Views Bangladesh Logo

তরুণরা কি সত্যিই রাজনীতিবিমুখ?

Amin Al  Rasheed

আমীন আল রশীদ

এই সময়ের তরুণদের বিরুদ্ধে প্রধান অভিযোগ দুটি। ১. তারা রাজনীতিবিমুখ। ২. তারা পড়াশোনা করে না। 

সত্যিই কি তা-ই? যদি তাই হয় তাহলে এই প্রজন্মকে দিয়ে কি স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব হবে? যদি তরুণরা সত্যিই রাজনীতি ও পড়াশোনাবিমুখ হয়, তাহলে আগামী দিনে দেশকে নেতৃত্ব দেবে কারা? এই সময়ে যাদের বয়স ৬০ বা তার বেশি, তাদের মৃত্যু কিংবা শারীরিকভাবে তারা অক্ষম হয়ে গেলে কারা দেশের হাল ধরবে? ‘রাজনীতি ও পড়াশোনাবিমুখ’ তারুণ্য কী করে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবে? তারা কি সত্যিই রাজনীতি ও জ্ঞানবিমুখ? 

সেই প্রসঙ্গে যাওয়ার আগে বোঝা দরকার কাদেরকে তরুণ বলা হবে এবং বয়সের সঙ্গে তারুণ্যের সম্পর্ক কী? প্রখ্যাত গীতিকবি ও শিল্পী কবীর সুমনের একটি গানের লাইন: ‘চল্লিশ পেরোলেই চালশে।’ একসময় এটি প্রবাদবাক্যের মতো ছিল। কারণ তখন বয়স চল্লিশ হলেই চোখ ঝাপসা হতে থাকতো। শরীরে বয়সের ছাপ পড়ে যেতো। ৬০ বছর বয়সে কারো মৃত্যু হলে ধরে নেয়া হতো তিনি যথেষ্ট বয়স পেয়েছেন। অতএব চল্লিশ হলেই মনে করা হতো যে তিনি বার্ধক্যে পা রাখলেন। 

কিন্তু আর্থিক সক্ষমতা ‍বৃদ্ধির কারণে মানুষের জীবনমানে উন্নতি, খাদ্যাভাসে পরিবর্তন, চিকিৎসাবিজ্ঞানের উন্নতি, স্বাস্থ্যসচেতনতাসহ নানা কারণে বাংলাদেশে মানুষের গড় আয়ু এখন ৭২ বছর। সুতরাং ‘চল্লিশ পেরোলেই চালশে’ বলার সুযোগ নেই। ৪০ এখন বার্ধক্যের উদ্বোধন নয়। বরং এখন ৬০ বছর বয়সেও অসংখ্য মানুষ শারীরিকভাবে সক্ষম; দিব্যি কাজ করছেন; চাকরি থেকে অবসরে যাওয়ার পরেও নানারকম কাজে যুক্ত হচ্ছেন; ব্যবসা করছেন; সামাজিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত হচ্ছেন; রাজনীতি তো করছেনই। অন্তত এই একটি জায়গায় বয়সের কোনো সীমারেখা নেই। অর্থাৎ একজন ব্যক্তি চাইলে মৃত্যুর আগ মুহূর্ত পর্যন্ত, অর্থাৎ তার বয়স যদি ৯০ বছরও হয়, তিনি যদি শারীরিকভাবে একদমই সক্ষম নাও থাকেন, তারপরও তিনি রাজনৈতিক দলের বড় পদে আসীন থাকতে পারেন। দেশের সংবিধান, আইন ও দলের গঠনতন্ত্র তাকে বাধা দিচ্ছে না। 

প্রশ্নটা এই রাজনীতি নিয়েই। কোন রাজনীতির মধ্যে আমরা রয়েছি এবং আগামী দিনে কোন ধরনের রাজনীতির হাইওয়ে দিয়ে বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে। হাইওয়েতে উঠবে নাকি চোরাগলিতে ‍ঘুরপাক খাবে—সেটি নির্ভর করছে এই সময়ের তরুণদের ওপর। 

