত পরিকল্পনা দরকার। ডেঙ্গু মোকাবেলায় তাদের সহযোগিতামূলক উদ্যোগই আরেকটি হতাশাজনক বছর থেকে আমাদের বাঁচাতে পারে। এর সঙ্গে মশা ধ্বংসে স্থানীয় সরকার কাঠামোর কার্যকর পোকা দমন পদ্ধতি গ্রহণ করা প্রয়োজন। তা ছাড়া মশা নিয়ে প্রচুর গবেষণাও অনিবার্য। এতে এডিস মশার যেকোনো পরিবর্তন সহজে শনাক্ত করা সম্ভব হবে।
আইইডিসিআর-এর পরিচালক প্রফেসর ড. তাহমিনা শিরিন জানান, তারা সাধারণত রোগের সেরোটাইপের দিকে নজর দেন। গেল বছর বেশিরভাগ ঘটনা 'ডেন৩' এবং 'ডেন' সেরোটাইপের কারণে ঘটেছে। ফলে মৃত্যু সংখ্যাও বেড়েছে।
ডিজিএইচএস-এর রোগ নিয়ন্ত্রণ বিভাগের পরিচালক প্রফেসর ড. নজরুল ইসলাম বলেন যে, ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার কোনো বিকল্প নেই। কোভিড মহামারিতে এই ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যবিধির সুফল মানুষ পেয়েছে এবং এর কারণেই করোনা সংক্রমণের হার অনেক কমে এসেছিল। এতে ডেঙ্গু বিস্তারকারী মশার প্রজনন স্থানও কমে আসবে।

মতামত দিন
মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে