Views Bangladesh Logo

শুভ নববর্ষ ১৪৩১

বৈশাখী উৎসব ও অঙ্গীকার

Mofidul  Hoque

মফিদুল হক

ছর ঘুরে যখন আসে বৈশাখ, দিন-ক্ষণ-মাস ও বর্ষ গণনার সমাজ-প্রবর্তিত রীতি হিসেবেই, তবে তার তো রয়েছে প্রাকৃতিক মাত্রা। ঋতুচক্র ও পৃথিবীর সূর্য প্রদক্ষিণ পালা শেষ আমাদের জানিয়ে দেয় বৈশাখের তথা নতুন বছরের আগমনী বার্তা। সমাজবদ্ধ মানুষ জীবনের সঙ্গে বোঝাপড়া করে যে বিকাশ ঘটায়, তৈরি করে গোষ্ঠী-সম্প্রদায় ও জাতিগতভাবে, সেখানে খুঁজে পায় বিশিষ্টতা, জীবনের পথে চলবার বাড়তি প্রেরণা, অভিজ্ঞতা হালনাগাদ করার তাগিদ। সেই উৎসব যখন পালিত হয় সর্বজনীনভাবে, তখন তা হয়ে ওঠে শক্তি, ব্যক্তির সমাজের ও জাতির জন্য। প্রকৃতিজাত বৈশাখ তাই অনন্য ও বিকল্পহীন, ধারণ করে বিপুল শক্তি ও সম্ভাবনা। চিরায়ত এই উৎসব হতে পারে ক্রম প্রসারমান, আধুনিক এবং ভবিষ্যৎমুখী।

বাঙালির বৈশাখী উৎসব, পার্বত্য জনগোষ্ঠীর সাকরাইন তথা বৈসাবী অথবা ইরানিদের আফগানদের নওরোজ উৎসব তাই বৈচিত্র্য ধারণ করে মিলিত হয় একই সূত্রে, স্ব-ধর্ম ও সংস্কৃতি বজায় রেখে তো বটেই বরং আরও জোরদার করে। অথচ বাঙালি আর বৈশাখ নিয়ে ধর্মান্ধ সংকীর্ণ মানস থেকে হিংসা বিদ্বেষ কম ছড়ানো হয়নি। এর মূলে ছিল পাকিস্তানি সাম্প্রদায়িক দ্বিজাতি-তত্ত্ব, যা বাঙালির জাতি-পরিচয় মুছে দিয়ে ধর্ম-পরিচয়কে সর্বব্যাপী করে তুলতে সচেষ্ট হয়েছিল এবং রাষ্ট্র ক্ষমতা ব্যবহার করে জবরদস্তিভাবে তা চাপিয়ে দিতে চেয়েছিল। অথচ ষড়ঋতুর দেশ বাংলায় বৈশাখ তো প্রাকৃতিক ঘটনা, এ প্রকৃতির যারা সন্তান, নদী ধোয়া পলিমাটির দেশে হাজার বছরের সভ্যতার ধারায় অভিন্ন ভাষাসূত্রে একত্রে চলছে যাদের জীবনযাত্রা, তাদের ধর্মবৈচিত্র্য অক্ষুণ্ণ রেখেই আবার তারা বাংলার প্রকৃতির সন্তান হিসেবে জীবনযুদ্ধে রত থাকেন। খুব সহজভাবে কথাগুলো বলেছেন বহু ভাষাবিদ ইসলামী চিন্তাবিদ ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ পাকিস্তানি জমানার একেবারে গোড়ায় ১৯৪৮ সালের ডিসেম্বরে ঢাকায় আয়োজিত সাহিত্য সম্মেলনে। তিনি বলেছিলেন, ‘আমরা হিন্দু বা মুসলমান যেমন সত্য, তার চেয়ে বেশি সত্য আমরা বাঙালি। মা প্রকৃতি নিজের হাতে আমাদের চেহারা ও ভাষায় বাঙালিত্বের এমন ছাপ মেরে দিয়েছেন যে, মালাতিলক-টিকিতে কিংবা টুপি-লুঙ্গি-দাড়িতে ঢাকবার জো টি নেই।’

মানবজীবনে ধর্ম যেমন সত্য, জাতিসত্তাও তেমনি, উভয়ের মধ্যে বিরোধের কোনো অবকাশ নেই; কিন্তু ধর্মকে ব্যবহার করে, কুতর্ক তৈরি করে যখন জাতিসত্তাকে আঘাত করা হয়, তখন আমাদের অবশ্যই সতর্ক হতে হবে, তেমনি হতে হবে প্রতিরোধে সবল। আজকের দিনে বৈশাখ আমাদের সেই ডাক দিয়ে যায়। বাঙালির সংস্কৃতিতে যা কিছু শ্রেষ্ঠ তার প্রতিফলন রয়েছে বাংলা বর্ষপঞ্জিকায়। পৃথিবীতে অনেক ভাষার, অনেক সংস্কৃতির, অনেক জাতির বসবাস। তাদের সবারই যে নিজস্ব পঞ্জিকা বা বর্ষ গণনার রীতি রয়েছে, তা নয়। যাদের আবার ছিল নিজস্ব বর্ষপঞ্জিকা, দেখা গেছে ব্যবহার কমতে কমতে তা এমনভাবে বিলুপ্ত হয়েছে যে, এর আর কোনো হদিস করা যায় না। ঐতিহাসিক অথবা গবেষকরা পুরোনো পাণ্ডুলিপি কিংবা স্মারক দেখে এর পরিচয় জানতে পারেন; কিন্তু সাধারণ জীবনের সঙ্গে তার আর কোনো যোগ খুঁজে পাওয়া যায় না। তাই বাঙালির যে রয়েছে নিজস্ব বর্ষগণনা রীতি এবং তা জীবনের সঙ্গে প্রাসঙ্গিক হয়ে আছে, এটা আমাদের এক বড় পাওয়া; কিন্তু তার চেয়েও বড় কথা বাঙালির এই বর্ষপঞ্জিকা রাজ-রাজড়াদের পক্ষ থেকে প্রবর্তিত হলেও এর সঙ্গে সাধারণ মানুষের জীবনের ছিল ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। ফসলের উৎপাদন ও খাজনা আদায়ের হিসাবপত্রের সুবিধার জন্যই এর প্রবর্তন। তাই মহারাজের দরবার থেকে এর যাত্রা শুরু হলেও অবলম্বন ছিল গ্রামবাংলার ফসল উৎপাদনের ধারা।

রাজার প্রাসাদ আর ফসলের ক্ষেত একসূত্রে গেঁথে বাংলা বর্ষ গণনার যাত্রা। তবে এর বাইরে আরেক যে বৈশিষ্ট্য বাংলা বর্ষপঞ্জিকে একান্তভাবে আলাদা করে তুলেছে সেটা বাংলার সংস্কৃতির বৈশিষ্ট্যের প্রতিফলন। আমরা জানি দিল্লির বাদশাহ আকবর বাংলা বর্ষপঞ্জির প্রবর্তন করেছিলেন। যে কোনো বর্ষগণনা শুরু করতে হলে তার একটি যাত্রাবিন্দু প্রয়োজন হয়। খ্রিষ্টীয় বর্ষ গণনা শুরু হয়েছিল যিশুর জন্মকাল থেকে। বাংলা বর্ষ গণনা শুরুর জন্য পণ্ডিতেরা তখন বেছে নিয়েছিলেন হিজরি সালকে, অর্থাৎ মক্কা থেকে মদিনায় হযরত মোহাম্মদের (তার ওপর শান্তি বর্ষিত হোক) হিজরতের কাল থেকে। আর বাংলা মাসের নাম হিসেবে লৌকিক রীতি ও হিন্দু দেব-দেবীর নামই বহাল রাখা হলো। অর্থাৎ ইসলাম, হিন্দুধর্ম ও লৌকিক রীতির সমন্বয় ঘটেছিল বাংলা বর্ষ গণনায়। সব ধর্মের মানুষের চেতনার প্রতিফলন তাই আমরা এখানে পাই।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার পেছনে বাঙালির সাংস্কৃতিক জাগরণের ভূমিকা ব্যাখ্যার অপেক্ষা রাখে না। আজ স্বাধীনতার পাঁচ দশকেরও পরে নতুন করে আবার যখন ধমার্ন্ধতা উসকে তোলা হচ্ছে, ধর্মের অপব্যবহারে মেতে উঠছে স্বার্থবাদী গোষ্ঠী এবং বাঙালির অখণ্ড সাংস্কৃতিক সত্তাকে ধর্মের বিচারে খণ্ডিত করে তোলার চেষ্টা নেয়া হচ্ছে তখন বৈশাখী উৎসব বিশেষ তাৎপর্যবহ হয়ে উঠছে। বৈশাখ আবারও আমাদের একত্রে মিলন ঘটাচ্ছে, সব ধর্মের সব মতের সব পেশার মানুষ মিলতে পারে বৈশাখী উৎসবে, যে উৎসব হাজার বছর ধরে প্রবাহিত হচ্ছে এই ভূখণ্ডে, যেমন প্রবাহিত হচ্ছে বদ্বীপ বাংলার নদীমালা, যাদের কোনো ধর্মপরিচয় নেই, সম্প্রদায়গত পক্ষপাত নেই, তেমনি বৈশাখেরও নেই কোনো খণ্ডিত রূপ। ক্ষুদ্রতা, সঙ্কীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে মিলনের এই শক্তি বাঙালি খুঁজে পাবে বৈশাখে, বৈশাখী উৎসব তাই আগামীর পথচলারও প্রেরণা।

