রক্তাক্ত পিতার মুখ নিয়ে সিংহাসনে
বাংলাদেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কথা যখন ভাবি, একদিকে আনন্দিত হই এই ভেবে যে দক্ষিণ এশিয়ার একটি অতি ছোট দেশকে তিনি তাঁর একক প্রচেষ্টায় কোথায় নিয়ে গেছেন! অন্যদিকে পরম বেদনা অনুভব না করেও পারি না, যখন মনে পড়ে নির্মম নিষ্ঠুর একদল ঘাতকের হাতে তাঁর পিতা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যার মরমী বেদনা নিয়ে তিনি দেশের জন্য প্রাণপাত করে চলেছেন।
পৃথিবীর ইতিহাসে রাষ্ট্রনেতাদের হত্যা কম দেখেনি মানুষ। কিন্তু একটি পরিবারের এত মানুষের নিহত হওয়ার দ্বিতীয় নজির আর নেই। এর চেয়েও যা উল্লেখযোগ্য-জুলিয়াস সিজার বা আব্রাহাম লিঙ্কন, আল সালভাদর আলেন্দে, আনোয়ার সাদাত নিহত হওয়ার পর তাদের স্ত্রী-পুত্র-কন্যা, কেউ ব্যক্তিগত শোক সামলে দেশবাসীর মঙ্গল চিন্তায় ব্যয় করেননি। যাঁরা করেছেন তারা হলেন ইন্দিরা গান্ধী-উত্তর রাজীব গান্ধী বা জুলফিকার আলী ভুট্টো-তনয়া বেনজির ভুট্টো, ইতিহাসের স্বার্থে স্বীকার করতেই হবে তাঁদের কৃতি আমাদের শেখ হাসিনার ধারে কাছেও নয়। নিজের ও পরিবারের উচ্চমানের শিক্ষা, রাজনৈতিক প্রজ্ঞা আর জনদরদি মন গড়ে তুলেছে তাঁর মতো এক দেশ নায়িকাকে।
বঙ্গবন্ধুর সার্থক উত্তরসূরী বলা হয় তাঁকে। এখানে সত্যের অর্ধাংশ আড়ালে থেকে যায়। কেননা কেবল পিতা নয়, তাঁর রাজনৈতিক দর্শনে ও বিচক্ষণতায়, সমস্যা সমাধানে ধীর এবং কার্যকর ভূমিকা পালনে তাঁর মাতা বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছার নেপথ্য ভূমিকাও ক্রিয়াশীল। আমরা যদি মনে রাখি বঙ্গবন্ধুর নিহত হওয়ার পর দেশের মাটিতে পা রাখার পূর্বে পর্যন্ত তাঁর নির্বাসিত জীবনের দিনগুলির কথা অর্থাৎ ২১ বছরের অপশাসনের পরে কীভাবে গণতান্ত্রিক পথে তিনি দেশের হাল ধরলেন, তা হলে অনুভব করতে পারব যে পরিবারের সকলে নিহত হওয়ার পরেও কী অটুট মনোবল তাঁকে সঞ্জীবিত রেখেছিল। তাঁদের ট্র্যাজেডির ধরন ও মাত্রা ভিন্ন রকমের হলেও বিষাদসিন্ধুর মধ্য দিয়েই তাঁদের অভিযান।
মিশরের রাণী ক্লিওপেট্রা তাঁর দুই প্রণয়ীকে (জুলিয়াস সিজার এবং মার্ক এন্টনি) হারান। ইংল্যান্ডের রাণী প্রথম এলিজাবেথের মা এনি বোলিনকে হত্যা করা হয়েছিল যখন এলিজাবেথ মাত্র আড়াই বছরের। উপমহাদেশের প্রথম নারী শাসক সুলতানা রাজিয়াকে পদে পদে হেনস্থা করেছে সমসাময়িক প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী। অতঃপর স্বামীসহ তাঁকে হত্যা করে। ঝাঁসীর রাণী লক্ষ্মীবাঈয়ের শিশুপুত্র দামোদর রাওয়ের অকাল মৃত্যু তাঁকে সিংহাসনচ্যুত করে। কেননা ব্রিটিশের মধুর ‘স্বত্ববিলোপ নীতি’ তে বলা ছিল, উত্তরাধিকারী না থাকলে তার রাজ্য ব্রিটিশের অধীনে চলে যাবে, দত্তক পুত্রের উত্তরাধিকার চলবে না।
আধুনিক যুগে এসেও দেখতে পাই, এশিয়া মহাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী রিমাভো বন্দরনায়ক তাঁর স্বামী সলোমন বন্দরনায়কের রক্তস্নাত হত্যার মধ্য দিয়ে উঠে এসেছিলেন। কোরাজন এ্যাকুইনো এশিয়ার প্রথম নারী রাষ্ট্রপতি। তাঁর স্বামী বেনিগনোও নিহত হয়েছিলেন এ্যাকুইনো ফিলিপাইনের রাষ্ট্রপতি পদে বসার আগে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীও হারিয়েছেন পুত্র সঞ্জয়কে। যদিও হত্যা নয়, সঞ্জয়ের মৃত্যু হয় দুর্ঘটনাজনিত কারণে।
ইতিহাসের যে সুবিশাল সরণি বেয়ে আমরা শেখ হাসিনায় এসে পৌঁছলাম, তাতে দেখা যায় যে কথিত সব রাষ্ট্রনায়কদের তুলনায় বহুগুণ বিধুরতার মধ্য দিয়ে অতিক্রম করতে হয়েছে পৃথিবীর মাত্র দুই শতাংশ অঞ্চল নিয়ে ১৮ কোটি মানুষের জীবনকে সুখী ও সমৃদ্ধিশালী করার লক্ষ্যে নিয়োজিত শেখ হাসিনাকে। 'জন্ম তোর বেদনার দহে'-তাঁর সম্পর্কে এটা আমরা বলতেই পারি। ১৯৭৪ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর পৃথিবীর আলো প্রথম দেখেন তিনি।
