ভূরাজনীতির নতুন মানচিত্রে বাংলাদেশ: আত্মমর্যাদা, বাস্তববাদ ও কূটনীতির নতুন অধ্যায়
একটি রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির প্রকৃত পরীক্ষা হয় সে কাকে বিরোধিতা করছে, তা দিয়ে নয়; বরং কতটা দক্ষতার সঙ্গে নিজের জাতীয় স্বার্থকে এগিয়ে নিতে পারছে, তা দিয়ে।
আন্তর্জাতিক রাজনীতির ইতিহাসে শক্তির ভারসাম্য কখনো স্থির থাকেনি। সাম্রাজ্যের উত্থান-পতন হয়েছে, জোট বদলেছে, নতুন মিত্রতা গড়ে উঠেছে, পুরোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতার অবসান ঘটেছে। কিন্তু একটি বিষয় কখনো বদলায়নি-জাতীয় স্বার্থ। যে রাষ্ট্র পরিবর্তিত বিশ্ববাস্তবতার সঙ্গে নিজেকে খাপ খাইয়ে নিজের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে পারে, ইতিহাসে তারাই টিকে থাকে এবং প্রভাব বিস্তার করে।
আজকের বিশ্ব দ্রুত বহুমেরুকেন্দ্রিক বাস্তবতার দিকে এগোচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র এখনো অন্যতম প্রধান শক্তি হলেও চীনের অর্থনৈতিক উত্থান, ভারতের ক্রমবর্ধমান প্রভাব, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অর্থনৈতিক সংহতি এবং বৈশ্বিক দক্ষিণের নতুন আত্মবিশ্বাস আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে নতুন রূপ দিচ্ছে। এই পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক কূটনৈতিক তৎপরতাকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এগুলো এমন এক কৌশলগত রূপান্তরের ইঙ্গিত, যেখানে বাংলাদেশ ধীরে ধীরে অনুসারীর অবস্থান থেকে বেরিয়ে এসে নিজের স্বার্থ নির্ধারণে আরও সক্রিয় ভূমিকা নিতে চাইছে।
সিঙ্গাপুরের প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রনায়ক লি কুয়ান ইউ একবার বলেছিলেন, আন্তর্জাতিক সম্পর্কে চিরস্থায়ী বন্ধু বা শত্রু বলে কিছু নেই; চিরস্থায়ী হলো জাতীয় স্বার্থ। বর্তমান বিশ্ববাস্তবতায় এই কথাটিই বাংলাদেশের জন্য বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক।
সম্প্রতি বাংলাদেশের কূটনৈতিক উদ্যোগে নতুন গতি লক্ষ করা যাচ্ছে। বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ, নতুন অর্থনৈতিক অংশীদারত্বের সন্ধান এবং একাধিক দেশের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারের প্রচেষ্টা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, পররাষ্ট্রনীতি আরও ভারসাম্যপূর্ণ ও বহুমাত্রিক করার চেষ্টা চলছে। একই সময়ে প্রতিবেশী দেশগুলোর কূটনৈতিক আচরণেও পরিবর্তনের আভাস দেখা যাচ্ছে, যা বাংলাদেশের কৌশলগত গুরুত্ব বৃদ্ধির প্রতিফলন হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে।
বর্তমান বিশ্বে বহুল আলোচিত একটি ধারণা হলো ভিয়েতনামের ‘বাঁশ কূটনীতি’। বাঁশ যেমন ঝড়ে নুয়ে পড়ে, কিন্তু ভেঙে যায় না, তেমনি ভিয়েতনামও একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক গড়ে তুলেছে, অন্যদিকে চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সহযোগিতা বজায় রেখেছে। একই সঙ্গে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ইউরোপ ও অন্যান্য শক্তির সঙ্গেও তাদের সম্পর্ক বিস্তৃত হয়েছে। এই ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতির ফলেই যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশ আজ বিশ্বের দ্রুততম বর্ধনশীল অর্থনীতির অন্যতম।
বাংলাদেশের জন্যও এখানেই গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা রয়েছে। কোনো একটি শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা যেমন ঝুঁকিপূর্ণ, তেমনি অকারণ বৈরিতাও রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর। আধুনিক কূটনীতির মূল শক্তি হলো ভারসাম্য রক্ষা। তাই মালয়েশিয়া, চীন, ভারত, জাপান, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে সম্পর্ক সম্প্রসারণই হওয়া উচিত বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি কৌশল।
বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান তাকে একটি বিশেষ সুবিধা দিয়েছে। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে অবস্থিত এই দেশটি এখন ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বঙ্গোপসাগরকে ঘিরে সামুদ্রিক বাণিজ্য, জ্বালানি নিরাপত্তা, নীল অর্থনীতি, সরবরাহব্যবস্থা এবং আঞ্চলিক যোগাযোগের গুরুত্ব প্রতিনিয়ত বাড়ছে। ফলে বাংলাদেশের কৌশলগত মূল্যও আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি।
