Views Bangladesh Logo

‘অবসর' নিয়ে গ্রামে কাটানোর ইচ্ছে আর পূরণ হলো না

Dr Nadim  Mahmud

নাদিম মাহমুদ

যুক্তরাষ্ট্রে তখন শুক্রবার সকাল সাতটা। নিউইয়র্ক থেকে এক শুভাকাঙ্ক্ষীর ফোন এল। ওই সময় বাচ্চাকে স্কুলে পৌঁছে দিতে যাই, তাই ফোনটি ধরতে পারিনি। একটু পরে ফিরতি ফোন করতেই ওপাশ থেকে প্রশ্ন, "ভাই, খবর কী? কিছু শুনেছেন?" বললাম, "কী খবর?" তিনি বললেন, "তৌফিক ভাই নাকি মারা গেছেন?"

কথাটা শুনে ক্ষণিকের জন্য স্তম্ভিত হয়ে গেলাম, মস্তিষ্ক যেন একেবারে অসাড় হয়ে গেল। পরে খোঁজ নিয়ে নিশ্চিত হলাম, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রধান সম্পাদক তৌফিক ইমরোজ খালিদী আর নেই। কোনো কিছুতেই মন বসাতে পারলাম না, অফিসেও যাওয়া হলো না।

লিখতে বসেও লিখতে পারছি না। অধিক শোকে মানুষ কীভাবে বাকরুদ্ধ হয়ে যায়, কীভাবে নিজেকে সামলাতে ভুলে যায়, তা টের পেলাম। মৃত্যুসংবাদ পাওয়ার বারো ঘণ্টা পর এই লেখাটি লিখতে বসেছি। জানি, এটি গতানুগতিক লেখা হবে না। তৌফিক ইমরোজ খালিদীকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করতে হবে, এটাই এখনো ভাবতে পারছি না।

এই লেখার মাত্র সপ্তাহখানেক আগে তার সঙ্গে আমার শেষ কথা হয়েছিল। তিনি তখন প্যারিস সফরে। বলেছিলেন, প্যারিস হয়ে লন্ডন যাবেন, ৩০ সেপ্টেম্বরের পর দেশে ফিরবেন। তিনি দেশে ফিরেছেন কি না জানতে ১ অক্টোবর টেক্সট করেছিলাম, কিন্তু উত্তর পাইনি। সাধারণত টেক্সট করার কিছুক্ষণের মধ্যেই তার উত্তর আসত। এবার এল না। আমিও আর বিরক্ত করিনি। ভেবেছিলাম, হয়তো ফ্লাইটে আছেন, তাই দেরি হচ্ছে। সেই উত্তর শেষ পর্যন্ত আর এল না। এল তার চিরপ্রস্থানের খবর।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী ছিলেন আমার লেখালেখি ও সাংবাদিকতার আদর্শ। তার সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় প্রায় দেড় দশক আগে, অধুনালুপ্ত সিটিসেলের একটি বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে। আমি তখন সবে বিশ্ববিদ্যালয়ে পা রেখেছি। তার স্পষ্টভাষী রূপ ও স্মার্টনেস আমার মন কেড়ে নিয়েছিল। এরপর বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেছি, কিন্তু কখনো সামনাসামনি দেখা হয়ে ওঠেনি।

একসময় দেশ ছাড়লাম। জাপানে পিএইচডির ফাঁকে ফাঁকে সাংবাদিকতাও চালিয়ে গেলাম। বিডিনিউজের সঙ্গে এক দশকের পথচলায় তার সঙ্গে প্রথম কথা হয় অনলাইনে, ২০২০ সালের করোনাকালে বিডিনিউজের একটি অফিসিয়াল মিটিংয়ে।

এরপর থেকে মাঝেমধ্যে টেক্সট হতো, কথাও হতো। গত এক বছরে তার সঙ্গে সবচেয়ে বেশি কথা হয়েছে, মাসে অন্তত তিন-চারবার। চলতি বছরের মে মাসে তিনি হঠাৎ আমেরিকায় এলেন। আগে থেকে এমন কোনো পরিকল্পনা ছিল না। আগের সপ্তাহে আমাকে বলেছিলেন, "তোমার সঙ্গে কথা হয়, কিন্তু দেখা হয় না। দেখা হওয়া দরকার।" আমি সৌজন্যবশত বলেছিলাম, "আমেরিকায় এলে জানাবেন, দেখা হবে।" আমাকে একেবারে চমকে দিতে তিনি বিমানে উঠে ফোন করলেন: "প্লেনের টিকিট কেটে ফেলো, আমি কাল সকালে নিউইয়র্ক আসছি। দেখা হবে।"

ফোন পেয়ে আমি হতবাক। ক্যালিফোর্নিয়া থেকে নিউইয়র্ক ছয় ঘণ্টার ফ্লাইট। অফিস শেষ করে রাতেই নিউইয়র্কের ফ্লাইটে উঠলাম। সকালে পৌঁছে গেলাম তার হোটেলে, তিনি তখনো ঘুমিয়ে। এরপর টানা চার দিন কাটল তার সঙ্গে। তাকে নিয়ে ঘুরলাম নিউ ইয়র্ক আর ওয়াশিংটন ডিসিতে।

সেই দিনগুলোতে খুব কাছ থেকে বুঝলাম, কেন তিনি ‘নিউজমেকার’। বিদেশের মাটিতে বসেও প্রকাশিত একটি সংবাদের একটি শব্দ নিয়ে তিনি বিচলিত। সঙ্গে সঙ্গে অফিসে দায়িত্বরতদের ফোন করে সেই শব্দ বদলে আরও যথাযথ শব্দ ব্যবহারের পরামর্শ দিলেন। একটি শব্দের প্রতিও তার এই মনোযোগই তাকে আলাদা করেছিল।