বাংলাদেশের মানুষের অতীতচারিতা বা স্মৃতিকাতরতা প্রবল। ব্যাপারটা শাহ আব্দুল করিমের গানের মতো: ‘আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম’। আরেকটি প্রবাদ এরকম: ‘যায় দিন ভালো আসে দিন খারাপ’। অর্থাৎ বর্তমান নিয়ে মানুষ সব সময়ই অসন্তুষ্ট। তার কাছে গতকালটাই ভালো। যে কারণে দেখা যায় রাজনীতি, বিশেষ করে ছাত্ররাজনীতি ও ছাত্রআন্দোলন প্রসঙ্গ ‍উঠলেই তারা ষাটের দশকে চলে যায়। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, ছেষট্টির ছয় দফা, উনসত্তুরের গণঅভ্যুত্থান এবং বাঙালির সবচেয়ে বড় অর্জন মুক্তিযুদ্ধ—সর্বত্রই নেতৃত্ব দিয়েছে তরুণ প্রজন্ম; আরও পরিষ্কার করে বললে ছাত্রসমাজ—এই উদাহরণগুলোই সামনে আসে এবং এরসঙ্গে আশির শেষ ও নব্বই দশকের শুরুতে গণতন্ত্রের দাবিতে এরশাদবিরোধী আন্দোলনেও ছাত্রসমাজের ভূমিকা নিয়ে শ্লাঘা বোধ করা হয়। 

সাধারণ মানুষেরও বিরাট অংশ মনে করে যে, পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে ছাত্রসমাজ যতটা দেশপ্রেমিক ও ডেডিকেটেড ছিল, এখন সেখান থেকে তারা বিচ্যুত হয়েছে। আসলে কি তা-ই? যদি তা-ই হয় তাহলে ২০০৭-০৮ সালে সেনানিয়ন্ত্রিত সুশীল সরকারের আমলে গণতন্ত্রের দাবিতে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় কারা আন্দোলন করলো; কারা মার খেলো; কারা জেল খাটলো? যদি তাই হয় তাহলে ২০১৩ সালে কারা গণজাগরণ মঞ্চ গড়ে তুললো? যদি তাই হয় তাহলে নিরাপদ সড়কের দাবিতে ২০১৮ সালে কারা সারা দেশ তোলপাড় করে তুললো?  কাদের আন্দোলনের ফলে সরকার সড়ক পরিবহন আইন করতে বাধ্য হলো? সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে কারা আন্দোলন করলো? এসব তো তরুণদের আন্দোলনেরই ফসল। তারা রাজনীতিবিমুখ হলে কী করে রাস্তায় নামলো? প্রশ্নটা হলো, কত শতাংশ তরুণ এইসব আন্দোলনে ছিলো এবং বিপুল সংখ্যক তরুণ কি ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও রাস্তায় নামতে পেরেছে কিংবা তারা কি মনে করে যে এই ধরনের গণতান্ত্রিক আন্দোলনে তাদের সম্পৃক্ত থাকা উচিত? তাদের অভিভাবক ও শিক্ষকরাও কি এটা চান? না। প্রশ্নটা এখানেই। 

কথা হচ্ছে রাজনীতি মানে যদি হয় শুধু আওয়ামী লীগ-বিএনপির মিছিলে শামিল হয়ে পরবর্তীতে পদ-পদবি বাগিয়ে ব্যক্তিগত আখের গোছানো—তাহলে সেই রাজনীতি থেকে বর্তমান তরুণ প্রজন্মের বিরাট অংশ যদি বিমুখ হয়, সেটি মন্দ নয়। কিন্তু রাজনীতি মানে যদি হয় দেশ ও মানুষের প্রয়োজনে দলীয় সাইনবোর্ডের বাইরে গিয়ে নিজেদের মতো ঐক্যবদ্ধ হয়ে রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ করা; রাষ্ট্রযন্ত্রকে ঝাঁকি দেয়া—সেই কাজটি তরুণদের বিরাট অংশই করছে। 