বিশ্বব্যাপী উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থা পুনর্গঠনের ফলে বহু বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান চীনের বাইরে বিকল্প উৎপাদনকেন্দ্র খুঁজছে। ভিয়েতনাম এই সুযোগের বড় অংশ কাজে লাগিয়েছে। বাংলাদেশও তা পারবে, যদি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, আইনের শাসন, দক্ষ প্রশাসন এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা যায়।
তবে কূটনীতির সাফল্য কেবল রাষ্ট্রপ্রধানদের সফর বা আনুষ্ঠানিক ঘোষণায় সীমাবদ্ধ নয়। প্রকৃত সাফল্যের মাপকাঠি হলো কত বিনিয়োগ এল, কত কর্মসংস্থান সৃষ্টি হলো, কত প্রযুক্তি স্থানান্তর ঘটল এবং সাধারণ মানুষের জীবনমান কতটা উন্নত হলো।
মার্কিন কূটনীতিক হেনরি কিসিঞ্জার বলেছিলেন, পররাষ্ট্রনীতি মূলত অভ্যন্তরীণ নীতিরই আন্তর্জাতিক রূপ। অর্থাৎ দেশের ভেতরের সক্ষমতাই শেষ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তার অবস্থান নির্ধারণ করে। দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, দক্ষ মানবসম্পদ এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা-এসবই একটি সফল পররাষ্ট্রনীতির ভিত্তি।
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কও এই বাস্তবতার বাইরে নয়। ভিসা জটিলতা, সীমান্তে উত্তেজনা, তিস্তার পানিবণ্টন ও বাণিজ্য বৈষম্যের মতো বিষয় দুই দেশের সম্পর্কে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনার বিষয়। তবে আন্তর্জাতিক রাজনীতির একটি মৌলিক সত্য হলো-কোনো রাষ্ট্র কূটনৈতিক শূন্যতায় অবস্থান করে না। যখন একটি দেশ তার বিকল্প অংশীদারত্ব বিস্তৃত করে, তখন অন্য রাষ্ট্রগুলিও তার গুরুত্ব নতুনভাবে উপলব্ধি করতে বাধ্য হয়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও সেই বাস্তবতার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে।
এটিকে কারও পরাজয় বা বিজয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এটি এমন এক বাস্তবতার স্বীকৃতি, যেখানে বাংলাদেশকে আর সহজে উপেক্ষা করা সম্ভব নয়।
বিশ্ব রাজনীতির সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহও একই বার্তা দেয়। সৌদি আরব ও ইরানের সম্পর্ক পুনঃস্থাপন, ব্রিকসের সম্প্রসারণ, বৈশ্বিক দক্ষিণের ক্রমবর্ধমান প্রভাব এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অর্থনৈতিক সংহতি দেখিয়ে দিচ্ছে-রাষ্ট্রগুলো এখন আদর্শগত বিভাজনের চেয়ে অর্থনৈতিক সহযোগিতাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। একবিংশ শতাব্দীর সফল রাষ্ট্রগুলো সংঘাতের বদলে সংযোগ, প্রতিযোগিতার পাশাপাশি অংশীদারত্ব এবং আধিপত্যের পরিবর্তে পারস্পরিক স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎও এই বাস্তবতার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। চীন থেকে বিনিয়োগ, জাপান থেকে অবকাঠামো, যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রযুক্তি, ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে রপ্তানি বাজার, মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানি ও বিনিয়োগ, ভারত থেকে আঞ্চলিক সংযোগ এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া থেকে নতুন অর্থনৈতিক সুযোগ-সবগুলোকে সমন্বিতভাবে কাজে লাগাতে পারলে বাংলাদেশ একটি কার্যকর মধ্যম শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে।
এই যাত্রায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আত্মমর্যাদা। আত্মমর্যাদা মানে অহংকার নয়, আত্মবিশ্বাস; বিচ্ছিন্নতা নয়, সমতার ভিত্তিতে সহযোগিতা; কারও বিরোধিতা নয়, নিজের জাতীয় স্বার্থকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরার সক্ষমতা।
বাংলাদেশ এখন সেই শিক্ষাই ধীরে ধীরে আয়ত্ত করছে। সামনে অনেক চ্যালেঞ্জ, সীমাবদ্ধতা ও অনিশ্চয়তা রয়েছে। কিন্তু সম্ভাবনাও কম নয়। যদি জাতীয় স্বার্থ, বাস্তববাদ, অর্থনৈতিক কূটনীতি এবং সার্বভৌম সমতার নীতি ধারাবাহিকভাবে অনুসরণ করা যায়, তাহলে আগামী দশকে বাংলাদেশ শুধু দক্ষিণ এশিয়ার নয়, সমগ্র ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও কৌশলগত অংশীদার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।
সেদিন বাংলাদেশের কূটনীতির পরিচয় হবে না কোনো শক্তির ছায়ায় অবস্থান করা; বরং নিজস্ব সক্ষমতা, আত্মবিশ্বাস এবং দূরদর্শিতার ভিত্তিতে বিশ্বমঞ্চে স্বতন্ত্র অবস্থান গড়ে তোলা। তখনই প্রমাণিত হবে—একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি তার ভৌগোলিক আয়তনে নয়; বরং তার আত্মমর্যাদা, প্রজ্ঞা এবং জাতীয় স্বার্থ রক্ষার সক্ষমতায় নিহিত।
মতামত দিন