তৌফিক ইমরোজ খালিদীকে নিয়ে স্মৃতিচারণ কয়েক হাজার শব্দেও শেষ হবে না। জীবনের শেষ কয়েক মাসে তার সঙ্গে আমার নিয়মিত কথা হতো। দেশের সংবাদমাধ্যম, ইতিহাস, রাজনৈতিক ব্যক্তিদের পটভূমি থেকে শুরু করে বিশ্বরাজনীতির আদ্যোপান্ত তিনি আমার সঙ্গে ভাগ করে নিতেন। ভাগ করে নিতেন তার স্বপ্নগুলোও। একদিন জিজ্ঞেস করেছিলাম, কেন আমাকে এত কিছু জানাচ্ছেন। তিনি বলেছিলেন, "তোমাকে এসব বলছি, যাতে ভবিষ্যতে তুমি লিখতে পারো, বলতে পারো।" আজ বুঝি, সেই কথাগুলো ছিল একধরনের দায়িত্ব অর্পণ।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিয়ে তিনি কী স্বপ্ন দেখেন, প্রতিষ্ঠানটির ভবিষ্যৎ কেমন হবে, সেসব নিয়ে কথা বলতেন। সম্পাদক হিসেবে তিনি অবসর নিতে চেয়েছিলেন। অবসরের পর কী করবেন, সেই প্রশ্নের উত্তরও আমাকে দিয়েছিলেন।

টাঙ্গাইলের এক প্রত্যন্ত গ্রামে তিনি একখণ্ড জমি কিনেছিলেন, যার কথা খুব কম মানুষই জানেন। সেখানে ছোট একটি বাড়ি করবেন, শহরের কোলাহল ছেড়ে নিভৃতে দিন কাটাবেন। বন্ধুবান্ধব সবার কাছ থেকে খানিকটা আড়ালে, দূরে থাকতে চেয়েছিলেন।

আমি বলেছিলাম, "অবসর নিতে পারেন, কিন্তু খবর থেকে দূরে থাকবেন কীভাবে?" তিনি হেসে বলেছিলেন, "সেটা হয়তো সম্ভব হবে না।" সংবাদ ছিল তার রক্তে, তার নিঃশ্বাসে।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম গড়ে তোলার পেছনে তার সংগ্রাম, তার স্বপ্ন আর সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথরেখা নিয়ে তার কথাগুলো আমাকে গভীরভাবে ভাবিয়েছে। দেশের প্রথম অনলাইন সংবাদমাধ্যমকে যিনি দেশের সাংবাদিকতার অন্যতম প্রধান প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেছেন, তার দৃষ্টি ছিল সবসময় সামনের দিকে।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের দুই দশক পূর্তি নিয়ে তৌফিক ভাই ছিলেন দারুণ উচ্ছ্বসিত। পূর্তি আয়োজনের জিনিসপত্র কিনতে চীনে যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল তার। এরপর প্যারিস ও লন্ডন ঘুরে দেশে ফেরার কথা ছিল। কিন্তু মৃত্যুর নির্মম অবিচারের কাছে তিনি হার মানলেন। যে আয়োজনের জন্য এত প্রস্তুতি, সেই আয়োজন তিনি আর দেখে যেতে পারলেন না।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী নিঃসন্দেহে ছিলেন আমার অভিভাবক, আমার সাংবাদিকতার আদর্শ। কেউ যখন কারও আদর্শ হয়ে ওঠেন, তখন তার অনেক কিছুই ভালো লাগে। তবে নির্মোহভাবে বললেও, তৌফিক ইমরোজ খালিদীকে ভালোবাসেন না, এমন মানুষ খুব কমই আছেন।

একজন মানুষ কীভাবে নিউজমেকার হয়ে ওঠেন, তা এই জাতি দেখেছে। বলতে দ্বিধা নেই, বাংলাদেশে সম্ভবত তিনিই একমাত্র পরিপূর্ণ সম্পাদক যিনি মাঠের সাংবাদিক থেকে একবারে সম্পাদক হয়েছেন নিজ মেধা, কর্মদক্ষতা ও যোগ্যতায়।

অসুরদের কাছে মাথা না নুইয়ে কীভাবে সংবাদের প্রতি অটল থাকতে হয়, কীভাবে ঝড় সামাল দিতে হয়, তিনি তা আমাদের হাতে-কলমে শিখিয়েছেন। তার সেই শিক্ষায় দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে বিডিনিউজের সাংবাদিকেরা দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন।

তিনি শারীরিকভাবে আমাদের মাঝ থেকে বিদায় নিয়েছেন, কিন্তু হৃদয় থেকে কখনো বিদায় নিতে পারবেন না। তার রেখে যাওয়া প্রতিষ্ঠান, তার হাতে গড়া অসংখ্য সাংবাদিক আর শব্দের প্রতি তার অবিচল নিষ্ঠার মধ্যেই তিনি বেঁচে থাকবেন। তৌফিক ভাই, আপনার এই অসময়ের যাত্রা মেনে নেওয়া কঠিন। যে কথাগুলো আমাদের বিশ্বাসের পাল্লায় আমাকে বলে গেছেন, সেগুলো লিখে যাওয়ার দায় আমি বহন করব সারাজীবন। ভালো থাকবেন ওপারে।

ড. নাদিম মাহমুদ, লেখক ও গবেষক

মতামত দিন

Avatar

ট্রেন্ডিং ভিউজ