বর্তমান বিশ্বে সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য সংরক্ষণের প্রশ্ন তাই অতীত যে কোনো সময়ের চেয়ে অধিকতর গুরুত্ব অর্জন করেছে। বাংলাদেশের ইতিহাসের তাৎপর্যময় দিন একুশে ফেব্রুয়ারিকে ইউনেস্কো যখন আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে তখন বিশ্বসমাজ ভাষাবৈচিত্র্য রক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরা ও প্রধান ভাষার চাপে বিশ্বের অপ্রধান ও ছোট ছোট ভাষাগোষ্ঠীর ভাষাবিলোপের শঙ্কা থেকেই বিশেষ দিবসের প্রবর্তনা ঘটায়। ভাষার অধিকার রক্ষায় বাঙালির প্রয়াস আন্তর্জাতিকভাবে সব ভাষাভাষীর অধিকার রক্ষার প্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে, অর্জন করেছে নতুন তাৎপর্য। সেই বাঙালির জাতিসত্তা ও স্বকীয়তার একটি বিশেষ উপাদান বাংলা বর্ষপঞ্জি ও বৈশাখের নববর্ষ উৎসব। লোকায়ত জীবনের সঙ্গে বাংলা সনের এখনো যে সম্পৃক্ততা রয়েছে, নাগরিক জীবনের সঙ্গে ততটা যোগ নেই। তবে একবিংশ শতকের দ্বিতীয় দশকেও বাংলা সন ও বাঙালি জীবনের সম্পর্ক জাতীয় পর্যায়ে একেবারে মুছে যায়নি। একথা ঠিক আমরা একুশে ফেব্রুয়ারি পালন করি, আটই ফাল্গুন নয়, বিপরীত দিকে আবার সাংস্কৃতিকভাবে আমরা পঁচিশে বৈশাখ ও এগারোই জ্যৈষ্ঠ পালন করি বাংলার দুই প্রধান কবির জন্মতিথি স্মরণে, গ্রেগরিয়ান বর্ষপঞ্জিকা অনুসারে এদের জন্মদিবস অনেকেই চিহ্নিত করতে পারবেন না।

নব্বইয়ের দশকের গণআন্দোলনের সঙ্গে সমান্তরালভাবে যে মঙ্গল শোভাযাত্রার প্রবর্তন ঘটে, তা আজ দেশব্যাপী বিস্তার অর্জন করেছে, পেয়েছে ইউনেস্কোর স্বীকৃতি; কিন্তু বৈশাখের প্রতিষ্ঠার জন্য আরও দীর্ঘ পথচলা রয়েছে বাকি। বিশ্বায়নের চাপে কুণ্ঠিত মানবগোষ্ঠী যে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংগ্রাম পরিচালনা করবে, তার প্রেরণা ও সংহতি আসবে কেন্দ্রের বলদপীর ভোগবাদী সংস্কৃতির চাপ প্রতিহত করে জাতিসত্তার বিশিষ্টতা অবলম্বন করে। এক্ষেত্রে প্রতিটি জাতির স্বকীয়তা ও বিশিষ্টতা পালন করবে বড় ভূমিকা। বিশ্বায়নের ঘনায়মান মেঘ যখন আমাদের জীবন ক্রমে আচ্ছন্ন করছে তখন আলোর ইশারা ও উৎস হিসেবে আমরা পাই জাতীয় সংস্কৃতি রূপকে, আমরা বুঝি প্রতিটি জাতিসত্তার বিকাশ একক বিশ্ববাজারকে সুস্থিত করবে, একক সাংস্কৃতিক চাপ থেকে মুক্ত করবে। তাই একবিংশ শতকের বিশ্বায়নের কালে বৈশাখ বাঙালি জীবনে অর্জন করেছে আরও অধিক তাৎপর্য।

আজ আমরা শুভের আবাহনী গেয়ে যখন বর্ষবরণ করছি, তখন দগ্ধ নিহত ছিন্নভিন্ন হচ্ছে গাজা, বর্বর ইসরায়েলি আক্রমণে। সভ্যতার পীঠস্থান হিসেবে পরিচিত জ্ঞান-বিজ্ঞান সম্পদ-সহায়ে বলবান রাষ্ট্রসমূহ কেবল নিষ্ক্রিয়তার পরিচয় দিচ্ছে না, তাদের সভ্যতার মুখোশও খসে পড়ছে। মানবের অধিকার, ব্যক্তির স্বাধীনতা ও সামাজিক মূল্যবোধের আদর্শবহ যে জ্ঞানভাণ্ডার পাশ্চাত্য নির্মাণ করেছে তার অসারতা প্রকটভাবে মুখ ব্যদান করছে। গাজায় সংঘটিত জেনোসাইডের তারা কেবল নিষ্ক্রিয় দর্শক নয়, সক্রিয় সহযোগীও বটে। সভ্যতার এমনি চরম সংকটময়কালে বাঙালির বর্ষবরণ তাই শান্তিময় বিশ্বের কামনা ও লড়াইয়ের সঙ্গেও যুক্ত। জয় হোক বৈশাখের এবং প্যালেস্টাইনের।

লেখক: গবেষক ও প্রকাশক

মতামত দিন

মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে

ট্রেন্ডিং ভিউজ