ফাইনালের আগে ফিফার তদন্তের মুখে আর্জেন্টিনা
মাঠের লড়াইয়ে তখন ইতিহাস গড়া হয়ে গেছে। গোল হজম করেও দুর্দান্ত প্রত্যাবর্তনে ইংল্যান্ডকে ২-১ গোলে হারিয়ে ফাইনালের টিকিট পকেটে পুরেছে আর্জেন্টিনা। কিন্তু জয়ের আনন্দ মিলিয়ে যাওয়ার আগেই মাঠেই তৈরি হলো আরেক নাটক — যার রেশ এখন পৌঁছে গেছে ফিফার দরবার পর্যন্ত।
উদ্যাপনের ঠিক মাঝামাঝি সময় গ্যালারি থেকে দর্শকদের হাত ঘুরে খেলোয়াড়দের কাছে চলে আসে একটি ব্যানার। যাতে লেখা— ‘লাস মালভিনাস সন আরহেনতিনাস’, অর্থাৎ ‘ফকল্যান্ডস আর্জেন্টিনার’। ব্যানারটি প্রথমে হাতে নেন জিওভানি লো সেলসো, এরপর তা উঁচিয়ে ধরেন ডিফেন্ডার লিসান্দ্রো মার্তিনেজ। হাসিমুখে গ্যালারির দিকে হাত নাড়তে থাকেন দুজনই, পাশে যোগ দেন ক্রিস্তিয়ান রোমেরো ও নিকোলাস ওতামেন্দিও।
ঠিক এই দৃশ্যই এখন ঝড় তুলেছে ব্রিটেনে। যুক্তরাজ্যের ব্যবসাবিষয়ক মন্ত্রী পিটার কাইল খেলোয়াড়দের এই আচরণকে ‘একেবারেই অনুচিত’ বলে আখ্যা দিয়েছেন এবং ফিফার কাছে পূর্ণাঙ্গ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের কার্যালয় থেকেও এসেছে কড়া বার্তা— বিশ্বকাপ না জিতুক ব্রিটেন, ফকল্যান্ডস কিন্তু তাদেরই। ফকল্যান্ডস দ্বীপপুঞ্জের সরকারও ব্যানারটিকে ‘সংবেদনশীলতাহীন’ বলে মন্তব্য করার পরই মূলত নড়েচড়ে বসে ফিফা।
বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি নিশ্চিত করেছে, তাদের স্বাধীন ডিসিপ্লিনারি কমিটি এখন ম্যাচ রিপোর্ট খতিয়ে দেখছে এবং শৃঙ্খলা বিধি অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়ার আগে পুরো পরিস্থিতি বিবেচনা করা হচ্ছে।
ফিফার নিয়মেই স্পষ্ট বলা আছে— স্টেডিয়ামে রাজনৈতিক, আদর্শিক কিংবা ধর্মীয় কোনো বার্তা প্রদর্শন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। আর এই একই স্লোগান নিয়ে আর্জেন্টিনার সঙ্গে ফিফার সংঘাত নতুন নয়— ২০১৪ সালে স্লোভেনিয়ার বিপক্ষে এক প্রীতি ম্যাচের পর একই ব্যানার দেখিয়ে ৩০ হাজার সুইস ফ্রাঁ (প্রায় ৩৭ হাজার ডলার) জরিমানা গুনতে হয়েছিল আর্জেন্টাইন ফুটবল ফেডারেশনকে। এবারও জরিমানা কিংবা নিষেধাজ্ঞা— দুটোই থাকছে টেবিলে।
তবে আর্জেন্টিনার ভেতরের ছবিটা একদম উল্টো। প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই খেলোয়াড়দের এই উদ্যাপনকে ‘সম্পূর্ণ সঙ্গত’ বলে সমর্থন জানিয়েছেন, বলেছেন এই আবেগ পুরো আর্জেন্টিনার। যদিও একইসঙ্গে তিনি স্বীকার করেছেন, এর ফল হিসেবে জরিমানার সম্মুখীন হতে হতে পারে দলকে। ভাইস প্রেসিডেন্ট ভিক্তোরিয়া ভিয়ারুয়েল আরও একধাপ এগিয়ে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যানারের ছবি পোস্ট করে খেলোয়াড়দের পাশে দাঁড়িয়েছেন প্রকাশ্যেই।
ফকল্যান্ডস নিয়ে বিরোধ অবশ্য নতুন কিছু নয়— ঊনবিংশ শতাব্দীতে দ্বীপপুঞ্জটি দখলে নেয় ব্রিটেন, আর আর্জেন্টিনা একে নিজেদের ‘মালভিনাস’ বলে দাবি করে আসছে বহু বছর ধরে। ১৯৮২ সালে তৎকালীন সামরিক শাসকগোষ্ঠীর নির্দেশে আর্জেন্টিনা দ্বীপপুঞ্জে আগ্রাসন চালালে বেধে যায় ১০ সপ্তাহের যুদ্ধ। চলতি বিশ্বকাপেই এ নিয়ে এটি দ্বিতীয়বার বিতর্কে জড়াল আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়রা।
তবে মাঠের ঝামেলা মাঠেই রেখে এখন ইতিহাস গড়ার সবচেয়ে বড় লড়াইয়ের সামনে দাঁড়িয়ে আলবিসেলেস্তারা। আগামী রোববার, ১৯ জুলাই স্থানীয় সময় বিকেল ৩টায় (বাংলাদেশ সময় সোমবার ভোর রাতে) ইউরোপ সেরা স্পেনের মুখোমুখি হবে তারা নিউ জার্সির ইস্ট রাদারফোর্ডে মেটলাইফ স্টেডিয়ামে, যা এই টুর্নামেন্টে পরিচিত ‘নিউ ইয়র্ক নিউ জার্সি স্টেডিয়াম’ নামে। চতুর্থবারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার লক্ষ্যে নামবে আর্জেন্টিনা, অন্যদিকে দ্বিতীয় শিরোপার খোঁজে স্পেন।
মতামত দিন