পিতার কারাবাস, মায়ের উদ্বেগ ও অর্থচিন্তা, ভাই-বোনদের জীবনের অনিশ্চয়তা-এর মধ্যেই বড় হওয়া তাঁর এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স করা। অবশেষে রাজনীতিতে যোগদান। ১৯৭১ সালে দেশের নাজুক পরিস্থিতিতে জন্ম দিচ্ছেন প্রথম সন্তান সজীব ওয়াজেদ জয়কে। সাতাশে জুলাই। কোলে শিশু সন্তান, দেশে চলছে মুক্তিযুদ্ধ। হৃদয়ে পাকিস্তানে বন্দি পিতার জন্য উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠা। এর এক বছর পরে কন্যা সায়মা ওয়াজেদ পুতুল এলো ঘরে।
কোনো মনস্তত্ত্ববিদ কি এর ব্যাখ্যা করতে পারবেন, এহেন নাজুক পরিস্থিতিকে সহজভাবে নেওয়া কতোখানি দৃঢ় মনের পরিচয়? এরপর এলো স্বাধীনতা, বিজয়। ফিরে এলেন জাতির পিতা। কিন্তু ইতিহাসের দেবী ক্লিও বড়ো নিষ্ঠুর, বড়োই স্বেচ্ছাচারী। তাই ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট চিহ্নিত হয়ে রইল পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে করুণ হত্যাকাণ্ড, পরিবারসহ। জুলিয়াস সিজার বা আব্রাহাম লিঙ্কন, আনোয়ার সাদাত বা আলেন্দের হত্যা হয় ঠিকই, তবে এতটা পাশবিক নয়। ১৯৭৫ থেকে ১৯৮১’র ১৭ মে পর্যন্ত জার্মানি, বেলজিয়াম, ব্রিটেন ও ভারতে পরবাসী হয়ে থাকতে হলো শেখ হাসিনাকে। যেদিন ফিরলেন আমরা নিশ্চিত, এক দশকের ইতিহাসের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস থামতে চায়নি তাঁর। দেখছেন এক রক্তাক্ত প্রান্তর, পরাণের গহীন ভিতর থেকে উঠে আসছে আর্ত পদাবলী! কোথায় বাহান্নো? কোথায় চুয়ান্নোর সেই গণতন্ত্রের ঊষাকাল? সালাম-জব্বার-রফিকের আত্মা নিভৃতে কাঁদছে, আসাদের শার্ট ধুলায়, ৩০ লাখ শহীদের দীর্ঘশ্বাস ভরিয়ে তুলছে বাংলাদেশকে। দুই লাখ নির্যাতিতা মা-বোন মৃত, অদ্ভুত উটের পিঠে চলেছে তাঁর স্বদেশ!
এইসব ম্লানমুখে ভাষা দেবার সংকল্প নিলেন তিনি। নতুন করে শুরু। এ যেন সাপ-লুডোর খেলা। খেললেন এবং 'দূর হ দুঃশাসন'-কে সাফল্যের সঙ্গে মোকাবিলা করলেন। এ জন্য জেলে যেতে হয়েছে তাঁকে। বারবার হত্যার চক্রান্ত হয়েছে তাঁর উপর। ১৯৯৬-তে অযুত বাধা পেরিয়ে রাষ্ট্র ক্ষমতায় এলেন এবং এখন পর্যন্ত চার চারবার। ফলশ্রুতি? বহু।
আজ বাংলাদেশ বিশ্ব ক্রিকেটে সম্মানের সঙ্গে অংশ নিচ্ছে, এভারেস্টজয়ী হয়েছে নারীসহ বাংলাদেশের একাধিক পর্বতারোহী, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হচ্ছে ক্রমশ বর্ধিত হারে,বাড়ছে জিডিপি। এতসবের মানে শেখ হাসিনা। শুধু কি তাই? শেখ হাসিনা মানে মেট্রোরেল, শেখ হাসিনার অর্থ কর্ণফুলি টানেল, শেখ হাসিনার অন্তর্নিহিত তাৎপর্য পদ্মা সেতু।
আরও, হ্যাঁ আরও। তিনি লেখক। বিশ্বের বহু দেশ তাঁকে সাম্মানিক ডক্টরেট উপাধিতে ভূষিত করেছে। রবীন্দ্রনাথের বিশ্বভারতী তাঁকে দিয়েছে 'দেশিকোত্তম'। তাঁর দুই সন্তান শিক্ষাগত যোগ্যতা ও কর্মতৎপরতায় গোটা পৃথিবীতে সম্ভ্রম আদায় করেছেন। বছরের শুরুতে কোটি কোটি স্কুলছাত্র-ছাত্রীকে পাঠ্যপুস্তক দানের যে অনুপম নজির, অন্য কোনো দেশে তা আছে বলে আমাদের জানা নেই। আজ বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশে উপনীত।
সর্বোপরি, প্রতি বছর রাষ্ট্রসঙ্ঘের সাধারণ অধিবেশনে বাংলাতে ভাষণ দিয়ে তিনি তাঁর পিতা বঙ্গবন্ধুর ১৯৭৪ সালের ঐতিহ্যকে সম্মানদানের মাধ্যমে বাংলাদেশকে, বাংলা ভাষাকে এবং তাঁর দেশবাসীকে আত্মগর্বে গর্বিত করে তুলছেন।
মতামত দিন