তাদের পেছনে অনেক সময় দলীয় রাজনীতির প্রভাব থাকে, থাকতে পারে। কেননা দেশের সবচেয়ে বড় সংগঠিত শক্তি এই ছাত্রসমাজ। তারা যদি কোনো ইস্যুতে রাস্তায় নামে, তাহলে সেই শক্তিকে রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করার চেষ্টা করবে—সেটিই স্বাভাবিক। সেই চেষ্টা গণজাগরণ মঞ্চে হয়েছে। সেই চেষ্টা ২০১৮ সালের সড়ক নিরাপত্তা আন্দোলনে হয়েছে। সেই চেষ্টা সরকারি চাকরিতে কোটাবিরোধী আন্দোলনেও হয়েছে। 

এটা হয়তো দোষের কিছু নয়। কেননা যেকোনো রাজনৈতিক দল যেকোনো সংগঠিত শক্তিকে নিজের পকেটে নিতে চায়। সরাসরি সেটি সম্ভব না হলে ওই শক্তির পক্ষে নিজেদের সমর্থন জানায়। যে কারণে দেখা যায়, যখনই যে দল ক্ষমতায় থাকে, তারা অন্তত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে নিজেদের ছাত্র সংগঠনের নিয়ন্ত্রণে রাখে। সেখানের হলগুলোয় ক্ষমতাসীন দলের একক আধিপত্য বজায় রাখা হয়। আর এই কাজে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকেও কাজে লাগানো হয়। শিক্ষকদের মধ্যে দলীয় বিভাজন তৈরি করে সরকারি দল সমর্থিত অংশকে পৃষ্ঠপোষকতা দেয়া হয়। এর মূল কারণ পুরো বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা—যাতে ছাত্রদের সংগঠিত অংশটি কোনোভাবেই জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে নির্দলীয় কিংবা দলীয় ব্যানারে এমন কোনো আন্দোলন গড়ে তুলতে না পারে, যা সরকারের জন্য বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি করে। কারণ প্রতিটি সরকারই জানে যে, ছাত্ররা ক্ষেপে গেলে, তারা রাস্তায় নামলে পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে। অতএব সরকার বা ক্ষমতাসীন দল সব সময়ই চায় এই বিশাল শক্তির ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে অথবা তাদেরকে নিউট্রালাইজ (নিষ্ক্রীয়) করে রাখতে। 

মূলত এই রাজনীতির কারণেই বছরের পর বছর ধরে তরুণদের মনে রাজনীতি সম্পর্কে একটা বিরূপ ধারণা দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে যে, ভালো ছেলেরা রাজনীতি করে না। রাজনীতি মানেই হানাহানি সংঘাত। রাজনীতি করলে পড়াশোনা হয় না। পড়াশোনা না হলে ভালো রেজাল্ট হয় না। ভালো রেজাল্ট না হলে বড় চাকরি হয় না। বড় চাকরি না হলে টাকা পয়সা হয় না। অর্থাৎ সবকিছুর মূলে ওই ক্যারিয়ার, টাকা পয়সা, একটা বিলাশী ও শান্তিপূর্ণ জীবন। এখানে দেশ নেই, দেশের মানুষ নেই। একটা স্বার্থপর মানসিকতা তরুণদের মনের ভেতরে গেঁথে দেয়া হয়েছে। অভিভাবকরাও তা-ই মনে করে। কারণ তারাও স্বার্থপর। তারাও মনে করে, দেশ গোল্লায় যাক, তার ‘সন্তান যেন থাকে দুধেভাতে’। 

