কানাডার স্বপ্নচ্যুতির রাতে নতুন উচ্চতায় অ্যাটলাস লায়ন্সরা
২০২২ কাতার বিশ্বকাপে ইতিহাস গড়ে প্রথম আফ্রিকান দল হিসেবে সেমিফাইনালে খেলেছিল মরক্কো। চার বছর পর ২০২৬ বিশ্বকাপেও সেই ধারাবাহিকতা ধরে রেখে আবারও নিজেদের শক্তিমত্তার প্রমাণ দিল আটলাস লায়ন্সরা। শেষ ষোলোর লড়াইয়ে অন্যতম স্বাগতিক কানাডাকে ৩-০ গোলে উড়িয়ে দিয়ে টুর্নামেন্টের প্রথম দল হিসেবে কোয়ার্টার ফাইনালের টিকিট নিশ্চিত করেছে মরক্কো।
হিউস্টন স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ম্যাচে জোড়া গোল করে জয়ের ভিত গড়ে দেন আজেদিন উনাহি। আর যোগ করা সময়ে সৌফিয়ান রাহিমির গোল মরক্কোর দাপুটে জয়ে পূর্ণতা এনে দেয়।
প্রথমার্ধ গোলশূন্য থাকলেও দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই জমে ওঠে ম্যাচ। ৫০ মিনিটে অধিনায়ক আশরাফ হাকিমির নেওয়া ফ্রি-কিক থেকে বল পেয়ে কানাডার রক্ষণভাগ ভেদ করে নিখুঁত ফিনিশে দলকে এগিয়ে নেন উনাহি। এরপর ৮২ মিনিটে দুর্দান্ত এক পাল্টা আক্রমণ থেকে ব্রাহিম দিয়াজের যোগানো বলে নিজের দ্বিতীয় ও দলের হয়ে ব্যবধান দ্বিগুণ করেন তিনি। এই জোড়া গোলেই মূলত কোয়ার্টার ফাইনালের পথ অনেকটা প্রশস্ত হয়ে যায় মরক্কোর জন্য। নির্ধারিত সময় শেষে যোগ করা অতিরিক্ত ৮ মিনিটের মাথায় ব্রাহিম দিয়াজের আরেকটি অ্যাসিস্ট থেকে ব্যবধান ৩-০ করেন সৌফিয়ান রাহিমি, যিনি প্রথমার্ধেই চোটে পড়া তারকা ফরোয়ার্ড ইসমাইল সাইবারির বদলি হিসেবে মাঠে নেমেছিলেন।
স্কোরলাইনে ব্যবধান বড় হলেও পুরো ম্যাচেই ছিল শারীরিক লড়াই ও কার্ডের ছড়াছড়ি। ম্যাচে মোট সাতটি হলুদ কার্ড দেখান রেফারি মাইকেল অলিভার, কোনো লাল কার্ড দেখা যায়নি। মরক্কোর পক্ষে হলুদ কার্ড দেখেন রেদুয়ান হালহাল (২০ মিনিট, দেরিতে ট্যাকল), আজেদিন উনাহি (৪৫ মিনিট, পেছন থেকে ফাউল), বিলাল এল খানুস (৪৫+৭ মিনিট, ডি ফুজেরোলেসকে অসতর্ক ট্যাকল) এবং অধিনায়ক আশরাফ হাকিমি (রিচি লারিয়ার সঙ্গে বাদানুবাদের জেরে)। কানাডার পক্ষে কার্ড দেখেন রিচি লারিয়া (হাকিমির সঙ্গে ধস্তাধস্তির ঘটনায়), জোনাথন ডেভিড (৪৪ মিনিট, জার্সি টেনে ফাউল) এবং লুক দ্য ফুজেরোল (৬৮ মিনিট, রাহিমিকে সাইডলাইনের কাছে ফাউল করে)। ম্যাচে কোনো পেনাল্টির ঘটনা ঘটেনি।
ফিফার সবশেষ অফিসিয়াল পরিসংখ্যান বলছে, স্কোরলাইনে বড় ব্যবধানে হারলেও আক্রমণে খারাপ করেনি কানাডা। পুরো ম্যাচে কানাডা ৮টি শট নেয়, যেখানে মরক্কোর শট সংখ্যা ছিল ৪টি। তবে গোলের সম্ভাবনার (এক্সপেক্টেড গোল বা এক্সজি) হিসেবে কানাডার সংগ্রহ ছিল মাত্র ০.৭৯, যা তাদের ফিনিশিংয়ের দুর্বলতাই তুলে ধরে। প্রথমার্ধে বল দখলে ও আক্রমণে স্পষ্ট প্রাধান্য ছিল কানাডার; ১৩ বার প্রতিপক্ষের বক্সে ঢুকতে পারে তারা, বিপরীতে মরক্কো পুরো প্রথমার্ধে মাত্র একবার কানাডার বক্সে বল ছোঁয়ায়। তবে দ্বিতীয়ার্ধে খেলার চিত্র পুরোপুরি পাল্টে যায়, বল দখল ও আক্রমণের ধার- দুই বিভাগেই নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয় মরক্কো।
মরক্কো শিবিরে বড় ধাক্কা আসে ম্যাচের ২১ মিনিটে, হ্যামস্ট্রিংয়ের চোটে মাঠ ছাড়তে বাধ্য হন তারকা ফরোয়ার্ড ইসমাইল সাইবারি, তার জায়গায় নামেন সৌফিয়ান রাহিমি—যিনি পরে জয় নিশ্চিতকারী গোলটি করেন। অন্যদিকে কানাডা শিবিরেও দ্বিতীয়ার্ধে একাধিক পরিবর্তন আনেন কোচ জেসি মার্শ, আক্রমণে গতি বাড়াতে মাঠে নামান সাইল ল্যারিন, জ্যাকব শ্যাফেলবার্গ, প্রমিজ ডেভিড ও জেইডেন নেলসনের মতো খেলোয়াড়দের। তবে কোনো পরিবর্তনই কানাডাকে ব্যবধান কমানোর পথ দেখাতে পারেনি।
এই জয়ে টানা দ্বিতীয় বিশ্বকাপে কোয়ার্টার ফাইনালে উঠল মরক্কো, যা আফ্রিকা মহাদেশের কোনো দলের জন্য প্রথম কীর্তি। ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে সেমিফাইনাল পর্যন্ত যাওয়া দলটি এবার আরও একধাপ এগিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে মাঠে নামবে। আগামী ৯ জুলাই বোস্টনে কোয়ার্টার ফাইনালে তাদের প্রতিপক্ষ হবে ফ্রান্স ও প্যারাগুয়ের মধ্যকার ম্যাচের বিজয়ী দল।
অন্যদিকে এই হারে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিতে হলো আয়োজক তিন দেশের একটি কানাডাকে। স্বাগতিকদের মধ্যে প্রথম দল হিসেবে তারা টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে গেল। তবে হতাশার মধ্যেও স্বস্তির খবর, নিজেদের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে ওঠা এবং রাউন্ড অব ৩২-এ দক্ষিণ আফ্রিকাকে হারিয়ে প্রথম নকআউট জয়ের রেকর্ড গড়েছে জেসি মার্শের দল, যা ভবিষ্যতের জন্য বড় প্রেরণা হয়ে থাকবে।
মতামত দিন