অর্থাৎ রাজনীতিবিদরা নিজেদের ইচ্ছেমতো দেশ পরিচালনার জন্য এমন একটি রাষ্ট্রকাঠামো গড়ে তুলতে চায়, যেখানে তরুণরা শত অন্যায় দেখার পরেও ‘উই হেইট পলিটিক্স’-এর মন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে চুপ থাকে। তাদের বিরাট অংশই কোনোমতে দেশ থেকে এ লেভেল কিংবা উচ্চমাধ্যমিক পাস করেই বিদেশে চলে যেতে চায়। সেখানে গিয়ে বড় ডিগ্রি নিয়ে বিদেশেই উন্নত জীবনের ভিত রচনা করতে পারে—সেই বোধটা তাদের পরিবার থেকেই দেয়া হয়। রাষ্ট্রও চায় তরুণরা এভাবেই নিজেদেরকে রাজনীতি থেকে ‍দূরে রাখুক। কারণ রাজনীতি সচেতন হলেই সে গণতন্ত্র নিয়ে প্রশ্ন তুলবে; সে ভোট নিয়ে কথা বলবে; কোথাও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটলে সে এর প্রতিবাদ করবে; বাকস্বাধীনতা প্রশ্নবিদ্ধ হলে সে চিৎকার করবে। কিন্তু রাষ্ট্র এই চিৎকার শুনতে চায় না। রাষ্ট্র কোনো প্রশ্ন চায় না। সে চায় নিঃশর্ত আনুগত্য। সে চায় প্রশ্নহীন প্রশংসা। 

অতএব তরুণরা রাজনীতিবিমুখ হয়ে শুধুমাত্র নিজেদের বইয়ের ভেতরে এবং বড়জোর স্মার্টফোনের স্ক্রিনে ব্যস্ত থাকলেই সে খুশি। কারণ তরুণরা ক্ষেপে গেলে যে রাষ্ট্র বিব্রত হয়, তার বড় উদাহরণ ২০১৮ সালের আন্দোলন। স্কুল-কলেজপড়ুয়া শিক্ষার্থীরা মন্ত্রী-সচিবদেরকেও গাড়ি থেকে নামিয়ে দিয়েছিল। তারা বলেছিল ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’। কিন্তু তরুণরা যখন ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’ বলে এবং রাষ্ট্র  যখন জাস্টিস নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয় বা করতে না চায়, তখন সে বিব্রত হয়। তরুণদের দ্বারা সে বিব্রত হতে চায় না। চায় না বলেই রাষ্ট্র এমন একটি পরিবেশ তৈরি করে রাখে, যেখানে শিক্ষিত ও মেধাবী তরুণরা রাজনীতিতে আসতে উৎসাহ বোধ না করে। যে কারণে ‘শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রাজনীতি বন্ধ করো’ টাইপের স্লোগান বাজারে ছেড়ে দেয়। কারণ রাষ্ট্র ও ক্ষমতাবানরা চায়, তরুণরা শুধু নিজেদের পড়াশোনা নিয়েই থাকবে। সে শুধু নিজের ক্যারিয়ার নিয়েই ভাববে। দেশ ও মানুষের স্বার্থবিরোধী ইস্যুগুলোয় তারা যাতে নজর না দেয়; দেশের সমস্যাগুলো নিয়ে তারা যাতে কথা না বলে—সেজন্য তাদের ভেতরে রাজনীতি সম্পর্কে একটা নেতিবাচক ধারণা গেঁথে দেয়ার চেষ্টা করা হয়। সুতরাং তরুণরা রাষ্ট্রের এই কৌশল বুঝতে পারছে কি না এবং সচেতনভাবে তাদেরকে ক্যারিয়ার ও কথিত উন্নত জীবনের মোহে আবদ্ধ করে দেশ ও জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়া হচ্ছে কি না—সেই উপলব্ধিটা জরুরি।



মতামত দিন

মন্তব্য করতে প্রথমে আপনাকে লগইন করতে হবে

ট্রেন্ডিং ভিউজ